NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৫

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৫.

সেই একটি রাত বদলে দিলো শরিফার জীবনের মোড় ও ভাগ্য। স্বামীর বন্ধুটির নাম ছিল লিয়াকত আলি খাঁ, যে কিনা পাকিস্থানি সরকারের একজন উচ্চ-পদস্থ সেনা কর্মকর্তা। সেরাতে ফুর্তির আসরের মধ্যমণি ছিল এই লোকটি। হঠাৎ করেই দোতালার রুমের দরজায় এক ঝলক শরিফাকে দেখে নিজের করে পেতে চাইল বন্ধুর কাছে। যে সময়ে এত কিছু ঘটছে তখন কেবলমাত্র পাকিস্থানের সাধারণ নির্বাচন শেষ হয়েছে। ব্যাপক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে পূর্ব পাকিস্থানের শেখ মুজিব ও তাঁর দল।

মাসটি ছিল ১৯৭০ সালের, জানুয়ারির শেষের দিক। ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন শেষ হলেও পূর্ব পাকিস্থানের পরিস্থিতি তখন ভীষণ উত্তপ্ত। ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্থানের হাতে হস্তান্তরের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি পাকিস্থানি সরকার। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পূর্ব পাকিস্থানে সামরিক শাসন জারি করে দিলেন। শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর দলের অনুসারীরা তাই তীব্র আন্দোলনের ডাক দিলেন। সেই সূত্র ধরেই ঢাকায় জড় হচ্ছিল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। এতকিছু জানার কথা না শরিফার। সে জানেনা সরকার বলতে কি বুঝায়, কিংবা সরকারে কে কে আছে! দেশ কিভাবে চলে তাও সে বোঝেনা, আরও জানেনা দেশের অনেক মানুষ এই সরকারের শাসনে থাকতে চাচ্ছেনা। ঘরের বাইরের যে একটা দুনিয়া আছে সেখানে প্রতিদিন কত কি ঘটে তাও সে জানেনা। সেই বাইরের দুনিয়ার মানুষগুলি যে ফুঁসছিল রাগে-ক্ষোভে আর পশ্চিম পাকিস্থানের বঞ্চনার বদলা নিতে, চৌদ্দ বছরের মেয়েটির সে সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই। তাই হাত বদলের রাতে সে ভাবতেও পারেনা তার ভাগ্য বদলের সাথে সাথেই পৃথিবীর মানচিত্রেও বদল আসছে।

এদিকে প্রাণের বন্ধুর জন্য জান কোরবান দিতেও রাজি ছিল শরিফার স্বামী। আর এ তো খুবসামান্য একজন মেয়েমানুষ যার প্রয়োজন তার জীবনে ফুরিয়েছে বললেই চলে। মির্জা বেশ খুশি খুশি ভাবেই শরিফাকে সঁপে দিলো লিয়াকতের হাতে। লিয়াকতও বন্ধুপ্রাণ বটে! কথা দিয়ে দিলো, পার্লামেন্টে এবার মির্জার জায়গা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবেনা। সেরাতেই শরিফার রূপযৌবনের প্রেমে পড়ল লিয়াকত। শরিফার মনের অনুভূতি কেমন ছিল তা আমরা জানার স্পর্ধা না করি তো মনে হয় ভালো। সে যখন দেখল, তার শোবার ঘরে, তার নিজের স্বামী অন্যপুরুষ ঢুকিয়ে দিয়ে তাকেই আবার বলছে খুশি করে দিতে সেই মুহুর্তেই শরিফার শরীরের মৃত্যু ঘটেছিল চিরতরে এটুকু ধরে নেয়াই যায়। যতবার রাতে তার উপর উপগত হয়েছে লিয়াকত, ততবারই শুধু শরিফার কানে বাজছিল মুরুব্বিদের শিখিয়ে দেয়া বাণী, “স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্থ! তাই স্বামীর সব কথা শুনা ও পালন করা স্ত্রীর দায়িত্ব”। মূক ও বধির শরিফা পতির আদেশ পালন করে গিয়েছিল নির্জিবভাবে।

সকালে যে বিস্ময় শরিফার জন্য অপেক্ষা করছিল তা তার বোধবুদ্ধি কিংবা বিবেচনার বাইরে। লিয়াকত সকালে ঘুম ভাঙতেই জানায় বন্ধুকে, সে শরিফাকে তার সাথে করে নিয়ে যেতে চায়। শরিফাকে তার খুবই পছন্দ হয়েছে। ভবিষ্যৎ ক্ষমতার আশায় খুশি খুশি শরিফার স্বত্ব ত্যাগ করে দিল মির্জা। আমাদের গল্পের নায়িকা শরিফা তখন সবরকম অনুভূতি শূন্য হয়ে নির্বাক নিঃশব্দ রুমের মেঝেতে পরে ছিল এলোমেলো আর বস্ত্রহীন। দুজন দাসী এসে তাকে তুলে গোছল করাল, নতুন কাপড় পড়িয়ে সাজিয়ে দিলো। দামি শাড়ি আর ভারি অলংকার পরিহিতা শরিফাকে রানীর মত দেখাচ্ছিল। অনুভূতি শূন্য একটা শরীর টেনে নিয়ে বসিয়ে দেয়া হল লিয়াকতের গাড়িতে। শরীরটি বহন করে গাড়িটি এগিয়ে গেলো নামহীন এক অজানা ভবিতব্যের পথে!

কথা ছিল ঢাকায় গুরুত্বপুর্ণ বৈঠক সেরে পাকিস্থান ফিরবে মেজর লিয়াকত। সব সেভাবেই পরিকল্পনা করা ছিল। কিন্তু হাইকমান্ডের নির্দেশে সে আটকা পড়ল ঢাকায়। উপর থেকে কড়া নির্দেশ, এসময় ফেরা যাবেনা। বেইমান বাঙ্গালিদের শায়েস্তা করতে খুব শীগগিরই নির্দেশনা দেয়া হবে। আরও সেনা পাঠানো হচ্ছে পূর্ব পাকিস্থানে। কোন বড় পরিকল্পনা খেলছিল কসাই জেনারেল টিক্কা খানের মাথায়। যার প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম ২৫শে মার্চের কাল রাত্রিতে, যাকে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নাম দেয়া হয়েছিল।  (চলবে)

উপরে