NarayanganjToday

সীমান্ত প্রধান

কবি ও সংবাদকর্মী

অবিভক্ত ভারতবর্ষে নারী আন্দোলন ও বাঙালি নারীর শিক্ষা


পর্যায়ক্রমে ১৬৪৭, ১৭৯১ ও ১৮৪০ সালে নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডসহ বেশ ক’টি উন্নত দেশর কিছু সংখ্যক নারী। ষোড়শ-শতক, সপ্তদশ-শতক ও অষ্টাদশ-শতকে নারী অধিকার নিয়ে চলমান আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বের কিছু কিছু স্থানে নারীরা তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয় এবং অনেকাংশে কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও এর থেকে পিছিয়ে ছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষ।এরমধ্যে ব্যতিক্রম ছিল দক্ষিণ ভারতের কেরলা রাজ্য। এখানে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাঙ্গেলি নামের এক গ্রাম্য নারী ১৮০৩ সালে নিজের জীবন বিসর্জনের মাধ্যমে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম আঘাত হানেন এবং নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠাও করে যান।

ভারতবর্ষে নারীরা ছিল সব থেকে বেশি নির্যাতনের শিকার। এখানকার নারীদের মধ্যে শিক্ষা না থাকায় নিজ অধিকার নিয়ে তেমন একটা সচেতন ছিলেন না তারা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে কথাও বলতে সাহস দেখাতেন না। ফলে পুরুষের তৈরি করা নিয়মের মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখতেন এখানকার নারী সমাজ।

অবিভক্ত ভারতবর্ষে নারীকে সেবাদাসী, যৌনদাসী ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু ভাবা হত না। যার ফলে এখানে নারী নির্যাতনের চিত্র ছিল বিশ্বের যে কোনো স্থান থেকেও ভয়াবহ। এখানে নারী অবদমনের জন্য উৎকৃষ্ট হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হত ধর্মকে। এই ধর্মের দোহায় দিয়ে এখানকার নারীদের জন্য ‘সহমরণ’, ‘সতীদাহ’র মত জঘন্যতম প্রথার প্রচলন ছিল। এছাড়া তৎকালীন বাঙলায় নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই বলে কি এখানে নারী আন্দোলন হয়নি, প্রতিষ্ঠিত হয়নি নারী অধিকার?

ভারতবর্ষে নারী অধিকার নিয়ে প্রথমে কোনো নারী সোচ্চার না হলেও ১৮১৮ সালে রাজা রামমোহন রায় কিন্তু নারী অধিকারের পক্ষে অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রথম নারীবাদী ব্যক্তি হিসেবে সোচ্চার হয়ে উঠেন। আর তিনিই সেসময় সর্বপ্রথম ‘সহমরণ’ এবং ‘সতীদাহ’ প্রথা বিলুপ্তির জন্য কলকাতায় জনমত তৈরিতে ব্যাপকভাবে কাজ করেন। যার ফলে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিং এটিকে ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ প্রথা উল্লেখ করে তা বিলুপ্তির আইন পাস করেন।

রাজা রামমোহন রায়ের দেখাদেখিতে নারীদের পক্ষে নারী শিক্ষায় এগিয়ে আসেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, রাজা রাধাকান্ত দেবসহ আরো বেশ কিছু উদার মতের মানুষ। ফলশ্রুতিতে ১৮২২ সালে রাধাকান্ত দেবের উৎসাহে গৌরমোহন তর্কালঙ্কার ‘স্ত্রী শিক্ষা বিধায়ক’ শিরোনামে একটি বইও লিখেন।

এতো কিছুর পরও নারীমুক্ত হতে পারেনি। নারীকে বারবারই অবদমিত করা হচ্ছিল। আর এই অবদমিত করার মূল হাতিয়ার হিসেবে ভারতবর্ষে ব্যবহার করা হত ধর্মকে। ধর্ম দ্বারা নারীকে বেঁধে রাখা হত চার-দেয়ালের মধ্যে। ধর্মের শিকল পরিয়ে নারীকে নিপীড়ন-নির্যাতন করা হত। তবে ধর্মীয় এই নিপীড়ন থেকে নারীকে রক্ষা করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসেন মানবতার অনন্য ব্যক্তিত্ব ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।

ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫০ সাল থেকে শুরু করে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিধবা বিয়ের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন এবং এর স্বপক্ষে তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষকে সংগঠিত করেন। ওই সময় ঈশ্বর চন্দ্রবিদ্যাসাগরের কল্যাণে বিধবা বিয়ে প্রথার শুভ-সূচনা হয়। ফলশ্রুতিতে ভারতবর্ষে বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইন পাস হয় ১৮৫৬ সালে। এরপর ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত এই আইনটিকে সমাজসিদ্ধ করার জন্য বিদ্যাসাগর ৬০টি বিধবা বিয়ে সম্পন্ন করেন।

শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৮১৮ সালে তৎকালীন বাঙলায় নারী শিক্ষার সূচনা হয়। সেসময় লন্ডন মিশনারি সোসাইটির সদস্য রবার্ট মে কলকাতার চুঁচুড়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এরমধ্য দিয়ে চার্চ মিশনারি সোসাইটি এই শিক্ষা কার্যক্রম প্রসারে এগিয়ে আসে। নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে চার্চ মিশনারির সহায়তায় মিস মেরী অ্যান কুক ১৮২৩ সাল থেকে শুরু করে ১৮২৮ পর্যন্ত কলকাতা ও এর আশেপাশে ৩০টির মত বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। ১৮৪৯ সালে অক্সফোর্ডের মেধাবী ছাত্র জে ই ডি বেথুন তার সমস্তসম্পদ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেথুন স্কুল’ যা বর্তমানে ‘ভিক্টোরিয়া গার্লস হাই স্কুল’। এই স্কুলটি ওই সময় নারী শিক্ষায় সব থেকে বেশি অবদান রাখে।

এছাড়া কেশব চন্দ্র সেন তার কয়েকজন শিষ্য ১৮৬৩ সালে উমেশচন্দ্র দত্তের নেতৃত্বে ‘বামাবোধিনী সভা’ স্থাপন করেন। একই বছরে তারা ‘বামাবোধিনী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তৎকালীন সময়ে বাঙালি নারী আন্দোলনে এ পত্রিকাটির ভূমিকা ছিল অসামান্য। বাঙলায় নারী আন্দোলনকে সংগঠিত করতে ১৮৬৯ সালে ঢাকায় আসেন কেশব চন্দ্র সেন। তারই সাহায্যে এর দুই বছর পর তথা ১৮৭১ সালে ‘ঢাকা শুভসাধনী’ নামে সমাজ সংস্কারক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এই সমিতর উদ্যোগেই ১৮৭৩ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মত স্থাপতি হয় প্রাপ্ত বয়স্কা নারীদের জন্য একটি স্কুল।

১৮৭৬ সালে মেরি কার্পেন্টার ঢাকায় এসে স্কুলটি পরিদর্শন করেন এবং এর ব্যবস্থাপনা দেখে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত হন। সেই সাথে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা করে সরকারের কাছে একটি চিঠিও লিখেন। সেই প্রশংসাপত্রের পরই তৎকালীন সরকার ১৮৭৮ সালের জুন মাসে এটিকে বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করে। এবং তত-সময়কার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এ্যাশলি ইডেনের নামানুসারে স্কুলটির নামকরণ হয় ‘ইডেন গার্লস হাই স্কুল’। এরপর একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্কুলটি সরকারি করা হয়। নানা ইতিহাসের সাক্ষী এই স্কুলটিই আজকের ‘ইডেন কলেজ’।

নারীদের কল্যাণে কাজ করার উদ্দেশ্যে স্বর্ণকুমারী দেবী ‘সখি সমিতি’ নামে একটি নারী কল্যাণমূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৮৫ সালে লাঠি এবং অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার কাজ করেন। ১৮৮৯ সালে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে ৬ জন নারীর যোগদানের কথা শোনা যায়। এরমধ্যে সরোজিনী নাইডু ও সরলা দেবী চৌধুরানী প্রমুখ নারী নেত্রী সেসময় কংগ্রেসের রাজনীতিতে অন্তুর্ভূক্ত হন।

ভারবর্ষের নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বলা হয়ে থাকে মহারাষ্ট্রের পণ্ডিত রমাবাঈকে। তিনি পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এবং নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৮৮৯ সালে প্রথমবারের মত প্রকাশ্যে আন্দোলনে নামেন। সেসময় রমাবাঈ নারীমুক্তির বিষদ তুলে ধরে পুনায় একটি ভাষণও দিয়েছিলেন।

এছাড়া সরলা দেবী চৌধুরানীকে বাঙলায় প্রথম নারীবাদী বলা হয়ে থাকে। তিনি ১৯১০ সালে সর্বভারতীয় ‘স্ত্রী মহাম-ল’ নামে একটি নারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙলায় বেগম রোকেয়ার উত্থান হয়। তিনি ছিলেন নারী আন্দোলনের অনন্য এক নারীবাদী প্রবক্তা। তার সমগ্র জীবন ও সকল কাজকর্ম নারী অধিকারের জন্য উৎসর্গ ছিল। তিনি পুরুষদের উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘আপনারা কি কোনদিন আমাদের দুর্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য জগতে আমরা কি? দাসী! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসা উঠিয়া গিয়াছে শুনিতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? না। আমরা দাসী কেন? কারণ আছে।’

সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে বেগম রোকেয়া, সরলা দেবী ও পণ্ডিত রমাবাঈ হলেন ভারতবর্ষের নারী আন্দোলনের জননী। এছাড়া অবিভক্ত ভারতবর্ষে নারী আন্দোলন তথা কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হওয়া অগ্রজদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম ইতিহাসের পাতায় আজও স্মরণীয়।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে