NarayanganjToday

দৃষ্টি দিজা

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

কারো কাছে কেউই সেইফ নয়


রোজ একবার নিউজফিড স্ক্রল করতে গিয়ে কয়েকবার করে ধর্ষণের (এবং ধর্ষণের পরে বিভিন্ন ভাবে খুনের) খবর পড়ছি। সে নতুন নয়। প্রত্যেক দিন একবার করে রাজপথে নামা সম্ভবও না লোকের। হ্রাস হবে কী করে পরিমাণ? কঠোরতম শাস্তি দেওয়া নিশ্চিত করা ছাড়া আর কী করা যায়?

ধর্ষণের কয়েকটা প্রকারের মধ্যে একটা `শিশু ধর্ষণ' অতঃপর মেরে ফেলে দেওয়া। আর আত্মীয় স্বজনের মধ্যে হলে, বেশিরভাগই মিডিয়ায় আসছে না। হচ্ছে হ্যারেসমেন্ট, ধীরে ধীরে শরীর নিংড়ানো। রেইপড হয়ে মরে-টরে গেলে আরতো স্বাদ নেওয়া যাবে না; এইসব।

আরও হচ্ছে গণধর্ষণ অতঃপর দলের/গডফাদারের জোর থাকলে ফেলে দিয়ে আসা, জোর না থাকলে মেরে ফেলা। নৈতিকতাতো আসবে আত্মোপলদ্ধির মাধ্যমে। আমার প্রশ্ন নিরেট মূর্খদের নিয়ে। শিক্ষিত নিরেট মূর্খ, অশিক্ষিত নিরেট মূর্খ, এদের নিয়ে। আমার প্রশ্ন সাইকোলজি নিয়ে। সেক্স চাহিদা বাস্তবায়নের খাতিরে হিতাহিতজ্ঞান শূণ্য হওয়া, শিশুতে লোলুপতা, এসব কিসের মাধ্যমে আসে? কেন আসে?

সব রেইপ প্রতিশোধ স্পৃহা হয় না। একজন রেপিস্ট রেইপ করার আগে আমরা ঠিক করে জানতেও পারিনা সে সাইকোলজিক্যালি অসুস্থ ছিল। অতএব, রেইপ হওয়ার আগেই সরকারি পদক্ষেপে ওইসব লোকের সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না কিনা..!

আমার কথা হলো, ‘কারো কাছে কেউই সেইফ নয়।’ একটা কথা অনেকেই বলে, সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়। আমি বলি, আপনারা এবং বিশেষ করে সন্তানদের অবিভাবকরা, সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখুন। আপনার বন্ধু গার্লস স্কুলের ছাত্রী প্রিয় সফল শিক্ষক, এর মানেই তার কাছে আপনার ছেলে বা মেয়ে সেইফ, তা কিন্তু নয়। আপনার নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠার সঙ্গী, ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে সাহায্যকারি বন্ধুও যেন আপনার চোখে নিস্পাপ হয়ে না থাকেন। দশ বছরের পুরনো ড্রাইভার সমানে স্কুলে যাওয়ার পথে আপনার সন্তানকে অ্যাবিউজ করলে আপনি তা টেরও পাবেন না হয়তো। এবং সে যে অপরাধ করছে, সে নিজেও তা ফিল করছে না। এসবই নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা। দেবতা/ফেরেশতা বলতে দুনিয়ায় কিচ্ছু নেই। একা কোথাও অন্য কারোর সাথে সন্তান ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ব্ল্যাকবেল্ট উইনার হলে অন্য কথা।

যা বলছি, এগুলো নতুন কথাও নয়, পুরনো। যারা পড়েন, পড়তে পারেন, তাদের জন্য লেখা। যারা নিরক্ষর, ঘেমো শ্রমিক, তাদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা আমার এখনো হয়ে উঠেনি। আমি অপারগ, নিষ্কর্মা।

বার বার চাই শাস্তি ঠিকঠাক মতো হোক। দৃষ্টান্ত তৈরি হোক ভালো। মূর্খদেরও হিতাহিতজ্ঞান শূণ্য হওয়ার আগে যেন একবার মাথায় টোকা পড়ে, এমন শাস্তির দৃষ্টান্ত হোক একটা। প্রশাসনের কাছেতো এই কাজ তেমন কঠিন কিছু নয়। আইন বিভাগের নিচু পদস্থদের ঘুষ-টুস না খাওয়ার দিকে নজর রাখলেই হয়। অবশ্য সেজন্য আবার সরকারি চাকরিতে লোক নিতে গিয়েও ঘুষ খাওয়াখাওয়ির ব্যাপারটা বন্ধ করতে হবে, প্রচুর প্যাঁচ।

একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করি, ক্লাস ওয়ানে এক ব্রেঞ্চে বসে পড়েছি, এমন একটা মেয়ে ছিলো। এখন আমি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে যেরকম গাধা, সে শুরু থেকেই সেরকম। পড়া পারে না, মার খায়, টিফিনের সময় তেতুল পেড়ে তেতুল খায়, আমড়া-বড়ই ভর্তা খায়। একি এলাকার মেয়ে ছিলাম। কয়েক বছরেই ফেল করে করে পিছিয়ে গেলো, আর পেলাম না। রাস্তায় দেখতে পেয়েও আর পেলাম না।

এইচএসসি কম্পলিট করে খারাপ রেজাল্ট করে আর বাসায় অপছন্দের ছেলের সাথে প্রেম করতে গিয়ে ধরা খেয়ে ফোন-টোন বাজেয়াপ্ত করিয়ে বসে আছি; এমন এক ঋতুতে শুনি হৈমন্তী(ছদ্মনাম) নিখোঁজ। বাপ-ভাই গরু খোঁজা খুঁজেও পাচ্ছে না। নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছে কোনো ছেলের সাথে হবে? খারাপ মেয়ে। রাস্তায় খলখলিয়ে হাসা সুন্দর আর খারাপ মেয়ে।

সপ্তাহের ভেতরই একদিন হাসপাতাল রোডের পাশের খালে একটা বস্তা বন্দী লাশ ভেসে উঠলো, চোখ নাক ঠোঁট পঁচে গলে এক হয়ে আছে। বস্তার ভেতর লাশের সাথে ইট ভরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

সেই একই কেইস্, রেইপ করে খুন। প্রাক্তন প্রেমিক লাপাত্তা। সমাজ, মরা হৈমন্তীকেই দোষ দিয়েছে। ‘বাপ থাকতো বাইরে বাইরে, মায়ের কানে দোষ। শুনতে পায় না একদমই, মেয়ে তো বিগড়াবেই। আজ অমুকের ছেলে তো কালকে তমুকের ছেলের সাথে, রেইপ হবে নাতো কি বিদেশী ভদ্র ঘরে বিয়ে হবে?’

পরে পুলিশ খুনির বাপ-মা’কে ধরে নিয়ে যাওয়ায় সপ্তা'খানেক পর ছেলে দিশা না পেয়ে এসে ধরা দিয়েছে। এখনো জেল খাটছে, কিচ্ছু হয়নি সেরকম রেপিস্টের। জেলেই। আমি চেহারাই চিনতাম, দেখেছিও পাড়ায় বারকয়েক। সবসময় হাসতো, সিরিয়ালের লক্ষ্মী বউদের মতো মিষ্টি হাসি হাসতো। এই ছেলে রেইপ করে কাউকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে, এইসব বিশ্বাস করা যায় না, এমন হাসি। তারপরও ঘটেছে এসব। আমি টানা পাঁচ-দশ দিন স্তব্ধ মতো হয়ে বসে থেকেছি। খেতে-টেতে ইচ্ছে হয়নি ক'দিন।

ক্লাস ওয়ানের বেঞ্চে বসে থাকা একটা কথা কানে বেজেছে, ‘দৃষ্টি, বড় হওয়ার পর তোর বিয়েতে আমি শাড়ি দেবো, দামী শাড়ি, তখন চাকরি করব তো, অনেক টাকা থাকবে আমার। তোকেই সবচেয়ে দামী শাড়ি দেবো। তুই আমার বিয়েতে কী দিবি?’ এসব! তার দিন দশেকের মাথায় আমি দিব্যি খেতে শোতে পেরেছি। এখনো পারি।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে