NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৬

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৬.

সেইদিন হতেই শরিফার জায়গা হয়েছিল লিয়াকতের ঢাকাস্থ বাসভবনে। জীবনের মোড় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে শরিফার ধারণার বাইরে ছিল। এত কিছুর পরও কেন যেন কোনদিনও সে মৃত্যুর কথা ভাবতে পারেনি। কোথায় যেন একটা জিদ কাজ করত, শেষ দেখে নেবার। শরিফা ভাবতেও শুরু করেছিল এর চেয়ে খারাপ তার সাথে আর কিছুই হবেনা। শুরুর দিকে দিনরাতের খবর তার ছিলোনা। তিনবেলা খাবারের জুটত নিয়মিত, বিনিময়ে ছিল লিয়াকতের কাছে নিজেকে নিঃশর্ত সমর্পণ। যদিও লিয়াকতের ব্যবহারে ছিল মনোযোগের ছাপ, যা শরিফা বহুদিন পায়নি তার সংসারে। লিয়াকত শরিফার প্রতি বেশ নিমগ্ন হয়ে পড়েছিল ধীরেধীরে। শরিফাও অভ্যস্ত হতে শুরু করল নতুন পরিস্থিতির সাথে। এদিকে মার্চের শুরুতেই উত্তাল ঢাকা শহর। শরিফা শুধু শুনতে পায় বাইরে মিছিলের শব্দ। যদিও বুঝেনা সে কি হচ্ছে আর কেনই বা হচ্ছে, তবে লিয়াকতের মাঝে মাঝে তার সাথে বলা কথা শুনলেই বুঝতে পারে দেশের ভেতর গোলমাল দানা পাকাচ্ছে। সবখানেই যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। একদিন সাহস করে বলেও ফেলেছিল শরিফা লিয়াকতকে, ‘কি হচ্ছে, কেন প্রতিদিন বাইরে এত হৈচৈ শুনা যায়, এত মিছিল কিসের’? না, লিয়াকত তার বরের মত খেঁকিয়ে উঠেনি। বরং খুব আগ্রহ নিয়েই শরিফাকে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছে। শরিফাকে পইপই করে বুঝিয়ে দিয়েছে, পূর্ব পাকিস্থানের বাঙালিরা বেইমানের জাত পাকিস্থান ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে। আর পাকিস্থান সরকার এটা কিছুতেই মেনে নেবেনা। তাই লিয়াকত আর তার মত দেশ ভক্ত সেনারা সব ঢাকায় একত্রিত হচ্ছে। বেইমান বাঙ্গালিকে শায়েস্তা করেই তারা ঘরে ফিরবে। এমাসেই হয়ত কিছু একটা ফয়সালা হয়ে যাবে। কারণ বড় গাদ্দার শেখ মুজিব সব বাঙ্গালিকে ভুল দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। তাঁর কথা মত হরতাল আর অসহযোগ আন্দোলন করছে বাঙালীরা। কারফিউ দিয়েও এদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। তাঁর ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে দেয়া ভাষণে নাকি দেশের মানুষকে উস্কানি দিয়েছেন যুদ্ধের। এটা সরাসরি বিদ্রোহ দেশের বিরুদ্ধে, এককথায় দেশ দ্রোহিতা। তাই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সরকার থেকে। এবার এমন শিক্ষা দেয়া হবে যেন কোনদিন আর বাঙালি মাথা উঁচু করে কথা বলতে না পারে।  কথা বলতে বলতেই রেগে গিয়েছিল লিয়াকত। হঠাৎ খেয়াল করল শরিফা ভয়ার্থ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অট্টহাসিতে ফেটে পরল লিয়াকত, টান দিয়ে শরিফাকে বুকে নিয়ে বলল, ‘ জানেমান, তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তোমাকে ভালবাসি তাই তোমার কিছু হবেনা। তবে তোমার বেইমান জাতভাইদের শায়েস্তা করব এক এক করে’।

দেশে কি হচ্ছে পুরাপুরি বুঝতে না পারলেও শরিফা বুঝে গিয়েছিল যা হচ্ছে খুব খারাপ কিছু হচ্ছে। এদিকে লিয়াকতের আচরণ ছিল অস্থির আর অচেনা। মাঝে মাঝে যেন ভুলেই যেত শরিফার উপস্থিতি, আবার মনে হলে চলত একটানা নির্যাতন। এসবের মাঝেই একদিন রাতে শরিফার ঘুম ভেঙ্গে গেলো ভয়াবহ আর কান ফাটানো গর্জনে। মেশিনগান আর বোমার মুহুর্মুহু শব্দে  কেঁপে উঠল সে। যেন কেয়ামত নাজিল হয়েছে তার চারপাশে, ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অনেকদিন পর আম্মিজান বলে কেঁদে উঠল শরিফা। সেদিন দুপুরে এক পলকের জন্য লিয়াকত ফিরেছিল, বেরিয়ে যাবার সময় বলেছিল, আজ হয়ত দেরি হবে ফিরতে। জ্বি, ঠিকই আন্দাজ করেছেন, সেদিন ছিল ২৫শে মার্চের সেই ভয়াবহ গণহত্যা যজ্ঞের কালরাত্রি, যেটার নাম পাক হানাদার বাহিনী দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। (চলবে)

উপরে