NarayanganjToday

প্রমা ইসরাত

আইনজীবি ও লেখক

আইনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, প্রথম বই ‘Love- লোকসান’ দ্যু প্রকাশন থেকে ২০১৮ তে প্রকাশিত।

এই ব্যাপারগুলো ‘ছিঃ’ না


ঝাঁসি’র রাণী লক্ষী বাইকে নিয়ে নির্মিত, ‘মনিকর্নিকা’ মুভিটা দেখলাম। কঙ্গানা রানাওউতকে আমার ভালো লাগে। তার অভিনয় এবং ব্যক্তিত্বের জন্য। ঝাঁসি'র রাণী কে নারী স্বাধীনতা, সাহসিকতা'র প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। জেনারেল হিউজ রোজ তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘বিদ্রোহীদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা, এবং পুরুষ যদি কেউ থেকে থাকে তবে, তিনি একমাত্র ঝাঁসির রাণী।’

ব্যাপারটা জেন্ডার্ড। জেন্ডার্ড হলেও আমি একে তীরষ্কার বা লানৎকার করছি না। সহজ ভাবেই নিচ্ছি। পুরুষ মাত্রই সাহসী, বীর, সকলের রক্ষাকর্তা, অন্যের দায় দায়িত্ব নেয়া এমন হবে, এই রোল প্লে সমাজ নির্ধারিত। আর সমাজ যে লিঙ্গ নির্ধারণ করে তাকেই জেন্ডার বলে। তাই বললাম ব্যাপারটা জেন্ডার্ড।

আমার ঝাঁসির রাণীকে দেখতে দেখতে হঠাৎ করে মনে হলো, পিরিয়ডের দিনগুলোতে রাণী কি করতেন? তিনি কি তলোয়ার প্র্যাকটিস করা বন্ধ রাখতেন? মানে আমাদের এখানে ইদানিং যে বিজ্ঞাপন দেখায় যে, দুই পাখা ওয়ালা স্যানিটারি ন্যাপকিন পরলে মেয়েরা হাওয়ায় উড়ে উড়ে, দুই পা মেলে, নানান দৌড়া দৌড়ি করে বেড়ায়। রাণীর সময়তো এই স্যানিটারি প্যাড পাওয়া যেতো না, তিনি এতো দৌড়াদৌড়ি ক্যামনে করতেন?

পিরিয়ড মোটামুটি তিনদিন থাকে, কারো কারো ৪-৫ দিন থাকে। মাঝের দুই দিন হ্যাভি ফ্লো থাকে। সেই সাথে থাকে, স্তন ও তলপেটে ব্যথা, হাত পা ব্যথা, মাথা ব্যথা, মুড সুইচিং, অনেকের জ্বরও চলে আসে। বাজারে যে প্যাডগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় যে এই প্যাড পরলেই মেয়েরা একদম ফুরফুরা হয়ে যায়, তা মিথ্যা কথা। হ্যাঁ, স্যানিটারি ন্যাপকিন/প্যাড দাগ দূর করার ঝামেলা, কাপড় ধোয়ার ঝামেলা, এবং পিরিয়ড চলাকালীন অবস্থায় সাধারণ চলাচলকে স্বস্তিদায়ক করে, কিন্তু এইসব বিজ্ঞাপনে যেমন দেখায় যে মেয়েরা তা ধিং ধিং করে দুই পা মেলে হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে, ব্যাপারটা তেমন না। এই বিজ্ঞাপনগুলো নারীর পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে সত্য যে ঘটনা নারী শরীরে ঘটে, সেই সত্যকে অস্বীকার করে। এবং নারী স্বাধীনতা নাম দিয়ে একটা চিনির প্রলেপ লাগিয়ে পুরো ব্যাপারটাকে অতিরঞ্জিত করে।

নারীর পিরিয়ড হয়, এবং তা হলে নারী অচ্ছুৎ, নারী দুর্বল, নারী পুরুষ দের চেয়ে কম মানুষ, এই ভাবনাটা যেমন সমাজ তৈরি করে নারীকে মর্যাদায় পুরুষদের থেকে কম বানিয়ে রাখে, তেমনি নারীর পিরিয়ড কোনো ব্যাপার না, নারী পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে একটা দুই পাখা ওয়ালা প্যাড পরলেই সেইরকম দূর্দান্ত হয়ে ওঠে এই ধারণাটাও নারীকে একটা মিথ্যা ইমেইজ দেয়।

