NarayanganjToday

শিরোনাম

লাল-নীল সংসার-১১

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার-১১

নতুন জীবনে প্রথম ক’দিন খুবই দিশেহারা বোধ হল নিরুর। নিয়মের বেড়াজালে সে খুবই বিচলিত হতে লাগল। তার এতদিনের প্রজাপতির মত উড়েঘুরে বেড়ানো জীবনটা হঠাৎ করেই থমকে গেল। সারাদিনে তার জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান নির্ধারিত না থাকলেও রাতে শোবার জন্য জায়গা হতো ড্রয়িং রুমের মেঝেটা। সে বাসাতে নিরুর নতুন চাচা-চাচি আর তাদের বাচ্চারা ছাড়াও আর একজন থাকত। চাচির ছোট ভাই নাম ছিল জাহিদ, যে কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। চাচি মানুষটা মানুষ ছিল নাকি অন্যকিছু তা কোনদিনও বুঝতে পারেনি নিরু। চাচা মাঝে মাঝে দুই-তিন দিনের জন্য অফিসের কাজে বাইরে থাকতেন। আর চাকরি থেকে ফিরে চাচি যতক্ষণ বাসায় থাকত কাজ আর চিৎকার চেঁচামেচি করত। চাচির ভয়েই হোক কিংবা ঝগড়া এড়ানোর ভয়েই হোক চাচা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করত।

গ্রামের মেয়ে হওয়াতে নিরু কাজেকর্মে পারদর্শী ছিল, তাই কাজ করতে তার বেগ পেতে হত না। ধীরে ধীরে ঘরের সমস্ত কাজই নিরুর ঘাড়ে এসে পড়ে। সকালের নাস্তা বানানো থেকে শুরু করে বাচ্চাদের দেখাশুনা, রান্না করা, ঘর গুছানো, কাপড় ধোয়া যাবতীয় সবই তার করতে হত। এরপরও যদি কাজে এদিক-সেদিক হত চাচি তার গায়ে হাত তুলত যখন-তখন।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিরবে কাঁদত নিরু। মায়ের মুখটা চোখে ভাসত, ছোট ভাইবোনদের কথা মতে হত, বুকটা হাহাকার করে উঠত তার!

চেহেরা আর শরিরের গড়ন ভালোই ছিল নিরুর। শহরের বন্দী জীবন আর পেট ভরে তিনবেলা খাবার তার চেহেরা আর বাড়ন্ত শরির দুইই খোলতাই করছিল। চাচার মেয়েদুটিকে নিরু নিজের বোনদের মতই আদর করত। চাচাও তাকে বেশ বাড়াবাড়ি রকমেরই আদর করত যা নিরুর মনে প্রায়শই অস্বস্তির জন্ম দিতো, যখন তখন মা ডেকে বুকে জড়াত, গায়ে পিঠে হাত বুলাত অযাচিতভাবে, আর মুখে বলত কষ্ট করে মানিয়ে নিতে। যদিও বউ সামনে থাকলে আদরটুকু অপ্রকাশিত থাকত। জাহিদ, চাচির ভাইটি ছিল ভীষণ চুপচাপ ধরণের। চাচির কথা শুনে জেনেছিল জাহিদ নাকি ছাত্রনেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করে। রাজনীতি কি নিরু বুঝেনা, শুধু দেখত রাত জেগে জেগে ঘাড় গুঁজে অনেক মোটা মোটা বাংলা আর ইংরেজি বই পড়ত জাহিদ আর সারাক্ষণ কি সব লিখত, আঁকত।

