NarayanganjToday

শিরোনাম

সীমান্ত প্রধান

কবি ও সংবাদকর্মী

স্যালুট প্রিয়তি, জাগো বাংলাদেশ


স্যালুট প্রিয়তি, জাগো বাংলাদেশ
মাকসুদা প্রিয়তি

#মিটু মুভমেন্ট এটি একটি আন্দোলন। এই আন্দোলন সারা বিশে^ই এখন আতঙ্কের নাম। এর শুরুটা হলিউড থেকে শুরু হয়ে বলিউডে ব্যাপক তোলপাড় ফেলে দেয়। এই ঝড়ে বলিউড এখন একরকম কাঁপছে। অনেকটা আতঙ্কের হয়ে ওঠেছে ‘#মিটু মুভমেন্ট’। বিশেষ করে মুখোশধারী পুরুষের ক্ষেত্রে এই এই মুভমেন্টটি যারপরনাই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

২০০৬ সালে অস্কারজয়ী প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টাইনের বিরুদ্ধে সমাজকর্মী তারানা বার্কের হাত ধরেই ‘মি টু’ আন্দোলন প্রথম শুরু হয়। আন্দোলনের নাম ‘মি টু’ হওয়ার কারণ? তারানা বার্কের কাছে এক ত্রয়োদশী স্বীকার করে যে, সে যৌন হেনস্থার শিকার। তখন তারানা তাকে প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারেননি। তার মনে পড়ে যায় নিজের অভিজ্ঞতা! মাত্র ছ’ বছরের শিশু তারানা যে চরম যন্ত্রণাদায়ক ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় ত্রয়োদশী নাবালিকার নিষ্পাপ মুখ। কিন্তু প্রকাশ্যে তাকে কিছু বলতে পারেননি। শুধু মনে মনে বলেনÑ ‘মি টু!’ অর্থাৎ, ‘আমিও’। 

এরপরই শুরু হলো #মিটু মুভমেন্ট। হার্ভে ওয়েনস্টাইনের বিরুদ্ধে এবং #মিটু আন্দোলনের স্বপক্ষে বহু ভুক্তভোগী নারী ও পুরুষ রাস্তায় নামলেন। মিছিলটি হলিউডের প্রধান সড়ক থেকে শুরু হয়ে ‘ওয়াক অব ফেম’ প্রদক্ষিণ করে সিএনএন সদর দপ্তরে গিয়ে শেষ হয়।

তবে, তখনও এই মুভমেন্ট তত একটা সাড়া জাগাতে পারেনি। এক পর্যায়ে ‘মি টু’কে হ্যাশট্যাগ সহযোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আনলেন অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো। ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হল ‘মি টু’ ঝড়। তারানা বার্ক ‘মি টু’ শব্দটি মাই স্পেস সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ব্যবহার করলেও অ্যালিসা তার সাথে হ্যাশট্যাগ দিয়ে #মিটুকে ট্যুইটারে তুলে দেন। এরপরই অভিনেত্রী অ্যাশলে জুড, জেনিফার লরেন্স, উমা থারম্যানসহ আরও অনেকে সেলিব্রিটি এই একে সমর্থন করে #মিটু’কে দাবানলে পরিণত করেন।

এই মুভমেন্ট হলিউডিজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলেও অন্য দেশগুলোতে বিশেষ করে বলিউডে এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য ছিলো না। শেষতক বলিউডেও ডানা মেলে #মিটু মুভমেন্ট। এর থেকে বাদ যায়নি নানা পাটেকর থেকে শুরু করে ইউনিভার্সাল ‘বাপুজি’ অলোকনাথও। এতে বিধেঁছেন বিখ্যাত প্রযোজক ও পরিচালক সুভাষ ঘাই, কিংবদন্তি সাংবাদিক এম জে আকবর, সুরকার অনু মালিক, অভিনেতা রজত কাপুর, তথাকথিত বেস্ট সেলার সাহিত্যিক চেতন ভগত-সহ আরও অনেকে। শুধু তাই নয়, নারী দ্বারা নারী যৌন হেনস্থার কথাও এখানে বলেছেন বলিউডের একজন আইটেম গার্ল। তিনি অভিযোগ তুলেছেন একজন অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে।

#মিটু আসলে কী? এর বিশদ বলিউড হলিউড এমনকি কোলকাতাবাসী জানলেও এখনও এই ঝড়ের কবলে পড়েনি বাংলাদেশি কোনো মুখোশধারী। আসলে তা নয়, এই দেশের মেয়েরা রক্ষণশীলতার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় নিজেদের উপর ঘটে যাওয়া যৌন হেনস্থার কথা প্রকাশ্যে আনতে লজ্জা বা ভয় পাচ্ছেন বিধায় এখনও এই মুভমেন্ট এখানে শুরু হয়নি। তাই এখানকার অনেকের কাছে ‘#মিটু খায় না, মাথায় দেয়?’ এমন জায়গাতেই রয়েছে।

তবে, শেষতক এই মুভমেন্ট খায় না মাথায় দেয় তা প্রকাশ্যে এনে রীতি মতো হই চই ফেলে দিয়েছেন সাবেক মিজ আয়ারল্যান্ড মাকসুদা প্রিয়তি। যিনি বাংলাদেশের একজন ব্যবসায়ীর দ্বারা চরম নোংরামির শিকার হয়েছিলেন। তাকে করা হয়েছিলো যৌন হেনস্থা। #মিটু দিয়ে প্রিয়তি দাবি করেছেন বাংলাদেশের রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক তার অফিসেই তাকে রেপ করার চেষ্টা করেন এবং অত্যন্ত বিশ্রিভাবে তার স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এখন ব্যাপক হই চই চলছে বাংলাদেশে।

প্রিয়তি তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে মুখ খুলেছেন। এতে তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু প্রিয়তির মতো এমন অসংখ্য নারী রয়েছেন যারা দিনের পর দিন এমন যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছেন রফিকুল ইসলামদের মতো মুখোশধারীদের দ্বারা। হয়তো তারা সমাজ, সংসার বা অত্মমর্যাদার কারণে সেসব কথা প্রকাশ্যে আনছেন না। যার ফলশ্রুতিতে দিনকে দিন মুখোশধারী যৌন নীপিড়কদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সে অর্থে প্রিয়তি স্যালুট পাওয়ার যোগ্য।

যদিও প্রিয়তি তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনার পর অনেকেই তার চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এমনকি অনেকেই তাকে ‘চরিত্রহীন’ তকমা দিতেও শুরু করেছেন। এটাই স্বাভাবিক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। কারণ, এখানে আমাদের প্রায় সবার অবস্থা ‘চোরের সাক্ষী গাঁট কাটা’।

তবে, প্রিয়তির মতো সমাজের দৃষ্টিতে এমন আরও যারা চরিত্রহীন রয়েছে, তারা যদি ভয়, লজ্জা, সংকোচকে পোকা ঝারার মতো করে কাঁধ থেকে ঝেরে ফেলে জেগে ওঠেন, তবেই জাগবে বাংলাদেশ। আর তখনই নারীদের জন্য কিছুটা হলেও এই দেশ হয়ে ওঠতে পারে নিরাপদ, বাসযোগ্য। এদেশের নারীদের বোঝা উচিৎ যে, এভাবে নীরব থেকে যৌন নীপিড়কদেরকে আরও বেশি উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাই, এই দেশের নারীদের জাগা অত্যাবশ্যক। কবিতো বলেছেনই, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ লেখক : সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ টুডে

উপরে