NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৩

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৩.

আসুন আমরা এবার শরিফার নতুন সংসারে ঘুরে আসি। চলুন, দেখি শরিফা কেমন আছে। বিয়ের রাতেই শরিফাকে তার গ্রামের শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে আসা হল। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরিফার আর হুঁশ থাকেনা সে কোথায় কিংবা কার সাথে। পথিমাঝেই ঘুমিয়ে কাদা হওয়া শরিফাকে দুলাভাই গোত্রের কেউ একজন পালকি থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে রেখে যায়। ভাবি সম্পর্কের কেউ একজন তাকে অনেক করে ডেকেও জাগাতে ব্যর্থ হয়ে মুখ টিপে হেসে শরিফার বরকে রুমে ঢুকিয়ে রেখে বেড়িয়ে যায়। মধ্যরাতে ঘুমন্ত শরিরে কিছুর অস্তিত্বে আর তীব্র ব্যথায় ঘুম ভেঙ্গে যায় শরিফার। ঢুকরে কেঁদে উঠে সে। বুঝতে চেষ্টা করে কোথায় সে, কি হচ্ছে তার সাথে! কিছুতেই মনে করতে পারছেনা শরিফা সে কোথায়। বার বার চিৎকার করে আম্মিজান বলে ডেকে উঠাতে একসময় টের পায় শরিফা, কেউ একজন শক্ত করে তার মুখ চেপে ধরে আছে আর হিস হিস করে চাপা স্বরে বলছে চুপ কর, একদম চুপ।। গোঙানির শব্দ সে রুমেই গুমরে গুমরে হারিয়ে যেতে লাগলো রাতভর! সারারাতে কয়বার সে তার বরের নিষ্ঠুর আক্রমণের শিকার হল সে কথা সে মনে করতে পারেনা, শুধু মনে পরে ভোররাতের দিকে প্রচণ্ড ব্যথায় আর বরের আঁচরে কামড়ে তার দুনিয়া আঁধার হয়ে যায় এবং জ্ঞান হারায় শরিফা, তারপর আর কিছুই মনে নেই তার।

অনেক বেলায় চোখ মেলে শরিফা। বুঝতে চেষ্টা করে কোথায় সে। তারপর ধীরে ধীরে মনে পরে সব। গতকাল তার বিয়ে হয়েছিল একজন মানুষের সাথে। ঠিক সেরকম বিয়ে যেভাবে তার বড় বোনটিরও হয়েছে। তাকে শাড়ি গহনা পড়িয়ে পালকিতে তুলে দিয়েছিল সবাই। তার আম্মিজান আর আব্বাজান খুব কাঁদছিল, আর বলেছিল আজ থেকে তার স্বামীই তার সব কিছুর অধিকারী। স্বামী যা বলবে তাই মানতে হবে, শুনতে হবে। কারণ স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত। স্বামীর আদেশ ছাড়া কিছুই করা যাবেনা। গত কদিন ধরেই মুরুব্বি গোত্রের মেয়েলোকেরা ক্রমাগত ভাবে তাকে বুঝিয়ে গেছে, বিয়ের পর মেয়েদের জীবনে স্বামীই সব। স্বামী বারণ করলে সেই কাজ করা যাবেনা। স্বামী যেভাবে চায় সেভাবেই স্বামীর কাছে যেতে হবে, ইত্যাদি নানা কথা। বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে উঠল শরিফার। আম্মিজানকে মনে পরল খুব। হু হু করে আকুল হয়ে কেঁদে উঠল শরিফা আম্মিজান বলে। উঠে বসে দেখল বিছানা রক্তের দাগে ভরা। কাপড় চোপড়ের উপর দিয়ে যেন তার মতই ঝড় বয়ে গেছে। শরীরের যেখানে যেখানে নজর গেলো লাল লাল চাকা চাকা দাগ। আর সারা শরীর ব্যথায় নাড়ানো যাচ্ছেনা কিছুতেই। উঠতে গিয়েই মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলো সে, কোন রকমে পালঙ্কের কোনা ধরে তাল সামলাল। 

ভাবী উঠেছ? বলতে বলতে ঘরে প্রবেশ করল এক কম বয়সী মহিলা। বাজে ভঙ্গির হাসি দিয়ে জিগ্যেস করল, “কেমন কেটেছে কাল বাসর রাত? আমার ভাইজান ঠিকমত তোমার যত্ন আত্মি করেছে? দেখেই তো মনে হচ্ছে ভালোই মজা লুটেছে”। বিশ্রীভাবে হেসে বলল, “যাও, কলঘরে পানি দিয়েছি, গোছল করে নাও। তোমার বরের মেজাজ কিন্তু খুব চড়ে আছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসো”। কোনরকম নিজেকে টেনে হিঁচড়ে শরিফা কলঘরে পৌঁছাল। বারবার মনে হচ্ছিল সে বোধহয় মারা যাচ্ছে। কিভাবে যে নিজেকে তৈরি করল সে নিজেও জানেনা। শুধু বুঝল জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে যেন, কিছুই খেতে পারলনা পুরাটা দিনভর। রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো শরিফার কিন্তু স্বামীত্বের অধিকারের নিচে চাপা পরে গেলো সব। পরদিন বেহুঁশ অবস্থায় তাকে কবিরাজ দেখতে এলো। জ্বরের ঘোরে শরিফা কেবল আম্মিজান, আম্মিজান বলে প্রলাপ বকে চলল। কবিরাজ কি বলেছিল শরিফার বরকে, শরিফা জানেনা, তবে দুটি দিন মুক্তি মিলল তার অত্যাচার হতে। কিন্তু তৃতীয় দিন হতেই সেই আগের মতই তার উপর স্বামীত্বের দাবী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বর। এক সপ্তাহেই পরীর মত মেয়েটির মুখের হাসি মিলিয়ে কেমন উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে গেলো। বর সামনে থাকলেই সে ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল।

হপ্তা না ঘুরতেই, শরিফাকে বাবার বাড়ি নিয়ে যেতে পালকি পাঠাল তার আব্বাজান। কিন্তু তার স্বামী পালকি ফেরত পাঠাল কারণ শরিফাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় রওনা দিচ্ছেন। গল্প এতখানি এগিয়ে গেলো, কিন্তু আপনাদের তো শরিফার স্বামীর নামই বলা হয়নি। শরিফার স্বামীর নাম মির্জা মোহাম্মদ খান। এই মির্জা মোহাম্মদ খান হলেন, শরিফার দুলাভাইয়ের দূর সম্পর্কের ফুফাতো ভাই। এই বাড়িতে এসে শরিফা শুনতে পেলো মির্জা খানের স্বভাবে নারী প্রীতি প্রবল। যদিও শরিফার ওইটুকু বুদ্ধি বা বিবেচনা হয়নি বুঝার যে নারী প্রীতি আসলে কি! সে নিজেই সারাক্ষণ স্বামীর নিষ্ঠুরতার শিকার ছিল। তাই সেই ভয়েই সে সবসময় অস্থির আর আতংকিত থাকে। এইরকম অবস্থায় তার স্বামী মির্জা খান তাকে নিয়ে ঢাকাতে তার নিজের বাড়িতে। (চলবে)

লাল-নীল-সংসার (১)
লাল-নীল-সংসার (২)

উপরে