NarayanganjToday

শিরোনাম

লাল-নীল সংসার-১২

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার-১২

সেদিন রাতেই ভীষণ জ্বর এলো নিরুর। নিজের বেডরুমে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল তার চাচা। ড্রয়িং রুমের মেঝের কার্পেটে শুয়ে জ্বরে কাঁপছিল আর মা মা করে ডাকছিল মেয়েটা। ড্রয়িংরুমের ঠিক পাশের রুমেই থাকে জাহিদ। রাত জেগে পড়ালেখার অভ্যাস তার, পড়ছিল সে। কিন্তু নিরুর গোঙ্গানির শব্দে বারবার মনোযোগ বিঘ্নিত হচ্ছিল বলে উঠে এলো দেখতে কি হয়েছে। এসে দেখে কার্পেটে বেহুঁশের মত পরে প্রলাপ বকছে আর থেকে থেকে কেঁপে উঠছে নিরু। এই মেয়ে কি হয়েছে বলে কয়েকবার ডেকেও যখন সাড়া পেলনা তখন কাছে এগিয়ে গিয়ে গায়ে ঠেলা দিল, দেখল প্রচণ্ড জ্বরে নিরুর শরির পুড়ে যাচ্ছে আর মা, মাগো বলে কোঁকাচ্ছে শুধু। কি করবে বুঝতে না পেরে জাহিদ নিজের রুম থেকে একটা প্যারাসিটামল নিয়ে এলো হাতে করে। বেশ কয়েকবার ডাক দিয়ে নিরুকে ট্যাবলেটটা খেয়ে নিতে বলল। কিন্তু নিরু হঠাৎ যেন হুঁশ ফিরে পেয়ে ভয়ে কুঁকড়ে গেলো, আতংকিত ভাবে বারবার বলতে লাগল, “না, না, চাচা আমাকে ছেড়ে দেন, চাচা আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছেড়ে দেন”।  “এই মেয়ে কি হয়েছে? কি হয়েছে তোমার”? জাহিদের কথার কোন উত্তর না দিয়ে বিড়বিড় একই কথা আওড়াতে লাগলো নিরু। জাহিদ কিছুক্ষণ ভেবে মাথা তুলে জোর করে ট্যাবলেটটা খাইয়ে দিল নিরুকে। নিজের রুম থেকে একটা চাদর এনে গায়ে টেনে দিলো। তারপর কি যেন চিন্তা করতে করতে চলে গেল নিজের রুমে।

এরপর সারারাত আর ঘুমাতে পারলো না জাহিদ। নিরুর সাথে কি ঘটেছে তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি তার। জাহিদ তার দুলাভাইয়ের চরিত্রের নোংরা এই দিকটি সম্পর্কে ভালভাবেই অবহিত। ট্যুরের নাম করে প্রায়ই তার অফিসের সেক্রেটারিকে নিয়ে অন্য কোথাও রাত কাটায়। তার বোনও এসব জানে। বাসায় কোন কম বয়সি কাজের মহিলা বা মেয়ে রাখা যায় না বেশিদিন এই স্বভাবের জন্যই। এইসব ব্যাপার নিয়ে অনেক ঝগড়াঝাটিও হয়েছে আপা আর দুলাভাইয়ের মাঝে। বেশি ঝগড়া হলেই দুলাভাই ভয় দেখিয়ে তার আপাকে বলে বাচ্চাগুলি নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যেতে। জাহিদ জানে ঠিক এই জায়গাটাতেই তার বোন কতটা দুর্বল আর অসহায় হয়ে যায়। জাহিদ রাগে কয়েকবার গায়ে হাতও তুলতে চেয়েছে। কিন্তু তার আপা তাকে থামিয়ে দিয়েছে, হাতে ধরে কিছু না বলতে অনুরোধ করেছে প্রত্যেকবার। তার বোনের দুর্বলতা হল তাদের পুরা পরিবার। বাবা অনেক কষ্টে তার আপাকে পড়িয়েছে, চাকরি পেতেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তার বোনের শর্ত ছিল তিনি নিজের বাবার পরিবারকে দেখাশুনা করবেন, আর্থিক সাহায্য করবেন যতদিন তার ভাইটি নিজের পায়ে না দাঁড়ায়। বোনের বিয়ের পর থেকেই তাদের বাবা নানারকম অসুখে ভুগে পুরাপুরি শয্যাশায়ী, প্রতিমাসে অনেকগুলি টাকার ওষুধ কেনা লাগে। জাহিদ এখানে থাকছে, খাচ্ছে আর পড়ার টাকা পাচ্ছে, আরও ছোট ছোট তিনটি ভাইবোন আছে বাড়িতে যারা স্কুল কলেজে পড়ছে সবাই।। জমিজমাও বেশি নাই। মা কোনরকম সংসারটা টেনে নিচ্ছেন। তার আপা নিজের বেতন থেকে বেশ কিছু টাকা বাড়িতে পাঠায় প্রতিমাসে। সবাই আশায় আছে জাহিদ পড়ালেখা শেষ করে ভাল চাকুরি করবে। আর তাতে সব সমস্যার সমাধান হবে। তাই যখন দুলাভাই তার ভাতিজিকে নিয়ে এলো গ্রামের বাড়ি থেকে জাহিদ বুঝেছিল তার বোন স্বস্তি পেয়েছে মনেপ্রাণে। হায়রে! কিন্তু এতোটা অধঃপতন যে নিজের ভাইজিকেই....! এসব ভাবতে ভাবতেই জাহিদের হাতের মুঠো আর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। পুরো রাত জেগে অনেকগুলি হিসাব মেলাল সে।

সেদিন সকালে জাহিদ আর ভার্সিটি গেলনা, রয়ে গেল বাসায়।সকালে দুলাভাই বাসা থেকে বেড়িয়ে যেতেই সে নিরুর কাছে গেল । নিরুর গায়ে তখনও অনেক জ্বর। জাহিদ নিরুকে জিজ্ঞেস করল নিরু কি বাড়ি চলে যেতে চায়? বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে চায় কিনা? হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে নিরু কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। জাহিদের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে, মনে পড়ে এই বয়সী গ্রামের স্কুলে পড়া ওর নিজের ছোট বোনটার কথা। নিরুকে শান্ত হতে বলে সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। নিরুকে বাড়ি পৌঁছে দিতে দ্বারস্থ হয় তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে। বন্ধুকে বুঝিয়ে বলে সব এবং নিরুকে ঠিকভাবে বাড়িতে পোঁছে দিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করে। বন্ধু রাজি হলে বন্ধুকে বাস কাউন্টারে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলে দ্রুত বাসায় ফিরে আসে সে। নিরুকে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে বলে অনেক কষ্টে জমানো কিছু টাকা বের করে। এরপর তারা রওনা হয় বাস কাউন্টারে। এখানে এসেই খুঁজে পায় বন্ধুকে, টিকিট কেটে সব বুঝিয়ে বলে কিছু টাকা দিয়ে দেয় হাতে ওদের পথের খরচের জন্য এবং নিরুর হাতেও জোর করে ধরিয়ে দেয় আর কিছু টাকা। নিরুকে পোঁছে দিয়ে আজকের মাঝেই বন্ধুকে ফিরে আসতে বলে। বোনের শ্বশুরবাড়ি সে গিয়েছে কয়েকবার, তাই দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা আছে তার। সে জানে রাতেই ফিরে আসতে পারবে তার বন্ধু নিরুকে পোঁছে দিয়ে। বাসে তুলে দিয়ে বাস ছাড়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে জাহিদ। কেন জানি অকারণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে তার। মনটা ভার ভার লাগতে থাকে, মায়ের মুখটা ভেসে উঠে চোখে। শার্টের হাতায় চোখ মুছে ফিরতি পথে হাঁটা ধরে জাহিদ। (চলবে)

উপরে