NarayanganjToday

শিরোনাম

পর্ব-৯

লাল-নীল সংসার

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার

৯.
১৯৭৩ সালের প্রথম দিককার কথা। মাঝে বছর গড়িয়েছে একটি। শরিফা বেঁচে আছে এবং বেশ ভালভাবেই বেঁচে আছে! তবে তার ভাগ্য মাঝের এই বছরটিতে তাকে নিয়ে বেশ খেলেছে ঠিক আগের মতই। দেশ স্বাধীন কি তা শরিফা জানেনা, বুঝেওনা। সে যা বুঝেছে তার নিজের মত করে তা হল এদেশে গণ্ডগোল লেগেছিল, সেই গণ্ডগোলে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত তাতে এদেশের মানুষেরা জিতেছিল, তাই গোলমাল থেমেছিল। আর যা জানে তা হল, এখন আর কেউ পূর্ব পাকিস্থান বলেনা পূর্ব বাংলাকে, বলে বাংলাদেশ। শরিফা বুঝেনা এতে কার কি লাভ হয়েছে। সে নিজেকে দিয়ে চিন্তা করে দেখে, লাভের মধ্যে এটুকুই যে সে আজো মরেনি। বহাল তবিয়তেই বেঁচে বর্তে আছে!

ছোটবেলায় শরিফা তার আম্মিজানকে বলতে শুনত মেয়েমানুষের জীবন কই মাছের প্রাণ, সহজে যায় না। নিজের জীবন দিয়ে সে এই কথার সত্যতা বুঝেছে। কত যে ঝড়-ঝাপটা এলো তার এইটুকুন জীবনে, সে কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন বেঁচেই গেছে প্রতিবার। তার কাছে দিন,মাস, কিংবা বছরের হিসাব আর সেভাবে করে জরুরী হয়ে উঠেনা আজকাল। শুধু বেঁচে থাকার নেশা যেন রক্তে, একটা দারুণ জিদ কাজ করে মগজে, শেষ দেখতে চায় সব কিছুর। নইলে লতিফ ও যখন তার সাথে মিথ্যা চালাকি করল তখন ও তার মরার সুযোগ এসেছিল খুব কাছেই, কিন্তু কেন যেন মরতে গিয়েও মরতে পারেনি শরিফা। সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব শরিফার নিরবিচ্ছিন্ন জীবনে ঢেউ তুলেছিল ভালভাবেই। স্বাধীন বাংলাদেশের চোখে যারা বেইমান, রাজাকার আর মীরজাফর বলে পরিচিত হয়েছিল তাদের অনেকেই নিজেকে বাঁচাতে নানারকম পন্থা বেছে নিয়েছিল। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পাকিস্থান স্থায়ীভাবে পাড়ি জমিয়েছিল, কেউবা দেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে আশ্রয় নিয়ে ছিল, কেউবা  নিজেকে পুরাপুরি দেশপ্রেমিকে পরিণত করেছিল রাতারাতি। যারা দেশে থেকে গিয়ে ভোল পাল্টে ফেলেছিল তারাই মূলত এইদেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সর্বদা, কারণ উপরে উপরে দেখালেও কোনদিনই এদেশটিকে বাংলাদেশ বলে মনে ঠাই দেয়নি এই রাজাকার-আলবদর বাহিনীর দোসরেরা।

শরিফার অবশ্য কিছুই যায় আসেনা এসবে। অনেকবার ভাবতে চেয়েছে, পাকিস্থান কিংবা বাংলাদেশ তাতে কি এসে যায়? সে তো সব আমলেই শুধু হাত বদলের পুতুল ছিল। পাকিস্থান আমলে তার স্বামী নামক দুপেয়ে জন্তুটি তাকে প্রথম হাত বদলে দেয়, সাথে তার ভাগ্যও, সেই ধারাবাহিকতায় আজ সে পতিতাপল্লির বাসিন্দা। শরিফা কিছুই ভাবতের চায়না আর। অনেক দেখে ফেলেছে সে এইটুকু জীবনে। আর এর চেয়ে বেশি তার সাথে কিইবা হবে? লতিফের কথা মনে হতেই একদলা থুতু মুখ থেকে ছুড়ে ফেলল সে মেঝেতে। একটা বছর! দীর্ঘ একটা বছর সে শরিফাকে ভোগ করেছে নানা মন ভুলানো কথা বলে, ঘর-সংসারের স্বপ্ন দেখিয়ে। শরিফাকে সাথে নিয়েই সে তখন এলাকা আর নাম ও পরিবর্তন করে ফেলেছিল নিজেকে বাঁচাতে। লতিফ থেকে নাম বদলে হয়েছিল রিয়াজ, সেজেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বন্ধু। ধীরে ধীরে গর্ত থেকে বের হয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করছিল স্বগৌরবে। তার লক্ষ্য ছিল স্থির, আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সে শরিফাকে ঝেড়ে ফেলে কৌশলে। এক মুক্তিযোদ্ধার বিধবা মেয়েকে বিয়ে করে লতিফ দেশদরদীদের তালিকায় নিজেকে স্থান দিতে সক্ষম হয়, ফলে শরিফাকে জীবন থেকে সরানো অত্যাবশ্যক হয়ে পরে। বিশ্বস্ত এক সঙ্গীর হাতে শরিফাকে সঁপে দেয় পরিচিত এক নারী দালালের হাতে বেঁচে দিতে। যদিও শরিফাকে বলেছিল কদিনের জন্য অন্য কোথাও পাঠানো হচ্ছে   তাকে, কিছুদিন পর ফিরিয়ে এনে ওকে বিয়ে করবে লতিফ। লতিফা কি মনের কোন এককক কোনায় বসে কথাটা বিশ্বাস করেছিল? অদ্ভুতভাবে বুক কাঁপানো হাসি হেসে উঠে শরিফা। এই জীবন! এটাই তার শেষ জীবন! (চলবে)

উপরে