NarayanganjToday

সীমান্ত প্রধান

কবি ও সংবাদকর্মী

যৌন-নিপীড়ক নয়, হেনস্থার শিকার ছাত্রীই দোষী!


আমাদের এই সমাজ পুরুষতান্ত্রিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথবা আমাদের সমাজপতিরা যে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারণায় সমাজটাকে চালনা করতে চায়, এতেও দ্বিমত নেই। তবে, দ্বিমতটা তখনই এসে যায়, যখন জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী কোনো সংসদ সদস্য আইন বহির্ভূত ভাবে পুরুষতান্ত্রিক ধারণায় বিচার বিশ্লেষণে মন্তব্য করেন। তখন বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না, কেননা, তারা আইন প্রণেতা। তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, তারা কীভাবে আইনের বাইরে কথা বলেন!

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন-হয়রানির ঘটনা ঘটে। শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী যৌন হয়রানির ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনজন শিক্ষক গ্রেফতারও হয়েছে। এর আগে এমন আরও ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ বন্দর উপজেলার নাগিনা জোহা উচ্চ বিদ্যালয়েও এমন একটি বিশ্রি ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার চেয়ে মানববন্ধন পর্যন্ত করেছে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এমনকি প্রতিবাদ, বিচার চাওয়া শিক্ষার্থীরা অপর শিক্ষাক দ্বারা শারীরিক লাঞ্ছিতও হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

নাগিনা জোহা হচ্ছেন সাংসদ সেলিম ওসমানের মা। এবং সাংসদ তার মায়ের নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং এর ব্যয় সাংসদ নিজেই বহন করেন। যা প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তার এমন উদারতা নিঃসন্দেহে মানুষকে আলোর পথেই ধাবিত করবে। কিন্তু তার স্কুলে ঘটে যাওয়া যৌন-হয়রানির ঘটনার জন্য অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করলেও এই ঘটনার জন্য তিনি ভুক্তভোগি ছাত্রীটিকেই দুষেছেন। তার দাবি, ‘ওই ঘটনার জন্য ছাত্রটিই আসল দোষী!’

২৫ জুলাই নবীগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওই ছাত্রীকেই দোষী হিসেবে হাজারও মানুষের সামনে নিজের মত তুলে ধরেছেন। যা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইন সিদ্ধও নয়। এমনকি ‘ওই ছাত্রীটিই আসল দোষী’ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আইন সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতাকে উপস্থাপন করেছেন বলেই মনে করি।

‘ধর্ষণ’ কী, আমরা যদি এ সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করি এবং আইন কী বলে তার ব্যাখ্যা যদি করি তবে, ধর্ষণের সংজ্ঞা দাঁড়াচ্ছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ইচ্ছেতে, অনিচ্ছেতে এবং মানসিক প্রতিবন্ধি নারীর (প্রাপ্তবয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক) ইচ্ছেতে বা অনিচ্ছেতে ‘যৌন-সঙ্গম’ মানেই ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে নাগিনা জোহা উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই ছাত্রীটি নিঃসন্দেহে অপ্রাপ্তবয়স্ক। সে ক্ষেত্রে ওই ছাত্রীর ইচ্ছেতেও যদি শিক্ষক আল-আমিন যৌন-সঙ্গমের অভিপ্রায় নিয়ে মিলিত হয়ে থাকেন, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ি ছাত্রী নয়, ওই শিক্ষিকই প্রকৃত দোষী। তারপরও সাংসদ সেলিম ওসমান ওই ছাত্রীটিকেই দোষী বলে দাবি করেছেন!

সব থেকে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষকের কতটা নৈতিক স্খলন ঘটলে অমন বিবেক বর্জিত ঘৃণিত একটি কর্ম সংঘটন করতে পারেন, আবার ছাত্রীকে যৌন-হয়রানির সত্যতা পেয়েও সেই শিক্ষককে আইনের হাতে সোপর্দ না করে, সাময়িক বরখাস্ত করা এবং সর্বশেষ ওই ঘটনার জন্য ছাত্রীটিকেই ‘দোষী’ হিসেবে অখ্যায়িত করে সাংসদের বক্তব্য কতটা যৌক্তিক, গ্রহণযোগ্য? একজন আইন প্রণেতার কাছ থেকে নিশ্চয় অমন বক্তব্য কেউ প্রত্যাশা করি না। তারপরও তিনি মাননীয় (?) অমন বক্তব্য দিয়েছেন এবং ওই মঞ্চে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ গণ্যমান্য (?) ব্যক্তিবর্গরা সে বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে হাততালিও দিয়েছেন! যা আমাদের জন্য মোটেও আশার কথা নয়।

যৌন হয়রানির ঘটনা প্রসঙ্গে সাংসদ সেলিম ওসমানের বক্তব্যটুকু ছিলো, “ওই ঘটনায় আসল দোষী হচ্ছে ওই ছাত্রীটি। কিন্তু আমরা তোমাদেরকে সম্মান দেখিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমরা সকলে বিষয়টি তদন্ত করে পেয়েছি, ছাত্রীটি শিক্ষকের কাছে এসএমএস করেছিল পরীক্ষায় তাকে পাস করিয়ে দেওয়ার জন্য। শিক্ষক ফিরতি এসএমএস এ লিখেছেন ‘তোমাকে পাস করালে আমার কি লাভ?’ তখন ছাত্রী উত্তর দিয়েছে ‘আপনি কি লাভ চান?’ শিক্ষকের পাল্টা উত্তর ‘তিন তলায় কোনার রুমে দেখা করো।’ ওই দিন এক ছাত্র আরেক ছাত্রের (বন্ধু) মানিব্যাগ নিয়ে দৌঁড়ে তিন তলায় গেলে বিষয়টি তাদের নজরে পড়ে। এরপর যা ঘটেছে সেটা পত্রিকায় সবাই দেখেছ।”

সাংসদ তার এই বক্তব্যে ‘কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না’ বলে দাবি করেছেন। তাই স্বাভাবিক নিয়মে একটা প্রশ্ন এসেই যাচ্ছে, কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি কার বিরুদ্ধে নিতে পারছেন না, শিক্ষক নাকি ছাত্রী? বক্তব্যের ধরণে এটুকু বোঝা যায় তিনি ছাত্রী প্রসঙ্গেই বলেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- যদি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, তাহলে কী এমন ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নিতন তিনি, ওই ছাত্রীটিকে বেত্রাঘাত করতেন, স্কুলচ্যুত করতেন, সমাজচ্যুত করতেন, একঘরে করে রাখতেন? যদি তেমন হতো বা এর থেকেও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত তিনি নিতেন, তাহলে কী তার সেই কঠিন সিদ্ধান্তের সারমর্ম, ‘ধর্ষককে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ধর্ষণ হওয়ার অভিযোগে ধর্ষিতার শাস্তি’, দেওয়ার মত হয়ে যেত না?

সমাজের যা কিছু মন্দ তা দূর করে যা কিছু ভালো তার দিকে আমাদেরকে তারা নিয়ে যাবেন, পথ দেখাবেন- একজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে এটুকু প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। আমাদের হয়ে সংসদে কথা বলবেন, এই লক্ষ্যে নিয়েই তাদেরকে নির্বাচিত করে মহান জাতীয় সংসদে পাঠাই। কিন্তু সেই তারা যদি জনসম্মুখে নিপীড়ককে দোষী না বলে হেনস্থার শিকার ছাত্রীটিকেই দোষী বলে আখ্যায়িত করেন, তাহলে এর থেকে পরিতাপের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। আমরা প্রত্যাশা করবো, হেনস্থার শিকার ছাত্রীকে দোষী আখ্যায়িত করে যে বক্তব্যটুকু সাংসদ সেলিম ওসমান দিয়েছেন তা যে ভুল, সেটি তিনি অনুধাবন করুক এবং যৌন নিপীড়ক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিতকরণে তিনি এগিয়ে আসুক এবং সেই শিক্ষককে আইনের হাতে সোপর্দ করুক।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে