NarayanganjToday

সীমান্ত প্রধান

কবি ও সংবাদকর্মী

ওরা দেখিয়ে দিলো : ইউরোপ আমেরিকাই নয়, বাংলাদেশেও সম্ভব


শুরুটা ছিলো শিক্ষার্থীদের ওপর বাস ওঠিয়ে দেয়ার প্রতিবাদ এবং এ ঘটনার বিচার দাবি। এমন দাবি নিয়ে যখন ঢাকার পথে শিক্ষার্থীরা তখনই পুলিশ বিনা উস্কানিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পড়ে, চালায় বর্বর হামলা। আর এসব হামলার ছবি মেইন স্ট্রিম অনেক গণমাধ্যম এড়িয়ে গেলো মুক্ত সাংবাদিকতার চোখ এড়ায়নি। মুহূর্তের মধ্যে শিক্ষার্থীদের রক্তমাখা জামা-জুতো আর রক্তাত্ব মুখের ছবি ভাইরাল হতে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

এনিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অভিভাবকমহলও। জোড়ালো হয় নিরাপদ সড়ক, নৌপরিবহন মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিসহ ৯ দফার আন্দোলন। যা যৌক্তিক এবং ন্যায্য আন্দোলন। এ আন্দোলনকে বিতর্কিত করার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না। তবে, এই আন্দোলনে আমাদের শিক্ষার্থীরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেকগুলো বিষয় দেখিয়ে দিয়েছে। যা সংস্কার করা গেলে এই রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে মডেল হতে পারে।

শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে ভাঙচুর করেনি। তাঁরা তাঁদের দাবির পক্ষো বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। এসময় বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে মজার বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের ফলে আমরা দেখতে ও জানতে পারলাম যে, মন্ত্রী, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট এমনকি সাংবাদিকদের গাড়ির কাগজপত্র থেকে শুরু করে চালকদের লাইসেন্সও নেই! আর গণপরিবহন চালকদের মধ্যে ৯৮ শতাংশেরই কোনো লাইসেন্স নেই। তারপরও এরা দিনের পর দিন দিব্যি গাড়ি চালিয়েছে! প্রশ্ন হচ্ছে এরা কীভাবে এসব করেছে? গাড়ির কাগজপত্র, লাইসেন্স চেক করার কথা ছিলো যে বিভাগের তথা ট্রাফিক এতদিন কী করেছে?

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ছবি এখন বিভিন্ন জনের টাইমলাইনে ঘুরছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, সারিবদ্ধ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সিগন্যাল অথবা জ্যামে। কিন্তু পাশ দিয়ে রাখা হয়ে ইমার্জেন্সি লেন। যেখান দিয়ে নির্বিঘেœ যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স। যা এর আগে কখনো এই দেশে দেখা যায়নি তা শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিলো ইচ্ছে থাকলে সড়ক পথেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের দেশে সড়কগুলো যেসব বিশৃঙ্খলা হচ্ছে তা সবই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফসল। এ কারণে আমরা সিস্টেম লসে পড়েছি বহু আগের থেকে।

ব্যাপরটা অনেকটা এমন, চোর চুরি করেছে কেউ একজন দেখে ফলেছেন আর সেই সাক্ষীর মুখ বন্ধ করার জন্য চুরি কিছু অংশ তাঁকে প্রদান করা হলো। তিনি ভাগ পেয়ে চুপ হয়ে গেলেন। এরপর যখন গৃহস্থ গিয়ে মামলা করলেন তখন সেখান থেকেও চোর বেটার বাঁচার জন্য পুলিশকে ঘুষটুষ দিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখলেন। অথচ যত হয়রানি হওয়ার তা হলো যার মাল চুরি গেছে সে। আমাদের সড়ক পরিবহনের অবস্থাটাও তেমনই।

প্রায় সময় আমরা দেখি গাড়ি আটকাচ্ছে পুলিশ। কাগজ চেক করছে। ঠিকঠাক না থাকলে হাতে কয়েকশো টাকা গুজে দিলেই সে গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। আবার কাগজপত্র নেই এমন যানবাহনগুলো দিনের পর দিন মাসের পর মাস ট্রাফিকের বিভিন্ন জোন ম্যানেজ করে দিব্যি চলাচল করছে। আর এসব কারণে ফিটনেসবিহীন গাড়ির দাপট সড়কে অধিকমাত্রায়। এছাড়া চালকদের লাইসেন্সের কথা আর না-ই বলি। যা বলার দেখানোর তা তো শিক্ষার্থীরা দেখিয়েই দিলো।

শিক্ষার্থীদের এমন দেখানো পথে এবার হাঁটা উচিৎ সরকার থেকে শুরু করে প্রতিটি দপ্তরের। আর যদি সে সম্ভব হয় তবেই, এদেশে নিরাপদ সড়ক পাওয়া সম্ভব হবে। মোদ্দা কথা, নিরাপদ সড়কের জন্য সবার প্রথম সড়কগুলোতে বিশৃঙ্খলা রোধ করতে হবে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ট্রাফিক আইনের কঠোরতা থাকতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি জব্দ করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন কেউ কোনো যানবাগন চালাতে পারবে না। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি সড়কে ইমার্জেন্সি লেন তৈরি করতে হবে।

এসবের জন্য সর্বপ্রথম সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং জনসচেতনতার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। চালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকেও উৎসাহিত করতে হবে সড়কের বিশৃঙ্খলা রোধের জন্য। কেননা, আজ যে চালক গাড়ি চালাচ্ছে, বাস ট্রাক চালাচ্ছে তাঁর ছেলে মেয়েও কিন্তু কোনো না কোনো স্কুল কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ছে। সুতরাং সড়কের নিরপত্তা তাঁদেরও দরকার আছে।

সুতরাং আসুন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সড়ক হয়ে ওঠুক নিরাপদ। সবাই সবার জন্য স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা প্রদানে কাজ করি। ছাত্রদের মুখোমুখি শ্রমিকদের এবং পুলিশদের দাঁড় না করিয়ে সড়কের এই সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি। আর নিজের কাছেই নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, কাগজ, লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালাবো না। আর এ সম্ভব হলেই নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা সম্ভব হবে বলেই মনে করি।

লেখক : সীমান্ত প্রধান, কবি ও সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ টুডে

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে