NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-২

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

২.

চলুন একটু পেছনের ঘটনায় যাই। স্মৃতিচারণ করি কিছু বিস্মৃত ঘটনার।  চলে যাই আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে। ছবির মত একটি গ্রামে ছিল ছবির মতই দেখতে মিষ্টি একটি মেয়ে, যার নাম ছিল শরিফা। ধরে নিন গ্রামের যে কোন একটি স্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে উঠছিল সে। আর সবার মতই মেয়েটির চোখে ছিল ভালবাসার স্বপ্ন, ঘর বাঁধার স্বপ্ন। ভুলে যাবেন না যেন যে মেয়েটির গল্প বলছি তার সামাজিক প্রেক্ষাপট আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের। তাই আপনাকে ধরে নিতে হবে, তখন গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। মেয়েদের লেখাপড়া মানেই ছিল ভালমতন আরবি শিক্ষা আর চিঠিপত্র পড়তে ও লিখতে পারার মত বাংলা শিক্ষা। এইটুকু পারলেই ধরে নেয়া হত মেয়ে যথেষ্ট শিক্ষিত আর ঘর সংসার করার মত উপযুক্ত হয়েছে।

আমাদের গল্পের এ অংশের নায়িকা শরিফাও এইসব গুণাবলী ধীরে ধীরে অর্জন করছিল তার সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। কতই বা বয়স তখন তার! দশ কি এগারো হবে বেশি হলে। সদ্য বালেগ হওয়া শরিফার শরীরে যৌবনের ছোঁয়া লেগেছে মাত্র। কুঁড়ি থেকে ফুল ফুটতে শুরু হয়েছে। বাড়িতে তার উঠতি বয়সের পিঠাপিঠি আরেকটি বোন আছে যার বিয়ের কথা চলছিল। সবাই চাইছিল এই বিয়ে শেষ হলেই শরিফাকেও খুব তাড়াতাড়ি পাত্রস্থ করতে হবে, কারণ বয়স্ক মেয়ে বাড়িতে শুধু শুধু বসিয়ে রাখা আর পাপের ভাগীদার হওয়া একি কথা। আর বালেগ হওয়া মানেই বয়স্থা কন্যা। বয়স্থা কন্যা পাত্রস্থ করলেই নেকি আর পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়। অতএব বড় কন্যাটির শুভক্ষণ দেখে ধুমধামের সাথে বিয়ে হয়ে গেল।

সৌভাগ্যের কথা এই বিয়ের পরের সপ্তাহেই শরিফার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এলো বোনের শ্বশুর বাড়ি থেকে। পাত্র আর পাত্রপক্ষ তাকে বোনের বিয়েতেই দেখেছে আর মেয়ে তাদের অনেক পছন্দ হয়েছে। বাছবিচার না করেই খুব দ্রুত বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। যেহেতু, বড় মেয়েটিকে দেখে বুঝা যাচ্ছে সুখে আছে, অতএব এই ছোট মেয়েটিও সুখেই থাকবে। শরিফার আম্মিজান একটু নিমরাজি হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, ছোটমেয়েটি আরও কিছুদিন তার বুকে থাক। মাত্রই বড়টিকে বিদায় দিয়ে তার কোল শূন্য হয়েছে, এখন যদি এত তাড়াতাড়ি ছোটোটিও চলে যায় তবে তিনি কিভাবে থাকবেন! যদিও এক পুত্র সন্তান আছে তাদের কিন্তু সেটা সবে হাঁটতে শিখেছে।

মন সায় দিচ্ছেনা দেখে তিনি ঘটক মারফত খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, পাত্রের বয়স কিঞ্চিৎ বেশি। শরিফার সবে মাত্র মাসিক ঋতুচক্র শুরু হয়েছে, পাত্রের বয়স নাকি ত্রিশ পেড়িয়ে গেছে। তাই শরিফার আম্মিজান এই বিয়েতে আপত্তি তুললেন। কিন্তু শরিফার আব্বাজান সাফ জানিয়ে দিলেন এখানেই বিয়ে হবে, পুরুষের বয়স কোন ব্যাপার না। তিনি নিজেও শরিফার আম্মিজান থেকে পনের বছরের বড়। আর তাতে কি শরিফার মাকে তিনি সুখে রাখেননি? আমতা আমতা করে আম্মিজান জানিয়েছিলেন যে, আরেকটু খোঁজ-খবর নেয়া হোক। কারণ এই পাত্র বাড়িতে থাকেনা, শহরে নাকি কিসের ব্যবসা করে। ঠিকমত কেউ বলতে পারলো না ব্যবসাটা কিসের? তবে এক বাক্যে সবাই জানালো পাত্রের প্রচুর টাকা আছে, যা সে দুহাতে খরচ করে। যেহেতু পাত্র শহরবাসী আর গ্রামে থাকেন না, তাই তার স্বভাব চরিত্র নিয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে কেউ কোনদিন খারাপ কিছু দেখেনি। তাই বলা যায় মেয়ে সুখেই থাকবে। তাছাড়া ঐ বাড়িতে তাদের আরেকটি মেয়ে তো আছেই, কিছু হলে বড়টি ছোটটিকে দেখে রাখতে পারবে।

অতএব, আবার সানাই বেজে উঠল শরিফাদের বাড়িতে। বাড়ির ছোট মেয়ে বলেই বড়টির চেয়েও বেশি ধুমধামে তাকে বিদায় দেয়া হল। কোন কিছুর কমতি রাখেননি শরিফার বাবা-মা মেয়ের বিয়েতে। বড়টির যত বেশি জাঁকজমক করে বিয়ে দিয়েছিলেন, ছোটটিকে তার চেয়েও দুইগুণ বেশি জাঁকজমকে বিয়ে দিলেন। পুরা গ্রাম দাওয়াত করেছেন এ বিয়েতে শরিফার আব্বাজান। আত্মীয়স্বজন কেউ বাদ যায়নি। সবাই এসেছে। সবাই যেন বেশ ঈর্ষা কাতরভাবেই শরিফাকে দেখছে। বিশেষ করে মেয়ে ও মহিলা মেহমানরা। শরিফার আম্মিজান মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদলেন, আব্বাজান যতই পাষাণ ভাব দেখান, মেয়ে তুলে দেবার ক্ষণটিতে কিছুতেই যেন আর চোখের পানি বাঁধ মানল না। বারবার শরিফার বরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন আব্বাজান, এ তাঁর বড়ই আদরের ধন, বুকের মানিক। অনেক যত্নে বড় করেছেন। জামাইবাবাজি যেন তাঁর এই মানিকের যত্ন নেয় আর ভালোবেসে বুকে রাখে। বরের চেহারা দেখে সবাই একটু মনমরা হয়ে গেলো। বর কি একটু বেশি বয়সী? ক্ষণিকের জন্য ভাবলেন কনের বাবাও! তাঁর নিজের মনে হল পাত্রটি যেন তাঁর চেয়েও বয়সে বড়! আর কোন এক অজানা কারণে আম্মিজানের মনে কু-ডাক ডাকল থেকে থেকে। তবুও একসময় সমস্ত অনুষ্ঠান শেষ হল। বউ নিয়ে বিদায় হল বর। বাড়িটি নীরব হয়ে গেলো যেন চিরকালের মত। (চলবে)

লাল-নীল-সংসার (১)

উপরে