NarayanganjToday

শান্তা মারিয়া

কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং গণমাধ্যমকর্মী

আকাশ-মিতুর পরকীয়া এবং আত্মহত্যা সমাচার


ক’দিন ধরেই আকাশ-মিতুর কিচ্ছা ফেসবুকে বিভিন্নজনের স্ট্যাটাসে দেখছি। অনেকেই ট্রল করছে। ভাবলাম করুক। এসব নিয়ে লিখতেই হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? আর সব বিষয় নিয়ে সবার কথা বলা জাতিগত বাচালতার পরিচায়ক। তাই চুপ করেই ছিলাম। কিন্তু এ নিয়ে মিডিয়ায় যখন এক তরফা খবর প্রকাশিত হওয়া শুরু হলো তখন একুশ বছর ধরে সচল সাংবাদিকসত্তা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলো।

সাংবাদিকতায় প্রথম পাঠ হিসেবেই ছিল আদালতে অপরাধী প্রমাণিত না হলে ব্যক্তিবিশেষকে অভিযুক্ত বলে উল্লেখ করতে হবে। কোন রিপোর্ট লেখার আগে তথ্য ক্রসচেক করতে হবে। বিবাদমান দুইপক্ষের বক্তব্য যাচাই করে তারপর লিখতে হবে। সম্ভব হলে দুই পক্ষের বক্তব্য নিতে হবে। কিন্তু আকাশ-মিতুর ঘটনায় দেখা যাচ্ছে এক তরফাভাবে একজনকে গালাগাল করা হচ্ছে, খুনি, হত্যাকারী বলা হচ্ছে শালীনতার সীমা অতিক্রম করে।

আকাশের পোস্ট ও ভিডিও দেখার পর আমার মনে হয়েছে সে মানসিকভাবে অসুস্থ একজন ব্যক্তি। দম্পতির মধ্যে একজন যদি তৃতীয় বা চতুর্থ কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তাহলে করণীয় কী? প্রথমে পারষ্পরিক আলোচনা। যদি দুজনেই মনে করে দাম্পত্যটা তারা চালিয়ে যাবে তাহলে তো বখেরা মিটেই গেল। আর যদি সেটা না হয় তাহলে বিচ্ছেদ। সেপারেশন অথবা ডিভোর্স। কিন্তু এই সহজ পথটা অবলম্বন না করে আকাশ যেটা করেছে সেটা তার মানসিক অসুস্থতারই পরিচায়ক। এখানেই আসছে দেনমোহরের প্রশ্ন। আকাশ-মিতুর বিয়েতে দেনমোহর ছিল ৩৫ লাখ টাকা।

প্রশ্ন হলো এত উচ্চ দেনমোহরে রাজি হওয়ার মতো আর্থিক অবস্থান কি আকাশের ছিল? ছিল না। তাহলে কেন এই দেনমোহরে সে বিয়ে করল? দেনমোহর এমন একটি বিষয় যা বিয়ে এবং সহবাস কার্যকর হলেই স্ত্রীকে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের সমাজে দেনমোহর স্ত্রীকে বিয়ের পর পরিশোধ করা হয় না। তালাকের প্রশ্ন উঠলে তখনি দেনমোহরের দাবি উত্থাপিত হয়।

তাছাড়া কাবিনে দেনমোহরে অর্ধেকটা উসুল বলে লেখা হয়। অথচ কনেকে যে অলংকার সামগ্রী দেওয়া হয় তা দেনমোহর হিসেবে গণ্য হতে পারে না, তা হলো উপহার। আমাদের বিয়ে ব্যবস্থায় দেনমোহর একটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। আর্থিক অবস্থা ৩৫ লাখ টাকা দেনমোহরে রাজি হওয়ার মতো না হলেও যে লোক তাতে রাজি হয়, সে যে বিবেচনাহীন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধরলাম মিতু একজন বিকৃত মানসিকতার ব্যাভিচারী। তাহলে তার সঙ্গে তালাক ছিল সহজ সমাধান। কিন্তু আকাশ বুঝতে পারছিল এতে তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ হবে না। বরং মিতুকে সমাজে অপদস্থ করতে হবে। লাম্পট্য ও ব্যাভিচার কখনও সমর্থন করা যায় না। সেটা ১০০ ভাগ ঠিক। কিন্তু আত্মহত্যা অথবা মারপিটের কি দরকার? তালাক দিলেই হয়।

আকাশের আত্মহত্যাসহ যে কোন আত্মহত্যাই দুঃখজনক। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে মিতুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ বাহিনীর এই তৎপরতা দেখে হাসবো না কাঁদবো? এদেশে শত শত ধর্ষণ মামলার আাসামী বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। গ্রেপ্তার করার জন্য তাদের নাকি খুঁজেই পাওয়া যায় না। বখাটেদের দ্বারা উত্যক্তর শিকার নিরীহ কিশোরী তরুণী যখন আত্মহত্যা করে তখনও তো সেই বখাটেদের গ্রেপ্তার করা হয় না(বিরল কয়েকটি কেস ছাড়া)। যখন দুগ্ধপোষ্য শিশু ধর্ষিত হয়, যখন মাদ্রাসায় অসহায় ছেলেশিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তখনও তো মানব বন্ধনের জন্য লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রতিবাদে কাউকে রাস্তায় নামতে দেখি না। এখন তাহলে মিতুর শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নামা এই মানুষগুলো কারা? তারা সবাই খুব সদাচারী? তারা কেউ কোনদিন ব্রোথেলে যায়নি, কাউকে প্রতারণা করেনি?

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এই দেশে মিতুই একমাত্র ব্যাভিচারী। আর সবাই ধোয়া তুলসী পাতা। যেসব পুরুষ ব্রোথেলে যায় তাদের স্ত্রীদের তাহলে কি আত্মহত্যা করা উচিত? মিতুকে তালাক দেয়নি কেন আকাশ? কারণ তালাক দিতেও হ্যাডম লাগে। ৩৫ লাখ টাকার দেনমোহরে রাজি হয় কেন? আরেকটা কথা দেনমোহর তো বিয়ে সাপেক্ষ, তালক সাপেক্ষ তো নয়। বিয়ে করলেই দেনমোহর দেওয়া বাধ্যতা মূলক। সেটা দেয়নি কেন? আমেরিকান গ্রিনকার্ডধারী মেয়েকে তখন খুব মজা লেগেছিল? পরে যখন দেখে মেয়ে তাকে আমেরিকায় নিবে না তখন তালাক দেওয়ারও আর সামর্থ্য ছিল না। এইসব লোভী বলদ লোকদের মরাই উচিত।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে