NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৪

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৪.

প্রভাব প্রতিপত্তি কি তা দেখেই বড় হচ্ছিল শরিফা। তার বার কিংবা তের বছরের এই জীবনে সে দেখেছে এবং জেনেছে টাকার মূল্য। কিন্তু স্বামীর বাড়িতে পা দিয়ে তার মনে হল, সে যেন গ্রামের হুজুরের বয়ান করা স্বর্গে চলে এসেছে। বিশাল রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি। সেই বাড়িতে অসংখ্য নারীপুরুষ তার স্বামীর হুকুম পালনে ব্যতিব্যস্ত। শুধু মুখ থেকে হুকুম তামিল হওয়া বাকি, কাজ সাথে সাথেই প্রস্তুত। যদিও তার একটা জিনিষ শুরুতেই খটকা লাগলো চোখে, কিছু মেয়ে তার স্বামীর বাড়িতে দিব্যি আছে, কোন কাজকর্ম ছাড়াই ঘুরে বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে আর কেউ কেউ যখন তখন কোন লোক আসলে তার সাথে কোন রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিচ্ছে। ঢাকায় আসার পর থেকে তার উপর অত্যাচার কিছুটা কমেছে মির্জা খানের। এখন সে রাতে একবারের বেশি শরিফার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েনা। শরিফা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে তার চারপাশে কি ঘটছে। প্রায় শরিফা দেখে তার স্বামীও যখন যে মেয়েটাকে ইচ্ছা হচ্ছে নিয়ে যে কোন রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিচ্ছে। পরিবেশ আর পরিস্থিতি শরিফাকে সময়ের আগেই অনেক বড় বানিয়ে দিল।

নিয়মিত তাদের বাড়িতে অতিথি আসে। সেখানে থানার দারোগা বাবু আছেন, আছেন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। রাজনীতির সাথে জড়িত অনেকেও অতিথি হয়ে আসে নিয়মিত। যদিও শরিফা বুঝেনা রাজনীতি তবে সে তাদের বাড়িতে দেখেছে, তার বাবার কাছেও গ্রামের নানা শ্রেণির মানুষ আসত। তারা গ্রাম নিয়ে, পরিবার পরিজন নিয়ে দেশ নিয়ে কথা বলত। টাটা ছোটরা সামনে গেলে সেসব আলাপের, আব্বাজান তাদের ভেতর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। তাই শরিফা বুঝতে পারে, এ বাড়িতে আসা মানুষেরাও   বেশ নামীদামী মানুষ। যেদিন উঁচু মহলের মানুষেরা বেশি আসেন, সেদিন রাতভর নাচ-গান আর মদ্যপানের আসর চলে। বাইজী ভাড়া করে আনা হয়, সেইসাথে চলে নারী শরীর নিয়ে জনে জনে উল্লাস। যখন রাত পোহায়, বাড়ি অথিতি শূন্য হয় তখন মির্জা নিজের শোবার রুমে ঢুকে টাকা গুনে। বান্ডিল বান্ডিল টাকা, প্যাকেট করে করে সিন্দুকে ঢুকিয়ে রাখে। জড় পদার্থের মত এক কোণায় বসে শুধু দেখে যায় শরিফা। মির্জা খান বাড়িতে না থাকলে সে হাউমাউ করে কেঁদে বুক ভাসায়। থেকে থেকে শুধু আম্মিজানের কথা মনে হয়, আব্বাজানের কথা মনে হয়, বোনের কথা, মক্তবের খেলার সাথীদের কথা মনে হয়। একদিন বাড়িতে যেতে চায় একথা মির্জাকে বলতেই, মির্জা খান কোমর থেকে বেল্ট খুলে তাকে অমানুষের মত পেটায়। মার খেয়ে জবাই করা গরুর মত তড়পাতে থাকে শরিফা, মির্জা তাকে হুঁশিয়ার করে যেন কোনদিন আর সে বাড়ি যাবার কথা না বলে।

বছর গড়ায়, শরিফার বুদ্ধি-বিবেচনাও বাড়ে। সে এখন বুঝতে পারে তার স্বামী মির্জা মোহাম্মদ খান নারীর কেনাবেচা করে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি সস্তায় কমবয়সী মেয়েদের কিনে আনেন, ভোগ করেন এবং উপযুক্ত মূল্যে তাদের কেনাবেচা করেন। আর এই কেনাবেচার টাকাই তার এত সম্পদের উৎস। নিত্যনতুন নারী শরীরে বিভোর থাকা মির্জার কাছে শরিফার কদর কমতে থাকে। এদিকে দেশের পরিস্থিতি তখন উত্তাল। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ফলে বিদ্রোহ দানা বাঁধছে দেশের মানুষের মনে।

এরই মাঝে একরকম গৃহবন্দী শরিফা জানতে পারে,  গ্রামের বাড়ি থেকে তার আব্বাজান আর দুলাভাই তার খোঁজে এসেছিলেন। কিন্তু মালিকের হুকুম তামিল করা গোলামেরা তাদের সদর দরজা থেকেই বিদায় দিয়েছে। তার আব্বাজানকে জানানো হয়েছে, শরিফা রোগে ভুগছে তাই শরিফার স্বামী তাকে নিয়ে করাচী গেছেন হাওয়া বদল করতে, কবে ফিরবেন ঠিক নাই। এই খবর শুনে তার আব্বাজান কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেছেন। এদিকে শরিফাও মুর্ছা গেলো শোনার  সাথে সাথেই। জ্ঞান ফিরে আসার পর আবার তার সব মনে পরে গেলো। কাঁদতে শুরু করল সে বিলাপের সুরে।  বয়স্ক মত একজন দাসী এসে তার পা টিপে দিতে লাগলো, আর বলল কান্না না করতে কারণ সে মা হতে যাচ্ছে। কান্না বন্ধ হয়ে গেলো শরিফার, এটা কি শুনল সে!

সেই রাতে তার স্বামী বাড়ি ফিরল অল্পবয়সী একটা মেয়ে নিয়ে, যাকে দেখেই শরিফার বুক ধক করে উঠল, মনে হল যেন নিজেকেই দেখছে সে নিজের সামনে। এসেই মেয়েটাকে নিয়ে ঢুকে গেলো একরুমে। কিছুক্ষণ পর মেয়েটার চিৎকারে আর থাকতে না পেরে দরজা ধাক্কাতে লাগলো শরিফা। প্রচণ্ড রাগে দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো মির্জা, আক্রোশে লাথি ছুঁড়ল শরিফাকে। উড়ে গিয়ে সিঁড়িতে পড়ল শরিফা, সেখান থেকে গড়িয়ে নিচে, একটা শুধু চিৎকার দেবার সময় পেয়েছে সে, তারপর সব চুপচাপ। রক্তে ভেসে গেলো চারপাশ। দৌড়ে এলো দু’জন দাসী। কোনরকম ধরাধরি করে শরিফাকে রুমে নিয়ে গেলো। সেরাতেই গর্ভপাতে বাচ্চাটা হারাল শরিফা।

সময় যাচ্ছিল শরিফার জন্য খুবই ধীরে। সত্তরের নির্বাচন চলছে দেশে, কিন্তু শরিফা সে জ্ঞান রাখেনা। তবে এটুকু বুঝে সে যে দেশের পরিস্থিতি ভাল যাচ্ছেনা বলে তার স্বামীর সবসময় মেজাজ গরম থাকে। আয়ও কমছিল, আগের মত টাকা হাতে আসেনা আবার মেয়ে সাপ্লাইও কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতি সপ্তাহে আসর জমত, তা এখন মাসে-দুমাসে গিয়ে ঠেকেছে। কিন্তু সেদিন, অনেকদিনের পর তার স্বামীকে খুশি খুশি দেখে বুঝল, আজ আবার আসর জমতে যাচ্ছে বুঝি! বাড়িতে সাজসাজ রব, বারবার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছেন মির্জা খান সমস্ত আয়োজনের। বেশ ভাল খানা-দানার আয়োজন চলছে। কথা প্রসঙ্গেই জানলো শরিফা পশ্চিম পাকিস্থান থেকে কিছু উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তা আসবেন ঢাকায়, যাদের মাঝে এক মেজর জেনারেলও আছে; মির্জার খুব জানিজিগার বন্ধু। তাই এদের খুশি করার ভার মির্জার উপর পড়েছে। এরা পূর্ব পাকিস্থান আসছে বিশেষ কাজে। এদের খুশি করতে পারলে মির্জার অনেকদিন আর কিছু ভাবতে হবেনা। চাই কি ক্ষমতাও হাতে আসবে, কারণ বেশ কিছুদিন ধরে মির্জা রাজনীতিতে ঢুকার কথা ভাবছিল। সেই হিসাবে সে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে মেলামেশা বাড়িয়ে দিয়েছিল খুব। (চলবে)

 

উপরে