NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৭

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৭.

যুদ্ধ শুরু হয়েই গেলো সারাদেশে। টানা নয়টা মাস, সে কি দুঃস্বপ্নের প্রহর ছিল একটার পর একটা। শরিফার জন্য সেই কয়টা মাস ছিল গণ্ডগোলের মাস। আজো যখন নিঃশব্দে সেসব দিনের কথা ভাবে মনে মনে শিউরে উঠে সে। কিছুতেই মনে করতে চায়না সেসব ফেলে আসা দিনের কথা। তবুও কিভাবে যেন স্মৃতির দরজায় সব ঘটনাগুলি পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায়। মনে করিয়ে দেয় কালের গর্ভে না শুকানো ক্ষতগুলি। ২৫শে মার্চের সেই কালরাত্রির পর থেকে পাল্টে যাচ্ছিল দেশের চিত্র। এপ্রিল থেকে পাকিস্থানি সেনারা ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে। এরপরের ঘটনাগুলি ছিল শরিফার জন্য কখনো আতংক, কখনো অস্থিরতা, কখনো অত্যাচার আবার কখনোবা অপমান আর মৃত্যু কামনার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিল সে সব সয়ে। ২৫শে মার্চের পর থেকেই জুন পর্যন্ত লিয়াকতের ডিউটি পরে ঢাকা শহরে। শরিফার ও ডিউটি বাড়ে সেই সাথে। তাকে লিয়াকত প্রায়শই অন্য আর্মি অফিসারদের কোয়ার্টারে পাঠানো শুরু করে। কখনো একজন, কখনো দু’জন, কখনও বা দলবেঁধে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত খান সেনারা। দাঁতে দাঁত চেপে সেইদিনগুলি কিভাবে বেঁচে ছিল আজো শরিফা ভেবে পায়না। কতবার মরতে চেয়েছে সে কিন্তু কেন যেন বেঁচে থাকার ছিল তার অদম্য ইচ্ছা! কোন পিছুটান না থাকা স্বত্তেও সে মরতে পারেনি।

জুলাই থেকে পরিস্থিতি পালটাতে শুরু করে। শরিফা ঠিক বুঝেনা দেশের কোথায় কি হচ্ছে, তবে সে এটুকু বুঝতে পারে যা হচ্ছে তা হয়ত ঠিক হচ্ছে না কিছুতেই। কারণ লিয়াকত আর তার সঙ্গীরা সবসময় ক্ষেপে থাকত ভয়ানকভাবে। উর্দুতে গালাগাল করত বাঙ্গালিদের। ওদের সাথে যোগ হয় কিছু পূর্ব পাকিস্থানি চেহারা আর থাকতো কিছু বিহারি। শরিফা শুধু দেখত ওরা আর্মি কোয়ার্টারে আসে, বিগলিতভাবে ফিসফিসিয়ে নানা খবর দেয়, হাত কচলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কখনওবা আর্মিরা ওদের সাথে সেসব খবর শুনার সাথে সাথেই তড়িৎগতিতে বেড়িয়ে যায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সুসজ্জিত হয়ে। উল্লাসিত হয়ে ফিরে আসে কয়েক ঘণ্টা পর চোখে মুখে পৈচাশিক আনন্দ নিয়ে, তারপর চলে টানা লম্বা সময় ধরে খানাপিনা আর নারী শরীর নিয়ে ফুর্তি। শরিফা খেয়াল করে মাঝে মাঝেই জীপ ভর্তি করে মেয়েদের ধরে আনে পাকি সেনারা। কয়েকদিন ধরে চলে তাদের উপর নির্মম অত্যাচার। সেসময় আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠে সেসব মেয়েদের গগণবিদারী চিৎকারে। তারপর আবার দেখে সব উধাও। শরিফা ভেবে পায়না এত মেয়ে পাকিরা কোথা থেকে ধরে আনে! আবার কোথায়ই বা ছেড়ে আসে তাদের। ভেবে পায়না পাকি সেনাদের এত বেশি নারী শরীর প্রীতি কেন! আবার মনে পড়ে যায় তার স্বামীর কথা, সে ও তো নারী ছাড়া কিছুই বুঝেনা। না, শরিফার কোন বড় করে দীর্ঘশ্বাস পড়েনা এখন আর। নির্বাক আর নিশ্চুপ হয়ে গেছে সে বহু আগেই।

এসময়ের মাঝেই তার দেখা হয়েছিল লতিফের সাথে। লতিফ ছিল পাকসেনাদের খবরাখবর দানকারী খুবই বিশ্বস্ত এবং পরীক্ষিত একজন বন্ধু। পরে জেনেছিল শরিফা যে ধর্মের নামে, দেশ রক্ষার নামে সে তার মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে আর ভাইয়ের পোয়াতি বউটিকে পাকসেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। এতে খুশি হয়ে তাকে ঢাকার মিরপুর এলাকার আল-শামস বাহিনীর প্রধান করে দেয়া হয়। তার অনুসারীরা পূর্ব বাংলার গাদ্দারদের নাম ঠিকানা যোগাড় করে পৌঁছে দিত খানসেনাদের। এইরকম অনেক লতিফ তখন রাতারাতি জন্ম নিয়েছিল ক্ষমতার লোভে, যারা দেশ রক্ষা আর ধর্ম রক্ষার নামে পূর্ব বাংলার সোনার ছেলেদের বেছে বেছে তুলে দিয়েছিল পাক হানাদারবাহিনীর হাতে। অক্টোবরের কোন এক সকালে লতিফের চোখ পরে শরিফার দিকে। ততদিনে ঢাকার পাশের এক অপারেশনে লিয়াকত খাঁ মারা যায় মুক্তিবাহিনীর হাতে।  শরিফা সেদিন সকালে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল লিয়াকতের বাসভনেই মৃত প্রায় হয়ে। সারারাত তার উপর অত্যাচার চালানোর পর ভোরে পাকসেনারা ভোরে বেড়িয়ে পরে ছিল কোন এক মিশনে। লতিফ এক জরুরি খবর দিতে এসে দেখে শরিফা মাটিতে পরে গোংগাচ্ছে। লোভে চকচক করে উঠে লতিফের চোখদুটি। কিছুক্ষণ ভেবে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এই মেয়েটিকে সে তার নিজের কাছে রাখবে। তাড়াহুড়া করে কোনমতে শরিফাকে ভদ্রস্থ করে কোলে নিয়ে একপ্রকার পালিয়ে আসে সে লিয়াকতের বাসা থেকে। ( চলবে)

উপরে