NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-১

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

১.

মরিয়ম বেগমের উচ্চ কণ্ঠের হাসি যেন খান খান হয়ে ভেঙ্গে পরতে লাগলো বহু জীর্ণ শীর্ণ ভবনের চার দেয়ালের গা বেয়ে। কেঁপে কেঁপে উঠল দাঁড়িয়ে থাকা সবার শরীর। সেলিম আর রফিক পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। ভয়ে তাদের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তারা দুজন সবচেয়ে বিশ্বস্ত মরিয়ম বেগমের। বলতে গেলে জন্ম থেকেই তার সাথে আছে তারা। অনেক ভালোবাসা পেলেও সবাই মরিয়ম বেগমকে যমের মতই ভয় পায়। এ তল্লাটে মরিয়ম বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার মত কেউ আছে তারা তাদের এই বেড়ে উঠার বয়স থেকে আজ প্রায় দীর্ঘ ৩০/৩৫ বছর দেখেনি। সমাজের বহু মান্যিগন্যি মানুষের আনাগোনা তাদের আস্তানায়। তাদের নাম পরিচয় জানলে হয়ত আপনি আঁতকে উঠবেন। তারা সবাই মরিয়ম বেগমের সামনে এসে হাত কচলায় আর গলেগলে পড়ে। এখনও বুঝতে পারেননি আপনারা আমি কার কথা বলছি? বুঝেছেন? জ্বি ঠিকই বুঝেছেন, আমাদের আজকের গল্পের প্রধান চরিত্র মরিয়ম বেগম একজন বেশ্যালয়ের সর্দারনী।

চলুন তবে, আমরা এবার ঘটনার গভীরে যাই। মরিয়ম বেগম বসে আছেন তার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত একটি আরামকেদারায়। এই চেয়ারে বসে বসেই গত চল্লিশ বছর ধরে তিনি তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন, টিকিয়েও রেখেছেন। বুদ্ধি আর দূরদর্শিতার ফলস্বরুপ খুব কম বয়সেই এই চেয়ার দখল করেন তিনি। তার দুই হাতের মুঠোতে প্রশাসনের হর্তাকর্তারা। তাদের প্রত্যেকের পছন্দ অপছন্দ তার নখদর্পনে। এলাকার রাজনৈতিক নেতারা আর তাদের চেলাচামুণ্ডারাও তাকে খাতির করে। কারণ সবার ভালো লাগার দিকেই তার সমান নজর। তাই তার সাম্রাজ্যে কখনো ঝড় আসেনি, ঝড়ের পূর্বাভাসের আভাসেই তিনি সর্বদা সবরকমের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখেন। তাই সেইসব ঝড়-তুফান তাকে আজ এত বছরেও টলাতে পারেনি। তিনি তাই নির্বিঘ্নে তার রাজ্য জুড়ে মহীরুহ হয়ে জাঁকিয়ে আছেন। এতটা বছরে কেউ তাকে হাসতে দেখেনি, কেউ দেখেনি তার চোখে দয়ার আভাস কিংবা এক ফোঁটা পানি। তার চারপাশের সবাই তাকে নির্দয় আর নিষ্ঠুর হিসাবেই জানে, জানে যে দয়া মায়া শব্দটা তার ধর্মে বা কর্মে কোথাও নেই। বরং তার নিষ্ঠুরতার হাজার গল্প অতৃপ্ত আত্মার মত এই রাজ্যে ঘুরে বেড়ায়।

আজ তাই তাকে এভাবে উচ্চস্বরে হাসতে দেখে সবার চোখেমুখে ভীত ভাব ফুটে উঠেছে। রুমের বাইরে ভিড় জমিয়েছে এই রাজ্যের বাসিন্দারা। কিন্তু অজানা ভয়ে কারোর আর মুখে কোন রা নেই। সবার দৃষ্টি আর কান একিদিকে কেন্দ্রীভূত।  মরিয়ম বেগমের পায়ের কাছে উবু হয়ে বসে আছে নিরু আর সুজন। সুজনের চোখের দৃষ্টি কঠিন ও নির্লিপ্ত মনে হচ্ছে, কিন্তু নিরু সেই শুরু থেকেই একঘেয়ে সুরে নিচু লয়ে কেঁদে যাচ্ছে। থেকে থেকে হেঁচকি দিচ্ছে সে। কিন্তু মরিয়ম বেগমের উচ্চ কণ্ঠের হাসিতে তার কান্নাও থেমে গেলো। পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে আছে এখন। সময় যেন আজ মরিয়ম বেগমের অনুগত গোলাম, থেমে গেছে সে, অপেক্ষায় আছে নির্দেশনার। কি হবে এখন এই ভাবতে ভাবতেই সবার উৎকণ্ঠা চরমে। এই গল্পটা এখানেই আটকে থাক এখনের মত। (চলবে)

উপরে