NarayanganjToday

শিরোনাম

ব্যবচ্ছেদে মিলিছে বর্ষাকে হত্যার প্রমাণ, পালিয়েছে শ্বশুর বাড়ির লোক


ব্যবচ্ছেদে মিলিছে বর্ষাকে হত্যার প্রমাণ, পালিয়েছে শ্বশুর বাড়ির লোক

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তার বর্ষাকে শারীরিক নির্যাতন করেই হত্যা করা হয়েছে, ময়না তদন্তে এর সুস্পষ্ট প্রমান মিলেছে।

মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) বেলা এগারোটা থেকে দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে দেড় ঘন্টাব্যাপী মরদেহের ময়না তদন্ত শেষে এমনটাই জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. আসাদুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে বর্ষার মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডা. মো. আসাদুজ্জামান জানান, মরদেহের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের সুস্পষ্ট ক্ষত চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া আরো বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেসব পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে মোটামুটিভাবে বলা যায় মেয়েটিকে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ময়না তদন্তের আলামত সমূহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সেখান থেকেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে বর্ষা হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামী মোস্তাফিজুর রহমান নয়নকে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন করে মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের আদালতে পাঠানো হয়। আদালত কাল বুধবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য্য করেছেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম।

ওসি রফিকুল ইসলাম আরো জানান, আসামী নয়নকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার তদন্তের প্রয়োজনে এবং তথ্য উদঘাটনের জন্য তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তাই তাকে রিমান্ডে নেয়ার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আসামী নয়ন বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে। আগামীকাল বুধবার রিমান্ড শুনানির জন্য তাকে আদালতে হাজির করা হবে। তবে হত্যাকান্ডের বিষয়টির সার্বিক দিক থেকে তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্ত শেষে বর্ষার মরদেহ দুপুরে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে বাদ আছর জানাজা শেষে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নে বর্ষার নানা বাড়ি এলাকায় কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। এসময় নিহত বর্ষার পরিবারের স্বজনরা ছাড়াও নিকট আত্মীয়রা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা এই হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্তসহ হত্যাকারী নয়নের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

অন্যদিকে বর্ষাকে হত্যার পর থেকেই তার শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর ও ননদ বাড়ি থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। বর্ষার সাড়ে চার বছরের মেয়ে জান্নাতুল পেরদৌস নিঝারকেও তারা সাথে নিয়ে গেছেন। এখন পর্যন্ত তাদের কারো কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। নিঝারকে নিয়েও বর্ষার বাবার বাড়ির লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। একমাত্র নাতিন নিঝারকে ফিরিয়ে আনতে বর্ষার নানা নানী সহ আত্মীয় স্বজনরা বর্ষার শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে বাড়িতে তালা ঝুলানো দেখতে পান। আশপাশের লোকজন তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে পারেন নি।

সোমবার রাত আনুমানিক নয়টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের আলী সাহারদী এলাকায় শ্বশুর বাড়িতে শারীরিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বর্ষাকে। খবর পেয়ে বন্দর থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে বর্ষার স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান নয়নকে হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হলে পুলিশ রাতেই তাকে গ্রেফতার করে।

২০১৩ সালে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের আলী সাহারদী এলাকার শহিদুল্লাহ মিয়ার বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান নয়নের সাথে রাজধানীর কদমতলী থানার দনিয়া শরাইল এলাকার বাসিন্দা মনজুর ভূঁইয়ার বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার বর্ষার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নগদ টাকা, স্বণালংকার ও আসবাবপত্র বাবদ দশ লক্ষ টাকা খরচ করে বর্ষার পরিবার। বর্ষার সংসারে সাড়ে চার বছরের একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে।

নিহত বর্ষার পরিবারের নিকট আত্মীয়-স্বজনরা জানান, গত দুই বছর আগে একটি গার্মেন্টস কারখানায় মার্চেন্ডাইজারের চাকরি হারানোর পর ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে বর্ষার স্বামী নয়ন। হাতে নেশার টাকা না থাকলে অত্যাচার চলতো বর্ষার উপর। হাতের সামনে যা পেতো তাই দিয়ে পিটিয়ে শরীর ফুলিয়ে ফেলতো। নেশার ঘোরে কোন হিতাহিত জ্ঞাণ হারিয়ে ফেলতো নয়ন। সেই সাথে তাল মিলাতো নয়নের মা, বাবা ও ছোট ভাইটা পর্যন্ত। শ্বশুর বাড়ির একটি মানুষ কখনো কথা বলেনি তার পক্ষ হয়ে। নয়নের নির্মম অত্যাচারের পরিবাদ ও করেনি কেউ। এতো অত্যাচার সহ্য করেও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বামীর ঘর করে যাচ্ছিল বর্ষা।

নিহত বর্ষার বাবা মনজুর ভূঁইয়া জানান, গত প্রায় এক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা হাতে পান তিনি। তবে টাকা হাতে পেয়ে সেই টাকা নিজের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ফেলেন তিনি। তবে জমি বিক্রি করে তিনি টাকা পেয়েছেন সেই খবর জানতে পেরে মেয়ের জামাতা নয়ন ব্যবসা করার অজুহাতে বর্ষার মাধ্যমে তার কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে। এ নিয়ে নয়ন ও বর্ষার মধ্যে পারিবারিক কলহ চলতে থাকে। বিষয়টি বর্ষা তার মা বা লবা ও বোনকে ফোন করে জানালে অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যেতো।

মনজুর ভুঁইয়ার আরো অভিযোগ, দাবিকৃত সেই টাকা এখন পর্যন্ত না দেয়ার নয়ন তার মেয়ে বর্ষার উপর বেশ কিছুদিন যাবত মারধর সহ নানাভাবে শারিরীক নির্যাতন করে আসছে। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে এ পর্যন্ত প্রতিদিনই বর্ষাকে মারধর করতো নয়ন। দাবিকৃত টাকার অজুহাতে সোমবার রাতে নয়ন তার স্ত্রী বর্ষাকে আবারো মারধর করে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ নয়নদের বাড়িতে ভীড় জমান। খবর পেয়ে বন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বর্ষার লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়না তদন্তের জন্য সদরের জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

নিহত বর্ষার মরদেহের সুরতহাল পর্যবেক্ষণে গলায় সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে পুলিশ বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করে। এ ব্যাপারে বর্ষার বাবা মনজুর ভূঁইয়া মঙ্গলবার রাতেই বাদি হয়ে বর্ষার স্বামী নয়নকে আসামী করে বন্দর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ নয়নকে গ্রেফতার করে।

২০ আগস্ট, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে