NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৮

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৮.

ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে আসে শরিফার। চোখ মেলে সে নিজেকে সম্পুর্ন নতুন এক পরিবেশে দেখে। ধরমরিয়ে উঠে বসতে চায় কিন্তু হঠাৎ কে যেন বাঁধা দেয় তাকে। মাথা ঘুরিয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখে অপরিচিত মুখ, যে কিনা হাত দিয়ে তাকে উঠে বসা থেকে বাঁধা দিচ্ছে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই লতিফ মুখ খুলে। ধীরে ধীরে জানায় সব কথা। বলে, এখানে শরিফার কোন ভয় নেই, সে লতিফের কাছে নিরাপদ। নিজের পরিচয় দেয় সে লতিফার কাছে, জানায় এখন সে মিরপুর এলাকার আল-শামস বাহিনীর প্রধান এবং দেশের জন্য খুবই পুণ্যের কাজ করছে। তার পুণ্যের কাজ হচ্ছে দেশের বেঈমান আর গাদ্দারদের পাকিস্থান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে তাদের দেশ দ্রোহিতার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করা যাতে শিগ্রই দেশ বেঈমান মুক্ত হয় এবং এক পাকিস্থান রাষ্ট্রের পতাকাতলে সবাই সুখে শান্তিতে থাকতে পারে। খুবই গর্বের সাথে জানায় তার নিজের মায়ের পেটের ভাই আর তার বউয়ের; দেশের সাথে প্রতারণার শাস্তি সে কি দিয়েছে! তাদের নিজের হাতে তুলে দিয়েছে পাক বাহিনীর হাতে। দেশ শান্ত হলে লতিফ রাজনীতিতে যোগ দিবে, তাকে নিশ্চিত ক্ষমতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকসেনার হাইকমান্ড।

কদিনের বিশ্রামেই শরিফার চেহারা খোলতাই হতে শুরু করে। এক লতিফ ছাড়া তার উপর আর কোন বাড়তি অত্যাচার নেই। বিগত কিছুদিন সে এতো বেশি অত্যাচারের মুখোমুখি ছিল যে লতিফের অত্যাচার আর শরিফার কাছে কোন অত্যাচার বলে মনে হয় না। জীবন কতটুকুই বা হল! তের কিংবা চৌদ্দ বছর না পেরুতেই কতবার যে সে মৃত্যুর কাছ থেকে ঘুরে এলো! তার চেহেরা আর শরীর এই দুইয়ের সৌন্দর্য্য তাকে বারবার বিপদে ফেলেছে আবার বাঁচিয়েছেও। অবশ্য শরিফা বেশিক্ষণ ভাবতে পারেনা সে কি আদৌ বেঁচে আছে! এটাকে কি বেঁচে থাকা বলে? মাঝে মাঝে আব্বজান আর আম্মিজানের জন্য বুকটা খাখা করে। আর ছোটভাইটার কথা মনে হলে দুচোখ ভরে জল আসে। কে জানে কেমন আছে সবাই, কিভাবে আছে। বাড়িতে ফিরে যেতে মন চায় তার, কিন্তু সে এই কিছুদিনে বুঝে গেছে সেখানে আর কোনদিনও ফেরা সম্ভব নয়, সে রাস্তা মুছে গেছে শরিফার জন্য চিরতরে। হঠাৎ হঠাৎ নিজের পেটে হাত বুলায় সে! কিছু একটার অস্তিত্ব বড়ই আশা করে, কিন্তু অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব কি অনুভব করা যায়! কেউ কি পেরেছে কখনও?

একা থাকার কিছু সময় ইদানীং শরিফা নিজের করে পায়। এইসময়গুলিতে লতিফ বাসায় থাকেনা। চাকরবাকরে ঘর ভরা সেইসাথে আছে পাহারাদার ও দরজায়। তাই মন চাইলেও সে কোথাও যেতে পারেনা। লতিফ তাকে কাপড়ে আর গয়নায় ভরিয়ে রেখেছে। একান্ত সময়গুলিতে শরিফার প্রতি লালসার পাশাপাশি ক্ষমতার লালসাও তার কথায় প্রকট হয়ে উঠে। শরিফাকে জানায়, যুদ্ধ প্রায়ই শেষের দিকে, পাকিস্থান আবার এক হলেই সংসদে তার আসন নিশ্চিত। নির্বিচারে মরছে নাকি চারিদিকে বেইমানের দল। শরিফাকে সে নাকি তার রানী করে রাখবে, সারাজীবন কোন কষ্ট হবেনা তার ভাত-  কাপড়ের। এইযে অত্যাচার কিংবা এতমধুর কথবার্তা, এসব কিছুই কানে যায়না শরিফার। সে পাথরের মুর্তির মত কেবল আদেশ পালন করে যায়। যখন লতিফ বাসায় থাকেনা তখনই যেন সে একটু নিজের মত করে ভাবতে পারে, শ্বাস নিতে পারে! একান্ত নিজের এই সময়টা পেতে তাই প্রতিদিন শরিফা অধীর হয়ে অপেক্ষায় থাকে কখন লতিফ বেড়িয়ে যাবে বাসা থেকে। লতিফ বেড়িয়ে গেলেই তার ভাবলেশহীন মুখাবয়বে যেন শান্তির একটা পরশ নিজে থেকেই অনুভব করে সে। এই ছোট জীবনের বড় বড় ঘটনায় সে এটুকু বুঝতে শিখেছে যে, এই আশ্রয়টাও তার জীবনে বেশিদিন স্থায়ী হবেনা। যে কোন সময় আবার গৃহহীন হতে পারে সে।

এইরকমই একটা বিষণ্ণ দিনে জানালার পাশে বসে কত কি যে ভাবছিল শরিফা। হন্তদন্ত হয়ে লতিফকে ফিরতে দেখেই নিজের চিন্তার জগত থেকে বাস্তবে ফিরল। হরবরিয়ে লতিফই জানালো আজ খুব গুরুত্বপুর্ণ একটা অপারেশন আছে ঢাকাতে। বাছাই করা হয়েছে বেইমানদের মাথাগুলিকে। মাথা ফেলে দিলেই নাকি শাস্তি পুরা হয়। তাই আজ তারা সেই মাথাগুলিকে তুলে নিয়ে আসবে উপযুক্ত বিচার করতে ও দেশের বিরুদ্ধতা করার শাস্তি দিতে। এই কাজটা যদি ঠিকমত করা যায় তবে নিমকহারাম বাঙালি আর কোনদিনও মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহস পাবেনা। বিষ দাঁত উপড়ে তুলে ফেলার সমস্ত পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তাই লতিফ খুব ব্যস্ত থাকবে আজ। হয়ত রাতে নাও ফিরতে পারে। কারণ এই পুরা কাজটির প্রধান দায়িত্বে আছে লতিফ। এবং আজকের এই কাজটির সফলতার উপর নির্ভর করছে তার সামনের দিনের রাজনীতিতে স্থান। এখানে উল্লেখ করা যেতেই পারে, দিনটি ছিল ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। (চলবে)

উপরে