এভাবেই দিন যেতে যেতে একসময় বাড়ি যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠল নিরু। চাচাকে বারবার বলেও লাভ হলনা, তাই সে চাচিকে বলল। চাচিও সদয় হয়ে কথা দিল, বড় মেয়ের পরীক্ষা শেষ হলেই তিনিও কদিন ছুটি নিয়ে বাবার বাড়ি যাবেন আর নিরুকেও বাড়ি পাঠাবেন। আনন্দের দিনটি কাছেই ঘনিয়ে এলো অবশেষে। বড় মেয়েটির পরীক্ষা শেষ হলে চাচি কদিন ছুটি নিলেন বাবার বাড়িতে যাবেন বলে। বেশি অবাক হল নিরু সবার জন্য কেনাকাটার সাথে চাচি তার জন্যও নতুন কাপড় কিনলেন। হাতে দিলেন কিছু টাকা আর বারবার বললেন যে, নিরু যেন সময় মত বাড়ি থেকে ফিরে আসে কারণ এবার আসলেই তাকে ইস্কুলে ভর্তি করে দেয়া হবে। কথা হল নিরুকে দুই-এক দিনের মাঝেই চাচা কোনরকম একদিনের ছুটি ম্যানেজ করে বাড়ি রেখে আসবেন সপ্তাহখানেকের জন্য। চাচা যাচ্ছেন না চাচির সাথে লম্বা ছুটি ম্যানেজ করতে পারেন নাই বলে। চাচির ভাইটি ও রয়ে গেল ক্লাস চলছে বলে। মেয়েদের নিয়ে চাচি এক সকালে রওনা দিলেন বাবার বাড়ি, চাচা সাথে গেলেন তাদের বাসে তুলে দিতে। চাচির ভাইটিও বের হয়ে গেলো ক্লাসের উদ্দেশ্যে।

বাসা খালি হওয়াতে মনমরা হয়ে গেল নিরু। কোন কাজ নেই করার মত তাই টিভি দেখতে লাগল একা একা। সকাল না গড়াতেই হঠাৎ করেই চাচা বাসায় ফিরে এলেন, বললেন অফিসের কিছু জরুরি কাগজ ফেলে গেছেন তাই নিতে এলেন আর ভাত খেয়েই বের হবেন। নিরু কাজ পেয়ে খুশি হয়ে গেল। রান্নাঘরে গেল ভাত-তরকারি গরম করতে। আচমকা পেছন থেকে চাচা তাকে জাপটে ধরল। নিরু কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে ফেলল তার চাচা। পাগলের মত নিরুর শরির ঘাটতে ঘাটতে নিরুকে বিবস্ত্র করে ফেলল নিমিষেই। কিছু বুঝে উঠার আগেই চাচার হাতে ধর্ষিতা হয়ে রক্তাক্ত নিরু বিছানায় পরে রইল অসহায় ভাবে। চেতন কিংবা অচেতনের মাঝামাঝি অবস্থায় আবার তার উপর ঝাপিয়ে পরল চাচা। প্রচন্ড ব্যথা আর কষ্টে চিৎকার করতে চেয়েও পারল না সে চিৎকার করতে। মুখ চেপে ধরে ছিল তার চাচা। কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল সময় জানেনা নিরু, হঠাৎ মনে হচ্ছিল কে যেন তাকে অনেক দূর থেকে নাম ধরে ডাকছে। একবার মনে হল মা ডাকছে, একবার মনে হল বাবা, আবার মনে হল যে ডাকছে নিরু তাকে চিনেনা। ধীরে ধীরে বুঝল তার চাচাই তাকে আদর করে ডাকছে নাম ধরে।

চেতন-অচেতনের মাঝে বোধহীন নিরু ফেলফেল করে তাকিয়ে রইল চাচার দিকে। চাচা নিরুর শরিরে হাত বুলাতে বুলাতে বলছে, নতুন জামা কিনে দিবে, জুতা কিনে দিবে, ইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবে, তার বাবাকে টাকা বাড়িয়ে দিবে, চাচার কথা শুনলে আর কোন কষ্ট দিবেনা। সব কথার শেষ কথা ছিল নিরু যেন এই কথা কিছুতেই কাউকে না বলে তাহলে নিরু যা চায় তাই পাবে। আজ যেন নিরু আর কোন কাজ না করে, খেয়েদেয়ে দুপুরে শুধুই বিশ্রাম নিবে আজ। নিরু বুঝে গেল চাচা নামের এই অমানুষটি তার মেয়ে জীবনের যে ক্ষতি করল তার মূল্য কম বা বেশি আর কোনভাবেই পূরণীয় নয় নিরুর কাছে! (চলবে)

উপরে