হ্যাঁ , নারীর ঋতুস্রাব/ পিরিয়ড নারীকে অস্বস্তি দেয়, তার পিরিয়ডকালীন শারীরিক দুর্বলতা তাকে কষ্ট দেয়, এবং সেই জন্য তার কাজে বাধা আসতে পারে। সেই রকম বাধা সকল মানুষের আসতে পারে কিন্তু সেই বিবেচনায় নারীকে পুরুষকর্মীর চাইতে কম বেতন দেয়া, সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে তাকে বঞ্চিত করা, মর্যাদা বোধের জায়গায় সম অবস্থানে না রাখাটাই অযৌক্তিক। যুক্তিযুক্ত না এই জন্য কেননা, একজন পুরুষও আরেকজন পুরুষ থেকে পেশি শক্তিতে কম হতে পারেন। তাহলে পেশি শক্তি অনুযায়ী যদি বেতন নির্ধারণ করা হয়, তাহলে পড়ালেখা করার দরকার কি? স্কুলে না গিয়ে জীম এ যাওয়াটাই তো উচিৎ।

পিরিয়ড হওয়ার জন্য যে সমাজ নারীকে অচ্ছুৎ করে রেখেছে, সেই সমাজেরই শিখিয়ে দেয়া নিয়মে, নারীরাই একে অস্ত্র হিসেবেও ব্যাবহার করে। যেমন শারীরিক সম্পর্ক এভোয়েড করতে খুব কম নারী আছে যারা এই অজুহাত দেয় না, যে সে সহবাসে যেতে পারবে না কারণ তার পিরিয়ড হয়েছে। কারণ নারীর না এর যেহেতু মূল্য নেই, তাই পিরিয়ড নিয়ে মিথ্যে বললেই কাজে দেয়, গায়ে হাত ও দিতে আসবে না।

তবে, কাজে সাহায্যও করতে আসবে না। এহ কত নখরা, কিছু করতেও দিবা না, আবার হাত পা ব্যথা, মাথা ব্যথা, মেজাজ খিটখিটে করবা, এবং বন্ধুমহলে গিয়ে নিজের জাহেলপনা অনুযায়ী জোক্স বানাবে, নারীর মন ঈশ্বরও বোঝে না। ক্যামনে বুঝবে? পিরিয়ড এ যে মুড সুইং হয় সেটা তো আগে জানতে হবে। পুরুষ নাকি অনেক রাগী? পুরুষ রাগলে নাকি বাদশা? তাদের নাকি রাগ কন্ট্রোল হয় না। প্রতি মাসে কয়টা খুন হতো আইডিয়া আছে কারো, যদি নারীদের রাগ/মুড কন্ট্রোল করার ক্ষমতা না থাকতো।

যেহেতু দাগ দেখলে একটা ছি ছি কার পরে যায়, তাই নারীরা অজুহাত দেখায় যে তার একটু ইয়ের সমস্যা হয়েছে, এবং সে বাসায় চলে যেতে চায়। কারণ স্কুলে কলেজে, অফিসে কোনো বাথরুমে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা থাকে না, যেটা ব্যবহার করে এই হুট করে সমস্যায় পরলে তা সমাধান করা যায়। রাস্তা ঘাটে ভালো টয়লেটই থাকে না, আর পিরিয়ডের জন্য সুব্যাবস্থা! চা-ই পায় না, আবার চানাচুর।

ফার্মেসির দোকানে, স্যানিটারি প্যাড কিনতে যান, দোকানদার এটাকে অন্য কাগজে মুড়িয়ে দেয়। যেমনটা মুড়িয়ে দেয়, কনডম, কন্ট্রাসেপ্টিভ পিলস, প্র্যাগন্যান্সি টেস্ট কীট। ওকে ফাইন, আপনার প্রাইভেসি রক্ষা করছেন তারা। ও রিয়েলি! এজ ইফ কেউ জানে না যে এই ব্যাপারগুলো পৃথিবীতে আছে।

আমার এক আন্টি এসে আমাকে একবার বলল, ‘তুমি নাকি ফেসবুকে পিরিয়ড, যৌন হয়রানি এইসব নিয়ে লিখো! ছিঃ এইসবের কী দরকার। তোমার লেখার দরকার কী?’ প্রথম কথা হচ্ছে, এই ব্যাপারগুলো ‘ছিঃ’ না, প্রতিটি ব্যাপার মানব জীবনের সাথে প্রাকৃতিক ভাবে সম্পর্কিত। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমি এগুলো নিয়ে লিখি কারণ সমাজ এইগুলোকে , ট্যাবু করে রেখেছে। এই ট্যাবু ভাঙতে হবে। ট্যাবু ভাঙ্গতে হলে, প্রকাশ্যে কথা বলতে হবে।

নাহ যৌন হয়রানীর উদ্দেশ্যে, নারী কলিগ কিংবা সহপাঠীকে টিটকারী মারার জন্য কথা বলতে হবে না। বলতে হবে, পুরো ব্যপারটাই যে ওই হাঁচি কাশি, জ্বর আসা, এবং মাথা ব্যথার মতোই স্বাভাবিক, পুরো ব্যাপারটাই যে ওই ঘুম থেকে দেরীতে ওঠার মতোই একটা কথা সেই জন্য। কেউ যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছেন? আপনার জ্বর আসলে যেমন করে বলেন, এই জ্বর হয়েছে, তেমনি ভাবে বলতে হবে, আমার পিরিয়ড হয়েছে।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে