NarayanganjToday

রফিউর রাব্বি

সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

চে’র আগুন ছড়িয়ে গেছে সবখানে


মৃত্যু যে অমরত্ব নিয়ে আসে একথাটি চে’র ক্ষেত্রেই হয়তো বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। এবং যত দিন যাচ্ছে এ সত্য যেন ততই সার্বজনীনতা পাচ্ছে। চে আজকে আর্জেন্টিনা, কিউবা বা ল্যাতিন আমেরিকা নয় তিনি সারাবিশ্বে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। প্রতীক হয়ে উঠেছেন তারুণ্যের বিদ্রোহের, নতুনের আবাহনের।

মার্কিন মদদপুষ্ট বলিভিয়ার স্বৈরশাসক রেনে বারিয়েন্তোসের বিরুদ্ধে বলিভিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে যুদ্ধ করতে করতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন চে গুয়েভারা। তারপর তাঁকে বন্দি করে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যা করার পূর্বমুহূর্তে এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, ‘তুমি এখন কী ভাবছ?’ চে’র উত্তর- ‘আমি বিপ্লবের অমরত্বের কথা ভাবছি।’ মৃত্যুর ন’দিন পর হাভানার রেভলিউশন স্কয়ারে হাজার জনতার উদ্দেশ্যে ফিদেল ক্যাস্ত্রো বললেন, ‘আমাদের সন্তানেরা কার মতো হয়ে উঠলে আমরা খুশি হবো- এ প্রশ্ন করা হলে অন্তরের অন্তস্থল থেকে আমাদের উত্তর হবে, ওরা যেন চে’র মতো হয়।’

১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনায় চে’র জন্ম। উত্তরাধিকারসূত্রেই বিপ্লবী চরিত্র পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা ডন আর্নেস্টো এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমার ছেলের শিরায় শিরায় আইরিশ বিদ্রোহী, স্পেনিশ রাজ্যদখলকারী এবং আর্জেন্টিনার দেশপ্রেমিকদের রক্তই প্রবাহিত। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, চে আমাদের অস্থির পূর্বপুরুষদের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছিল। তার প্রকৃতির মধ্যেই এমন কিছু ছিল যা তাকে দূরদেশ ভ্রমণ, বিপজ্জনক অভিযানে এবং নতুন ভাবধারার দিকে টানতো।’ ১১ বছর বয়সে গোপনে ট্রাকের পিছনে চড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ভ্রমণে। দক্ষিণ আমেরিকার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তের দেশগুলো ঘুরেছেন সাইকেলে চড়ে। ভেলায় চড়ে আমাজন নদী পাড়ি দিয়েছেন। পেরু থেকে বাবাকে লিখেছেন, ‘যদি এক মাসের মধ্যে আমার কাছ থেকে কোন খবর না পাও তাহলে বুঝবে- হয় আমাদের কুমিরে খেয়েছে অথবা আমরা মানুষখেকো ইন্ডিয়ানদের হাতে বন্দি হয়েছি। এরা আমাদের মুণ্ডু কেটে আমেরিকান ভ্রমণকারীদের কাছে বিক্রি করবে। সেক্ষেত্রে নিউইয়র্কের স্মারকদ্রব্যের দোকানগুলোতে আমাদের কাটা মুণ্ডুর খোঁজ করতে পারো।’

প্রচলিতের বাইরে দাঁড়ানো, স্রোতের বিপরীতে চলার এক দুনির্বার আকর্ষণ শৈশব থেকেই চে’কে অস্থির করে রেখেছে। আর এ অস্থিরতা তাঁকে রূপান্তরিত করতে করতে বিপ্লবের বরপুত্রে পরিণত করেছে। ‘বিপ্লব মানুষের মনকে বিশুদ্ধ করে, অভিজ্ঞ কৃষক যেভাবে তার ফসলকে ত্র“টিমুক্ত করে উচ্চমানের শস্য ফলায় সেইভাবে মানুষকে বিপ্লব উন্নতমানের ক্ষমতাসম্পন্ন করে তোলে।’ গুয়েতেমালার এক পাহাড়ে বন্ধু পাতোজোর মৃত্যুতে চে তার স্মরণে লিখিত এক নিবন্ধে এ কথাগুলো বলেছিলেন। একজন আজন্ম বিপ্লবী পুরুষ, শৈশব থেকেই অজানাকে জানা, পুরাতনকে চিরে দেখার নেশায় মানুষের দুঃখ ও দারিদ্রের সাথে একাত্ম হয়ে এ থেকে বের হবার পথ অনুসন্ধানে ব্রত হয়েছিলেন। পেরুর কুয়েছুয়া ও আইমারা আদিবাসীদের অসহনীয় দারিদ্র্য, জমিদার ও প্রসাশন কর্তৃক অত্যাচারিত ও শোষিত হয়ে ক্ষুধায় বিষাক্ত কোকো গাছের পাতা ভক্ষণ। বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পানামা, কোস্টারিকা, সালভাদর ও ল্যাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন উপজাতি ও আদিম অধিবাসী ও জনগণের দুঃখ-দুর্দশা ও সংগ্রাম চে’কে বিচলিত করেছে, একাত্ম করেছে তাদের নিজেদের সাথে।

১৯৫০ সালে গুয়েতেমালায় প্রগতিশীল আরবেন্জ সরকার ক্ষমতায় এলে অর্থনীতিতে বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। আমেরিকা তখন ‘মধ্য আমেরিকার লাল ঘাঁটি, কমিউনিস্ট সরকার’ ইত্যাদি বলে প্রকাশ্যে এর বিরোধীতা শুরু করে। প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে আরবেন্জ সরকারকে রক্ষা করার জন্য চে গুয়েতেমালা গেলেন। তখন ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বিভিন্ন সহযোদ্ধাদের সাথে চে’র সেখানে পরিচয় ঘটে। এবং সেখানেই চে মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। ডায়েরিতে চে বলেছেন, গুয়েতেমালা থেকেই তাঁর বিপ্লবী জীবন শুরু। সশস্ত্র আক্রমণ করেও ব্যর্থ হয়ে পরে আমেরিকা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আরবেন্জ সরকারকে ১৯৫৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত করে। আরবেন্জ সরকারের পতনের পর সেখান থেকে মেক্সিকো চলে যান চে। কারণ তখন ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও তাঁর সহযোদ্ধারা সেখানেই ছিলেন। সেখানে চে ফিদেলের বিপ্লবী ইউনিটে যোগ দেন এবং বাতিস্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ১৯৫৬’র শেষ দিকে ফিদেলের নেতৃত্বে ৮১ জন বিপ্লবীর সাথে ‘গ্রানমা’ জাহাজে চড়ে কিউবার উদ্দেশ্যে মেক্সিকো ত্যাগ করেন। কিউবাতে তখন প্রচণ্ড আলোড়ন চলছিল। বাতিস্তা সরকারের দমন, নিপীড়ন, নির্যাতন ও স্বৈরশাসন আর চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা। কিছুদিন পরে গ্রানমা কিউবার সান্তিয়াগোর উপক‚লে এসে ভিড়লো। সিয়েরামায়েস্ত্রা পর্বতে বিপ্লবীরা ঘাঁটি স্থাপন করে সেখান থেকে যুদ্ধ শুরু করেন। প্রায় দু’বছরের সশস্ত্র সংগ্রাম চে’র জীবনে বিরাট পরিবর্তন এনেছিল। কিউবার বিপ্লব তাঁর জীবনবোধকে এক স্বতস্ফ‚র্তঃ মুক্তধারায় সম্মিলিত করে দিয়েছিল। বিপ্লবের কাছ থেকে তিনি পেলেন এক নতুনতর দীক্ষা। ‘সত্যিই বিপ্লব আমাদের টে টে-কে পাল্টে দিয়েছিল। সে একজন দৃঢ়চেতা যোদ্ধা এবং একজন নিরলস কর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। এর পরিবর্তন সম্পর্কে আমরা সুনিশ্চিত হলাম যখন ‘স্বাধীনতার দ্বীপে’ (কিউবা)’ উপস্থিত হয়ে আমরা তাঁর সাক্ষাৎ পেলাম। সেখানে যে সমস্ত প্রশ্নগুলো তাঁকে বিচলিত করতো আজ সে সেগুলোর উত্তর খুঁজে পেয়েছে।’ বাবা, মা ও কিছু বন্ধুরা চে’কে টে টে বলে ডাকতো। চে সম্পর্কে বন্ধু আলবার্তো একথাগুলো উলে­খ করেছিলেন। ফিদেল বলেছেন, ‘সাম্রাজ্যবাদের প্রতি চে’র ব্যাপক ও গভীর ঘৃণা ও অবজ্ঞার উৎস কেবল তাঁর পূর্ণমাত্রায় বিকশিত রাজনৈতিক সচেতনতাই নয়, কিছুদিন আগে গুয়েতেমালায় অবস্থানকালে তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের নির্মম আগ্রাসনের নীতি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেখানে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীর সামরিক অনুচরেরা বিপ্লবকে নির্মমভাবে দমন করেছিল।’

স্পেনিশদের বিরুদ্ধে শতবর্ষ আগে অনুষ্ঠিত কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী ও কবি জোসে মার্তি ও পাবলো নেরুদার কবিতা ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে চে’কে। যুদ্ধ চলাকালে সিয়েরামায়েস্ত্রা পর্বতে সহযোদ্ধাদের প্রায়ই আবৃত্তি করে শোনাতেন নেরুদার ‘কান্তো জেনারেল’ থেকে কবিতা। তাঁর ডায়েরির বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে জোসে মার্তির কবিতা ও বক্তব্যের উদ্ধৃতি। কবিতা, সাহিত্য ও শিল্পের বড় একটি জায়গায় তিনি বিচরণ করেছেন। তিনি কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। ডায়েরি লিখতেন নিয়মিত। মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত লেখা ডায়েরি থেকে আমরা খুব সহজে বুঝতে পারি বিশ্বমানবতাবাদী, শোষণ-নিপীড়ন ও সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে দৃঢ় প্রত্যয় যুক্ত অকুতোভয় বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে। নিয়মিত বই পড়তেন, এ প্রসঙ্গে বাবা ডন আর্নেস্টো বলেন, ‘সেই চার বছর বয়সে পড়াশোনা আরম্ভ করে এবং জীবনের শেষপর্ব পর্যন্ত সে ছিল একজন অত্যন্ত মনযোগী পাঠক। আমি শুনেছি যে বলিভিয়াতে যুদ্ধ করতে করতে, শত্র“র তাড়া খেতে খেতে এবং হাঁপানির কষ্ট পেতে পেতেও সে কিছু-না-কিছু পড়াশোনা করতো।’ চে’র বাবা ও মা উভয়েই বই পড়তেন। বাড়িতে কয়েক হাজার বইয়ের একটি বড় গ্রন্থাগার ছিল তাঁদের। গ্রন্থাগারের তালিকায় ছিল স্পেনিশ ও রুশ ক্ল্যাসিকস, ইতিহাস, দর্শন, মনস্তত্ত¡, শিল্পকলা বিষয়ক বিভিন্ন বই, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিনের রচনাবলী, ক্রপোৎকিন ও বাকুনিনের রচনাবলী। আর্জেন্টিনার লেখকদের মধ্যে জো হার্নান্দেজ, সারমিয়েন্তো এবং ফরাসী ভাষার বিভিন্ন বই ছিল। চে মায়ের কাছ থেকে ফরাসী ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর বাবা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সকলের মতো চে’রও কিছু প্রিয় লেখক ছিল। শৈশবে সে সালগোরি, জুলভার্ন, ডুমা, ভিক্তর হুগো এবং জ্যাক লন্ডনের লেখা পছন্দ করতো। পরবর্তীকালে সার্ভান্তিস, আনাতোল ফ্রান্সের লেখা পড়তে শুরু করে সে। সে তলস্তয়, গোর্কি এবং দস্তয়ভস্কির রচনাও পড়েছিল। অবশ্য সে সময়ে প্রচলিত প্রায় সমস্ত ল্যাতিন আমেরিকার সামাজিক উপন্যাসগুলো সে পাঠ করেছিল। এদের মধ্যে ছিলেন পেরুর লেখক সিরো আলেগ্রিয়া, ইকুয়েডরের জর্জ ইকাজা ও কলম্বিয়ার জো ইউস্টাসিও রিভেরা। এঁদের উপন্যাসে ল্যাতিন আমেরিকার আদিবাসীদের দুঃখময় জীবনযাত্রা এবং চা ও কফি বাগানের শ্রমিকদের শ্রমদাস প্রথার নিখুঁত ছবি চিত্রিত হয়েছে।’ শৈশব থেকেই কবিতার প্রতি ভালোবাসা ছিলো চে’র। বোদলেয়ার, ভার্লেন, গার্সিয়া লোরকা, আন্তোনিও মাকাডোর কবিতার প্রতি আকর্ষণ ছিল তাঁর। চে মাঝে-মধ্যে কবিতা লিখলেও নিজেকে কখনই কবি বলে মনে করতেন না। স্পেনীয় কবি ও গণতন্ত্রী লিও ফেলিপকে লেখা চিঠিতে নিজেকে ‘অসফল কবি’ বলে উলে­খ করেছেন তিনি। নিজেকে এমন একজন বিপ্লবী বলে ঘোষণা করেছেন যার সাথে কবিত্বর নাকি সম্পর্ক নেই। অথচ জীবনের বেদনাদায়ক পরিসমাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত চে কবিতার সাহচর্য ত্যাগ করেননি। মৃত্যুর পরে তাঁর ‘বলিভিয়ান ডায়েরি’র সাথে পাওয়া গেল তাঁর প্রিয় কবিতাসমূহসহ এক নোটবুক। চিত্রকলার সাথে চে’র সম্পর্কের প্রশ্নে তাঁর বাবা বলেছেন, ‘ছবি দেখতে ভালোবাসতো, শিল্পের ইতিহাসের উপরেও তার ভালো দখল ছিল এবং জলরঙে ছবিও সে খারাপ আঁকতো না। আমার ছেলে ই¤েপ্রশনিস্টদেরই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতো।’ গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতিও প্রবল আকর্ষণ ছিল চে’র। ভালো দাবা খেলতে পারতেন।

কিউবা বিপ্লবের এক মাস পরে ১৯৫৯-এর ফেব্র“য়ারিতে ডন আর্নেস্টোকে ফিদেল লোক পাঠিয়ে হাভানাতে নিয়ে যান। পুত্রের সঙ্গে সেদিনের সাক্ষাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চে কাঠের তৈরি মঞ্চে উঠে আমার সঙ্গে দেখা করলো, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এখন সে নিজেকে চিকিৎসাবিদ্যায় নিয়োজিত করার কথা ভাবছে কি-না। জবাবে সে বললো, আমি আমার ডাক্তার উপাধিটা এখন তোমাকে স্মারক চিহ্ন হিসেবে উপহার দিতে পারি। আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে এতটুকুই বলতে পারি যে, হয় আমি এখানেই থেকে যাবো অথবা অন্য কোন জায়গায় গিয়ে লড়াই করবো।’

কোন কিছুই লক্ষ্য থেকে টলাতে পারেনি চে’কে। বিপ্লবের পরে কিউবার নাগরিকত্ব দেয়া হলো তাঁকে। শিল্পমন্ত্রী ও কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়া হলো। কিন্তু এর কোন কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করলো না। দূর অনাগত কালের বিপ্লবের আহŸান তিনি শুনতে পেলেন। সে সময় ডায়েরিতে লিখলেন, ‘আমি আজীবনের বিপ্লবী, আমি সৈনিক। অত্যাচারে জর্জরিত সারাবিশ্বের মানুষের আকুল আহŸান আমার দু’কানে এসে নিত্য নিয়ত পৌঁছেছে। সাম্রাজ্যবাদের ধ্বজা এখনো সগৌরবে উড়ছে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকায়। শোষণের অক্টোপাসের মরণ কামড়ে সারাবিশ্বের মানুষ এখনো আর্তনাদ করছে।... মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখনো ভিয়েতনামের উপর বর্বোরোচিত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, লাওস, কম্বোডিয়া- কোথাও শান্তির চিহ্নমাত্র নেই। আফিকার প্রতিটি রাষ্ট্র এখনও উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রামে লিপ্ত। তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এখনও অস্বীকৃত। ল্যাতিন আমেরিকার মানুষ নেতৃত্বের অভাবে মুক্তি সংগ্রামে বারবার পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। গুয়েতেমালা, কলম্বিয়া, চিলি, পেরু, উরুগুয়ে, বলিভিয়া আর আর্জেন্টিনার মানুষ বিপ্লবের আগুনে জ্বলছে। এসব ব্যাপারে করণীয় কিছুই কি আমার নেই? কিউবায় সমাজন্ত্রও একটি সুনির্দিষ্ট চেহারা নিয়েছে।... আমার আরও অনেক কাজ বাকি। অনেক কাজে এখনও হাত দেয়া হয়নি।... সাম্রাজ্যবাদ আমার সবচেয়ে বড় শত্র“। শুধু আমার নয়, ল্যাতিন আমেরিকার প্রতিটি রাষ্ট্রের। সেই শত্র“র সাথে পাঞ্জা লড়তে গিয়ে যদি মৃত্যুকে বরণ করে নিতেও হয় তার চেয়ে মহত্তর প্রাপ্তি মানুষের জীবনে আর কী থাকতে পারে?’

১৯৬৫ সালের এপ্রিলে বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে সঙ্গীসহ কঙ্গো যাত্রা করলেন। কিন্তু কঙ্গোতে সফল হলেন না। শত শত বছর ধরে সাদা মানুষদের দ্বারা নির্যাতিত কালো আফ্রিকানদের পক্ষে খুব সহজের সাদা মানুষদেরকে যেমনি বন্ধু ভাবা সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি কঙ্গোয় তখন বিপ্লবের বিষয়িগত বাস্তবতাও গড়ে উঠেনি। চে’র দল পরাজিত হল। তাঁরা আবার হাভানায় ফিরে এলেন। তিনি বললেন, ‘আমার পরাজয়ের দ্বারা বিজয় লাভ যে অসম্ভব তা প্রমাণিত হবে না। মাউন্ট এভারেস্টের সর্বোচ্চ শিখরে উঠবার চেষ্টা করে প্রথমে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এভারেস্ট জয় করা সম্ভব হয়েছে।’ চে’কে ‘দুই, তিন, অনেক ভিয়েতনাম’ সৃষ্টির স্বপ্ন তাড়িত করে টেনে নিলো বলিভিয়া। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে বলিভিয়া যান তিনি। বলিভিয়ার কৃষকদের দুরাবস্থা তখন চরমে। স্বৈরশাসক রেনে বারিয়েন্তোসে ও মার্কিন বাহিনীর অত্যাচারে বলিভিয়ার সাধারণ মানুষের জীবন তখন দুর্বিসহ। ল্যাতিন আমেরিকার সামগ্রিক বাস্তবতায় সে সময়ে চে’র এ সিদ্ধান্তকে ফিদেল সমর্থন করলেন না। কিন্তু কোন বিধি-নিষেধই চে’কে তাঁর লক্ষ্য থেকে কখনও বিচ্যুত করতে পারেনি- কি পরিবার, কি রাষ্ট্র। এটি তাঁর আশৈশবের বৈশিষ্ট। মাত্র পঞ্চাশ জনের বিপ্লবী দল তৈরি করে বলিভিয়ার জঙ্গল থেকে যুদ্ধ শুরু করলেন। চে’র দল বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি বা গ্রামের কৃষকদের সমর্থন পেল না, সহযোগিতা পেল না শহরের সাধারণ মানুষদের। কিছুদিনের মধ্যেই চে’র দলের কয়েকজন পালিয়ে গেল, কেউবা বিশ্বাসঘাতকতা করে দলের অবস্থান জানিয়ে দিল শত্র“ সেনাবাহিনীকে। মার্চ মাসে সেনাবাহিনী বিপ্লবীদের ঘাঁটি দখল করে নিলে তাঁরা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। চারদিক থেকে সেনাবাহিনী ঘিরে ফেললো গেরিলাদেরকে। চে’র দল আশ্রয় নিল গ্রাম লা হিগুয়েরার পর্বতের চূড়ায়। সহযোদ্ধাদের হারাতে হারাতে অক্টোবরে চে’র দলের সংখ্যা এসে দাঁড়ালো ১৬ তে। ৮ অক্টোবর ক্যাপ্টের পেদ্রোর নেতৃত্বে লা হিগুয়েরার কাছে গিরিসংকট কুয়েব্রাডা ডি ইউরোর চূড়ায় অবস্থান নিল। আর সেখান থেকেই তারা গেরিলা দলকে দেখতে পেল। চে’র দল বিপদ বুঝতে পেরে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিরিসংকট থেকে নামতে থাকলে সার্জেন্ট বার্নার্ডিনো হুয়ানকা গেরিলাদের দিকে গুলি ছুঁড়তে থাকলে একটা গুলিতে মাথার টুপি উড়ে যায়, আর দুটো গুলি পায়ে বিদ্ধ হয় চে’র। নিচে পড়ে যান তিনি। চারদিক থেকে সেনাবাহিনী গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসে। ধরে ফেলে আহত চে’কে। রাতে বন্দি করে কম্বলে মুড়ে হিগুয়েরার একটি মাটির স্কুলে নিয়ে আসে তাঁকে। ৯ অক্টোবর দুপুরে সার্জেন্ট টেনার কারবাইন থেকে গুলি ছুঁড়ে ঝাঁঝড়া করে দেয় আর্নেস্টো চে গুয়েভারার হাত, পা ও বুক। চে’র হাত দুটো কেটে তাঁর লাশ গায়েব করে ফেলে তারা। মৃত্যুর দু’বছর পরে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সংরক্ষিত চে’র হাত দুটো কিউবায় পৌঁছায় আর ত্রিশ বছর পর ১৯৯৭ সালে কিউবা ও আর্জেন্টিনার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল বলিভিয়ার ভ্যালেগ্রান্দেতে হাতবিহীন চে এবং তাঁর সঙ্গীদের দেহাবশেষ সনাক্ত করে। চে’র দেহ কিউবায় নিয়ে সান্তাক্লারায় পুনরায় সমাহিত করা হয়।

বলিভিয়ার জঙ্গলে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে চে ডায়রিতে লেখেন, ‘সংগ্রামের জন্য আমি প্রস্তুত, হয়তোবা মৃত্যুর জন্যও। তাতে আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আমি জানি, আমার ডাক ল্যাতিন আমেরিকার ঘরে ঘরে পৌঁছেছে, পৌঁছেছে প্রতিটি মানুষের সংগ্রামী প্রাণের গভীরে, পৌঁছেছে কঙ্গোয়, আলজেরিয়ায়, ভিয়েতনামে। আমি কোন বন্ধন মানি না, না রাষ্ট্রের, না পরিবারের। সবকিছু নিঃশেষে ছেড়েছি বলেই সবকিছু পেয়ে গেছি আমি। পেয়েছি অসংখ্য মানুষের অন্তরের একান্ত ভালোবাসা, শুনেছি বিপ্লবের অমোঘ আহ্বান সংগীতের মূর্ছনার মতো যা আমার জীবনকে সুধাময় করে তুলেছে। মনে পড়ছে জোসে মার্তির সেই ভবিষ্যৎ বাণী- চুলি­তে আগুন জ্বালানো হয়েছে, এখন চারদিকে আলো ঠিকই পড়বে।... বলিভিয়ার জঙ্গলে শুয়ে শুয়েই দেখতে পাচ্ছি একা নই, আমরা কয়েক জন নই, আমরা লক্ষ লক্ষ, আমরা কোটি কোটি।’

সেদিন যে ল্যাতিন আমেরিকা ও ক্যারাবিয়ান অঞ্চলে ছিল একা ফিদেল আর একটি মাত্র দ্বীপ কিউবা কিন্তু আজ ল্যাতিন আমেরিকার দেশে দেশে ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হচ্ছে মার্কিন বিরোধী লড়াই। যে বলিভিয়ায় হত্যা করা হয়েছে চে’কে আজ সে বলিভিয়ার পার্লামেন্ট, ভ্যানিজুয়েলা, ব্রাজিল, নিকারাগুয়া, উরুগুয়ে ও কিউবার সরকারি অফিসগুলোতে স্থাপিত হয়েছে চে’র ছবি। চে’র প্রিয় শ্লোগান ছিল ‘হাস্তা লা ভিক্তোরিয়া সিয়েম্প্রে’ (বিজয়ের পথে অগ্রসর হও)। আজকে শুধু ল্যাতিন আমেরিকা নয়, এশিয়া, আফ্রিকার নির্যাতিত দেশগুলোতেও চে’র স্লোগানকে বুকে ধরে কোটি কোটি মানুষ লড়াই করছে। চে’র আগুন আজ ছড়িয়ে গেছে সবখানে। চে’র পুনরুত্থান ঘটেছে। পুনরুত্থান ঘটেছে যিশুর মতো।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে