NarayanganjToday

সীমান্ত প্রধান

কবি ও সংবাদকর্মী

‘পতিতা’ বা ‘বেশ্যা’ শব্দের বিপরীত কী?


‘পতিতা’ শব্দটি নিয়ে আমার ঘোর আপত্তি আছে। মূলত যারা যৌনকর্মী তাদেরকেই এই সমাজ পতিতা বলে সম্বোধন করে। আসলে এই শব্দটি একটা গালির মতো। আমার কাছে অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটা শব্দ হচ্ছে এটি। এই সমাজের সমাজপতি বা ভদ্দরনোকেরা যাদেরকে এই শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেন, করার চেষ্টা করেন, আদতে তারা কি সত্যি সত্যিই পতিতা? এই প্রশ্নের উত্তরের আগে পতিতা শব্দটি নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা অত্যাবশ্যক।

‘পতিতা’ বিশেষণ এবং বিশেষ্য দুই পদেই ব্যবহার করা যায়। শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের বিশেষণ পদে অর্থ দাঁড়ায় ‘ভ্রষ্টা’ ‘কুলটা’ ‘কুচরিত্রা’ এবং বিশেষ্য পদে ‘বেশ্যা’। এবার একটু দেখা দরকার ‘পতিতা’ শব্দ খেকে যেসব প্রতিশব্দ পেলাম, সেসবের অর্থ কী দাঁড়ায়।

‘ভ্রষ্টা’ স্ত্রীলিঙ্গ। এর কয়েকটি প্রতিশব্দ আছে। সব কটিই নারীকে কেন্দ্র করে। যেমন, ‘ছিনাল’ ‘ব্যভিচারী’ ‘ভ্রংশ’ ‘স্খলিত’ ‘দোষযুক্ত’ ইত্যাদি। ‘কুলটা’ ‘কুচরিত্রা’ শব্দেও অনুরূপ প্রতিশব্দ বা কাছাকাছি প্রতিশব্দ পাওয়া যায়, যাবে।

‘বেশ্যা’ স্ত্রীলিঙ্গ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই শব্দটি পুরুষতান্ত্রিক জঘন্য রকমের মনঃবৃত্তি, মনঃবাঞ্ছা পুরণে নারীকে দমিয়ে রাখার প্রধান একটি হাতিয়ার যা সর্বাধিক প্রচলিত শব্দ। এই শব্দের আরও কিছু প্রতিশব্দ রয়েছে। যেমন, ‘গণিকা’ ‘দেহোপজীবিনী’ ‘বারাঙ্গনা’ ‘বারনারী’ ইত্যাদি।

‘পতিতা’ বলা হয় তাদের, যে সমস্ত নারী একাধিক পুরুষের সঙ্গে অর্থ বা অন্য কোনো কারণে যৌন-কাম বাসনা চরিতার্থ করেন তারা পতিতা। আবার স্বেচ্ছায় যে সমস্ত নারী এমন একটি পদ্ধতি বেছে নেন তারাও পতিতা। তবে প্রশ্ন থাকে, কজন নারী স্বেচ্ছায় এই পথে আসেন, আসতে চান?

‘বেশ্যা’ বোঝানো হয়, যে নারী বেশ বা সাজসজ্জা দ্বারা পুরুষদের প্ররোচিত করে প্রলোভিত করে তারাই বেশ্যা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘পতিতা’ বা ‘বেশ্যা’ শব্দের বিপরীত কী? পাবেন না। পতিতা বা বেশ্যা শব্দের বিপরীত অর্থাৎ পুরুষবাচক কোনো শব্দ নেই। এর মানে হচ্ছে, একজন নারী একাধিক পুরুষের সংস্পর্শে গেলে সে পতিতা বা বেশ্যা। আর পুরুষ একাধিক নারীর সংস্পর্শে গেলেও সে কিছুই হয় না! তার জন্য কোনো শব্দ নেই। তাকে কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় না। কি অদ্ভুত এক ব্যাপার, তাই না!

অথচ, পতিতা বা বেশ্যা বানানোর মূল কারিগরই হচ্ছে পুরুষ। পুরুষ তার যৌন-কাম বাসনা চরিতার্থের জন্য; নারীকে নানা ভাবে প্রলুব্ধ করে, প্রতারিত করে, ফাঁদে ফেলে, জোর করে বা ফুঁসলিয়ে এই পথে নিয়ে আসে। যা বহু বছর আগের থেকেই এই প্রথা চলে আসছে। যার কারণে পতিতাবৃত্তিকে প্রাচীন বলা হলেও এটিকে এই বাংলায় পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এখনও এখানে তাদেরকে ‘পতিতা’ বলে গালি দেওয়া হয়। ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেওয়া হয়। যা আমাদের মানসিকতার দীনতা।

যাদেরকে এই সমাজ পতিতা বলে, যাদের আবাস্থলকে যারা পতিতাপল্লী বলেন এই তারাই প্রকাশ্যে বা গোপনে তাদের কাছে যাচ্ছেন। যৌন-কাম বাসনা কেউ চরিতার্থ করছেন তো কেউ বা তাদের দিয়ে ব্যবসা করছেন। তাদের কামাইয়ে ভাত খাচ্ছেন। বিলাসিতা করছেন। অট্টালিকা করছেন। এসির বাতাস খেয়ে আয়েশি জীবন যাপন করছেন। আবার তাদেরকেই এরা তামশা করে, তাচ্ছিল্যতায় কটাক্ষ করছেন! এক ঘরে করে রাখছেন। সামাজ থেকে, সামাজিকতা থেকে দূরে রাখছেন।

আমার কাছে তারা অন্তত পতিতা বা বেশ্যা নন, যৌনকর্মী। অন্যান্য আট দশটি পেশার মতো এটিকেও পেশা বলেই মনে করি। এই কর্ম পদ্ধতির মধ্য দিয়েই একটা শ্রেণী জীবন জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা কেউ স্বেচ্ছায় এই পথে আসেনি। অথবা যারা এসেছে তারা জীবন জীবিকার তাগিদে এসেছেন। তাহলে এটি কর্ম কেন হতে পারে না, তারা কেন যৌনকর্মী হতে পারে না?

তাদেরকে আইনী স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। তাদের মানবাধিকার দেওয়া দরকার। তাদেরকে সমাজচ্যুত না করে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসা দরকার। আর এসব করা গেলে অন্তত জোর, জবরদস্তি, প্রতারণা, ফাঁদে ফেলে নারীকে এই পথে নিয়ে আসার যে প্রবণতা সমাজে রয়েছে তা বন্ধ হবে। আবার কেউ চাইলে এই পেশা স্বেচ্ছায় বেছে নিতে পারবে।

বর্তমানে যেমন অনেক পুরুষ যৌনকর্মী রয়েছে। তাদেরকে ‘জিগালো’ বলা হয়। ভারতে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে জিগালোরা খদ্দের খুঁজেন। বিজ্ঞাপনহীন বাংলাদেশেও আছে। তবে, এ দেশে জিগালোর সংখ্যা পার্শ¦বর্তী ভারতের তুলনায় খুবই কম। যৌনতা যেহেতু স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। মনুষ্য জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে কোনো না কোনো ভাবে মানুষ তার এই বাসনা চরিতার্থ করেন, তাহলে এটাকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সমস্যাটা কোথায়?

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে