NarayanganjToday

জনস্বার্থে প্রণিত আইনের যথার্থ প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়


গণপরিবহনে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষ বসলে জেল ও জরিমানর বিধান রেখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নতুন আইনের যে খসড়া করেছে, ২৭ মার্চ তাতে সম্মতি দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন এই আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাসের বাধ্যবাধকতা এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

দুর্ঘটনার জন্য শাস্তির বিধান আগের মতোই রাখা হয়েছে। তবে কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হত্যা করে, তাহলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।

এছাড়া আরও কিছু বিধি-বিধান এই আইনে সংযুক্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য অন্যতম দুটি কারণ হিসেবে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা ও পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানোর বিষয়ে পৃথক পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এরমধ্যে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বললে এক মাসের কারাদ- ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় যদি দুর্ঘটনা ঘটে, এর জন্য ৩ বছরের কারাদ- ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান ধার্য করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশকে নতুন এই আইনে পরিণত করা হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সড়ক দুর্ঘটনায় যে হারে মানুষ মারা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন পরিসংখ্যান মতে, সড়কে দুর্ঘটনায় বছরে কম করে হলেও ১০ হাজার মানুষের প্রাণহাণি ঘটে আর পুঙ্গত্ব বরণ করার সংখ্যা এর থেকেও ৪ গুণ বেশি। ফলে নতুন এই আইন বাস্তবায়িত হলে এ পরিসংখ্যানচিত্র কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আইন প্রণয়ণ করলেই কী সব সমস্যার সমাধন হয়ে যায়? আইন তো আইনের স্থানেই থেকে যায় আর বাস্তবতা দেখা যায় ভিন্ন। শুধু আইন করলেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য চাই যথার্থ প্রয়োগ। দরকার আইন প্রয়োগকারি সংস্থার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ।

অনেকেই বলেন ‘অমুক দেশ কত সুন্দর, তমুক দেশে প্রকাশ্যে এটা করা যায় না ওটা করা যায় না। কি দারুণ স্বচ্ছতা। তাদের আইন-কানুনগুলোও কত সুন্দর।’ যারা এমন বলেন, তারা না জেনে, বুঝে বলছেন। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথেষ্ট আইন রয়েছে। যে আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে এই দেশটাও হতে পারে অন্যদেশের জন্য মডেল। যেমন, ফুটওভার ব্রিজ কিংবা জেব্রা ক্রসিং রেখে রাস্তা পারাপার হলে, পাবলিক প্লেসে ধূমপান করা হলে, হেলমেট ছাড়া বাইক চালালে, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে, ভোক্তাকে কোনোভাবে ঠকালে বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।

এছাড়াও জনস্বার্থে এমন আরও অনেক আইন রয়েছে আমাদের দেশে। কিন্তু আইন মানছে কজন কিংবা আইন বাস্তবায়নে প্রয়োগকারি সংস্থাই বা কতটা সচেষ্ট? এ প্রশ্নগুলো রয়েই যাচ্ছে, যার যথার্থ উত্তর কারো কাছেই নেই। অথচ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অত্যাবশ্যক। কেননা, এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমাধানের পথ। সে উত্তর বের করে তা প্রয়োগ করতে না পারলে আইন করেও কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না। কেননা, আইন না মানার প্রবণতা সবার মাঝেই বিদ্যমান। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের চে’ অসাধারণদের মাঝেই আইন না মানার প্রবণতা বেশি।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষকে আইন মানানো গেলেও অসাধারণ মানুষদের আইন মানানো যায় না। হেলমেটবিহীন ও ৩ জন নিয়ে কোনো বাইকচালককে জিজ্ঞাসা করলে দেখবেন, তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী।’ অপ্রিয় হলেও মন্ত্রীর এই কথা দিবালোকের মতোই সত্য। তাকে এই একটা কারণেই একটু বেশি ভালো লাগে। লোকটা আর যাহোক, অকপটে সত্য সমালোচনাটা করতে দ্বিধাবোধ করেন না। ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫’ এ। এই আইনটি জনস্বার্থে। শুরুর দিকে এই আইন বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিল সংশ্লিষ্ট সংস্থা। তখন সাধারণ মানুষ ধূমপানে এক আধটু সর্তক হয়। কিন্তু কদিন পরই দেখা যায় আইন প্রয়োগে শীথিলতা। ফলে পাবলিক প্লেসে দেদারসে চলে ধূমপান। তখন বলা হচ্ছিল কিছু দুর্বলতার কারণে আইনটি ততটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছিল না। পরে ২০১৩ সালের মে মাসে আইনটি যুগোপযোগী করে সংশোধিত আকারে পাস করা হয়। এরপর সংশোধিত আইনের আলোকে প্রণীত বিধিমালাটি ২০১৫ সালের ১২ মার্চ গেজেট আকারে পাস হয়। সংশোধিত এই আইনে পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে ৩শ’ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রণীত আইনে গত ২ বছরে কজনকে জরিমান করেছে আইন প্রয়োগকারি সংস্থা?

এবার আসি ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার প্রসঙ্গে। প্রায় সময় দেখা যায় ফুটওভার ব্রিজ কিংবা জেব্রা ক্রসিং ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে মানুষ রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। যারা এমনটি করেন তাদেরকে দ-বিধির ২৯০ ধারায় ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। যেমন একই বিধিতে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করায় ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ৯১ জনকে জরিমানা করেছিল। যা প্রশংসনীয়। কিন্তু এরপর এমন কোনো খবর আর কোথাও পাওয় যায়নি। অথচ জনস্বার্থে এমন অভিযান নিয়মিতই পরিচালনা করা দরকার। আইন প্রয়োগকারি সংস্থার উদাসিনতার কারণে আইন না মানার প্রবণতা বাড়ার বড় একটি কারণ।

মোটরযান অধ্যাদেশ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী হেলমেট ছাড়া বাইক চালালে ২শ’ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা ও জেলের বিধান রয়েছে। কখনো কখনো এমন অভিযান চালানোও হয়, তবে সেটা কালেভদ্রে। যার কারণে আইন না মানার প্রবণতাই লক্ষণীয়। এছাড়া ‘ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ আইন’ জনস্বার্থে করা হলেও এই আইন সম্পর্কে এখনও সাধারণ মানুষ রয়েছে অন্ধকারে। আবার আইন প্রয়োগকারি সংস্থারও এ ক্ষেত্রে রয়েছে উদাসিনতা। যার কারণে আইন থাকলেও তা সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। আর মানুষও এসব আইনের সুফল পাচ্ছে না। পাশাপাশি আইন না মানার প্রবণতাও আমাদের অভ্যাসে পরিণিত হয়েছে।

সচেতনতার অভাব আর যথাযথ প্রয়োগ না থাকার ফলে সমাজে বাড়ছে আইন না মানার প্রবণতা। অশিক্ষিত শ্রেণিই কেবল আইন মানছে না? তা কিন্তু নয়। আইন না মানার প্রবণতা শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই রয়েছে। আইনের শাসন বাস্তবায়নে নজরদারির পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে এ সম্পর্কিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ছোটবেলা থেকেই মানুষের মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি চালু হবে। এতে করে মানুষের মাঝে বাড়বে সচেতনতা, প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের শাসন।

আমরা প্রায় সময় দেখি বিভিন্নজন লিপ্ত হন আইন ভাঙ্গার প্রতিযোগিতায়। এরমধ্যে সিগন্যাল না মেনে রাস্তায় চলাচল, ওভার ব্রিজ থাকার পরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড পার হওয়া, ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো নিষেধ হলেও অবাধে চালানো, পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষেধ থাকা স্বত্বেও ধূমপান। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, সচিব, সংসদ সদস্য, পুলিশ, সাংবাদিক, শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে প্রতিনিয়তই আইন ভাঙ্গতে দেখা যায়। এসব কিছুই হচ্ছে একমাত্র সচেতনতার অভাব আর আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকার কারণে। ফলে, উৎসাহিত হচ্ছেন যারা আইন ভাঙ্গতে চান আর নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, আইন মান্যকারীরা।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় (সূত্র: সমকাল ২২ জুন ২০১৫) বলেছিলেন ‘আইন প্রণেতারা আইন না মানায় দখলদার উচ্ছেদসহ সড়কে যানজট কমাতে আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। দেশের এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কারো কারো আইন না মানার প্রবণতা আছে। যানজটে কিছু সময় অপেক্ষা করতেও তাদের অনীহা। তারা আইনভঙ্গ করে উল্টা পথে সড়কে যাতায়াত করেন। একইভাবে ভোট ধরে রাখার অজুহাতে তারা অবৈধ দখল উচ্ছেদে বাধা দেন। এর ফলে জনদুর্ভোগ বাড়ে। অপ্রিয় হলেও সত্যি কথাটি বলেছেন মন্ত্রী। অথচ এই তারাই আইন প্রণয়ন করেন! কি লাভ এমন আইন করে, যদি সে আইন প্রয়োগ না হয় কিংবা আইন প্রণেতারা এসব না মানেন!

এ ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের কারো কারো আইন না মানার প্রবণতা থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এবং শহরে বসবাসের নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই জনস্বার্থে করা আইনের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এই সংস্কৃতি থেকে নিষ্কৃতি পেতে আইন মানা সম্পর্কে সর্বসাধারণকে উৎসাহিত করতে হবে। এ জন্য নিতে হবে নানামুখী ব্যবস্থা। যাতে করে মানুষের মাঝে খুব দ্রুত সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়। সেই সাথে আইন করলেই হবে না, প্রচলিত সকল আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। আইন অমান্যকারী এমপি-মন্ত্রী, প্রভাবশালী শিল্পপতি, রাজনীতিক সে যে হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ি ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই ক্ষেত্রে দ্বিধাহীন ভাবেই বলতে পারি, সংশোধিত মোটরযান অধ্যাদেশ আইনে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হলেও এর সঠিক প্রয়োগ করা গেলে অন্তত দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। কমতে পারে সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল। কিছুটা হলেও নিরাপদে মানুষ যানবাহনে চড়তে পারবে। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিৎ এই আইনটি কিতাববন্দী না করে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়া। আমরাও চাই সড়ক আইনের যথার্থ প্রয়োগ। সেই সাথে জনস্বার্থে আরও যত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, সেসব আইনেরও সঠিক এবং বাস্তবমুখি প্রয়োগে আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথার্থ ভূমিকা পালন করবেন, সে প্রত্যাশাটুকু রাখছি।

লেখকঃ সীমান্ত প্রধান, সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ টুডে

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে