NarayanganjToday

শিরোনাম

সংকীর্ণ মানসিকতায় না.গঞ্জ বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না


সংকীর্ণ মানসিকতায় না.গঞ্জ বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে দেখেই রাজনীতিতে আসার উৎসাহ পেয়েছিলেন মাসুকুল ইসলাম রাজীব। শুরুটা হয়েছিলো ১৯৯৬ সালে ইউনিয়ণ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদ দিয়ে। প্রয়াত যুবদল নেতা মমিনউল্লাহ ডেভিডের মাধ্যমেই হয়েছিলো তার রাজনীতির হাতেখড়ি। ছিলেন তোলারাম কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি। এরপর মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি। সর্বশেষ জেলা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান তিনি আছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে।

সুযোগ পেলে সর্বক্ষেত্রে নীতি প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছে পোষণ করেন এই তরুণ রাজনীতিক। তার স্বপ্ন ভবিষ্যতে স্কুল করার। রাজনীতির পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহরে জন্য তার রয়েছে একটি মিনি গার্মেন্ট। ২০০৪ সালে ভালোবেসে বিয়ে করা এই রাজনীতি এক ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের জনক। তাদের মধ্যে মার্জিয়া বিনতে ইসলাম পড়ছে থ্রি এবং ছেলে তেজওয়ান বিন ইসলাম তাসিনের বয়স সাড়ে ৪ বছর। অবসর সময় আড্ডা করে কাটাতে পছন্দ করা মাসুকুল ইসলাম রাজীব রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন নারায়ণগঞ্জ টুডে’র সাথে। তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি লিজা চৌধুরী এবং তার সাথে ছিলেন শিক্ষানবিশ রিপোর্টার পারভেজ আহমেদ অনিক

টুডে : কেমন আছেন?
রাজীব : নেত্রী কারাগারে, এমন অবস্থায় ভালো আছি বলাটা মিথ্যা হবে।

টুডে : আপনি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কিন্তু অনেক কর্মসূচিতেই আপনাকে দেখা যায় না, এর কারণ কী?
রাজীব : কথাটা সত্য নয়। সত্যটা হচ্ছে জেলা বিএনপির কর্মকা-গুলো যেভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা সেভাবে হয় না। কর্মসূচির ব্যাপারে জানানোও হয় না। তৃণমূল থেকে যখন রাজনীতি শুরু করেছি শতভাগ ভাগে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছি। এখন এটাই চাই। স্বাভাবিক কারণে যখন এর ব্যাত্যয় ঘটে, তখন বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করি। ব্যাপারটা এমন, মন মতো যখন কিছু হচ্ছে না তখন সেখানে না যাওয়াই ভালো। লোক দেখানোর জন্য নয়, কর্মসূচি দিতে হয় সংগঠিত হয়ে।

টুডে : ফতুল্লা থানা কমিটি হঠাৎ করেই ঘোষণা দেয়া হয়েছে, অন্যগুলো দেয়া হচ্ছে না কেন?
রাজীব : সাংগঠনিক অনিয়ম।

টুডে : নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে বিভাজনের কারণ কী?
রাজীব : সংকীর্ণ মানসিকতা।

টুডে : আপনি ছাত্র নেতা ছিলেন, বর্তমান এবং সে সময়কার ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কোনো পার্থক্য রয়েছে কি?
রাজীব : অবশ্যই। আগে আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির যে চাহিদা ছিলো এখন তা অনুপুস্থিত। মূল বিষয় হচ্ছে একজন ছাত্রকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে সে সেভাবেই গড়ে উঠবে। রাজনীতির চর্চা থাকতে হবে। যা এখন নেই। ফলে, অনেক ছাত্রই রাজনীতি বিমুখ। এ জন্য জাতীয় রাজনীতিকদের মানসিকতাই দায়ী।

টুডে : ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণ ছাত্রদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার না হয়ে দলীয় কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ কেন?
রাজীব : জাতীয় নেতৃবৃন্দের মানসিকতার কারণে। তারা নিজেদের চিন্তা, চেতনা, স্বার্থ ছাত্র সংগঠনগুলোর মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটায়। এ কারণে ছাত্র সংগঠনগুলো স্বকীয়তা বলে কিছু থাকে না। স্বাধীন ভাবে কাজ করারও সুযোগ থাকে না। ফলে মূল দল যা বলে তাই করতে হয়।

টুডে : আপনাদের নেত্রী কারাগারে, তার মুক্তির আন্দোলন কোনো ভাবেই বেগবান করতে পারেননি, কারণ কী?
রাজীব : নেত্রীর জন্য আমরা কিছুই করতে পারিনি। এটা দুঃখজনক। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ব্যর্থতায় অন্যায় ভাবে নেত্রীকে সাজা দিয়ে কারাবন্দী করে রেখেছে। এই দেশের সবার জন্য একরকম আইন আর নেত্রীর জন্য আরেক আইনের মাধ্যমে জুলুম করা হচ্ছে। এই ব্যর্থতায় লজ্জা লাগে। কেন্দ্রীয় নেতাদের আন্তরিকতাই এর জন্য দায়ী।

টুডে : আপনার বিরুদ্ধে সর্বমোট মামলা কয়টি?
রাজীব : ৪৬ টি।

টুডে : আপনাদের দলের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের সাথে আঁতাত করে চলেন, এ নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায়, তাদের চিহ্নিত করে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার আছে বলে মনে করেন?
রাজীব : অবশ্যই। এদেরকে চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ।

টুডে : আতাউর রহমান মুকুল, তাকে প্রায় সময় সরকারি দলের সমাবেশে দেখা যায় অথচ তিনি মহানগর বিএনপির সহসভাপতি, তিনি কি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন বলে মনে করেন?
রাজীব : অবশ্যই।

টুডে : হান্নান সরকার, সুলতান আহমেদ, শওকত হাসেম শকুকে সরাসরি সরকারি দলের এমপির পক্ষে বক্তব্য, মিছিল করতে দেখা যায়, এসব কী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়?
রাজীব : অবশ্যই। আশা করি মহানগর নেতৃবৃন্দ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।

টুডে : মনিরুল আলম সেন্টুর বিরুদ্ধে দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও অন্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
রাজীব : তার সাথে অন্যদের পার্থক্য আছে। তিনি রানিং চেয়ারম্যান, দলীয় পদধারী। পরবর্তীতে দল তাকে নমিনেশন দেয়নি। স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকারি দলের সাথে চলাফেরা শুরু করেন। সুতরাং দলে থাকা অবস্থায় একমাত্র ব্যক্তি স্বার্থ চিন্তা করে তার অপরাধটা বেশি মনে করি। এ কারণেই তাকে বহিস্কার করা হয়েছে।

টুডে : প্রায় সময় শোনা যায় বিএনপিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হয় না, সুবিধোভোগিরাই থাকে অগ্রভাগে, কথাটা কতটা সত্য?
রাজীব : প্রচলিত উক্তির মতো কথাটা সত্যই মনে হচ্ছে, প্রমানিত।

টুডে : আপনার দলের অবস্থান নারায়ণগঞ্জে কতটা সুসংগঠিত?
রাজীব : বিএনপি দল হিসেবে জনপ্রিয়। সে হিসেবে এখানে সাংগঠনিক ভাবে শক্তিশালী হওয়ার সামর্থ রয়েছে। তারপরও নেতাদের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে সে হচ্ছে না। দলকে শক্তিশালী করার মানসিকতা নিয়ে সবাইকে এক সাথে বসতে হবে।

টুডে : নারায়ণগঞ্জে বিএনপিকে চাঙ্গা করা যাচ্ছে না, এর জন্য কী এখানকার নেতৃত্ব দায়ী?
রাজীব : নেতৃত্বের উপর এই দায় চাপানোর বিষয় না। নেতৃত্ব তৈরি করার ব্যাপার। একজন তৈরি হয়ে অন্যজনকে তৈরি করবে। সে আবার কাজ করবে। কিন্তু সেভাবে এখানে নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। দলের আদর্শ নীতি নিয়ে কেউ তৈরি হচ্ছে না। সাংগঠনিক নিয়ম মেনে, দায়িত্বশীল হয়ে কেউ কাজ করছে না। সংগঠন আছে ঠিকই কিন্তু কাজ নেই। আসলে আমাদেরতো অফিসই নাই, কাজ করবো কোথায়?

টুডে : কি কি পন্থা অবলম্বন করলে দলকে স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করেন?
রাজীব : ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ণ, ইউনিয়ণ থেকে থানা, থানা থেকে জেলা পর্যায়ে ৫ জন করে নেতা আসে তাহলে সাড়ে ৪ হাজার লোক হয়ে যাবে। পাশাপাশি সহযোগি সংগঠন আছে। এভাবে সবাই একসাথে একাত্মতা প্রকাশ করে যদি কাজ করে তাহলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে ১৫ দিনও লাগবে না। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কেউ কাজ করেও চেয়ার পায় না আবার কেউ আছে কাজ না করেই বড় চেয়ারে বসে আছে।

টুডে : দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির মূল কারণ কি স্বার্থ না নেতৃত্ব?
রাজীব : প্রয়োজনের তাগিদে নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। স্বার্থই হচ্ছে বিভাজনের মূল কারণ। সুতরাং ব্যক্তি স্বার্থ পরিহার করে, নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াটাই রাজনীতি।

টুডে : নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করছেন নজরুল ইসলাম আজাদ, এমন কথা প্রায় শোনা যায়, আপনারও কী তাই মনে হয়?
রাজীব : নজরুল ইসলাম আজাদের দোষ কোথায়? তিনি সবার সঙ্গে সুন্দর মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন। নেতৃত্ব হলো যোগ্যতার বিষয়। আমদের সংকীর্ণতা দূর করতে হবে।

টুডে : আগামীতে কী নির্বাচন করার সম্ভাবনা রয়েছে?
রাজীব : হ্যাঁ, আছে।

টুডে : জাকির খান এক যুগের বেশি সময় ধরে পলাতক, দলের মধ্যে তার প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
রাজীব : শুধু জাকির খান নয়; দলে সবাইকে দরকার আছে। তবে, উনি দেশে না আসলেও সমস্যা নাই। কেউ তো ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়; তিনি যদি ভুলত্রুটি শোধরে আসেন তাহলে কোনো সমস্যা নেই।

টুডে : নারায়ণগঞ্জে যারা ইতোপূর্বে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন তাদের কোন ভুলটা আপনাদের বেশি ভোগাচ্ছে?
রাজীব : সিনিয়ারদের ভুলটা বলা ঠিক না যদিও, তারপরও যদি বলি, বলতে হবে, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আসেন।

টুডে : নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য অত্যন্ত যোগ্য পাঁচজন নেতার নাম বলুন যারা একাট্টা হতে পারলে বিএনপি ফের চাঙ্গা হতে পারে।
রাজীব : আমাদের নেত্রী যার মাথায় হাত দিবে সে-ই নেতা। ৫ জন বলে কথা না। যদি নিয়ম নীতি মেনে চলে তবে, একজনই যথেষ্ট। তাই এমন একজনের নাম বললে অন্যরা মন খারাপ করবে। সুতরাং সবাই যোগ্য।

টুডে : অ্যাড. আবুল কালাম, তৈমূর আলম খন্দকার, গিয়াসউদ্দিন এবং কাজী মনির ও শাহ আলমের মধ্যে সাংগঠনিক হিসেবে সব থেকে যোগ্য ব্যক্তি কাকে মনে করেন?
রাজীব : গিয়াসউদ্দিন সাংগঠনিক হিসেবে সব থেকে যোগ্য ব্যক্তি।

টুডে : নতুন যারা রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি থাকবে?
রাজীব : সততা আর সু-শিক্ষার আলোতে আলোকিত হয়ে পাওয়ার থেকে দেওয়ার মানসিকতা এবং ন্যায় নীতি আদর্শ নিয়ে রাজনীতিতে আসতে হবে। নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে সবার মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার নামই রাজনীতি। এই মানসিকতা নিয়ে যারা আসবে তাদের স্বাগতম।

টুডে : আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রাজীব : আপনাদেরও ধন্যবাদ। নারায়ণগঞ্জ টুডে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক, শুভ কামনা।

৩ আগস্ট, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে