NarayanganjToday

শিরোনাম

যুদ্ধশিশু

খালেদা আকতার রিনু


যুদ্ধশিশু

অফিসের চরম ব্যস্ততার মাঝে ইশতিয়াক যখন পার্সেলটি হাতে পেলো,একই সাথে অবাক এবং চিন্তা রেখা কপাল ঘেঁষে দাঁড়ালো। দেশ থেকে পার্সেল পাঠাবে এমন কোনো সুহৃদ তার নেই। আত্মীয় স্বজন অল্প যা কিছু আছে তাদের কারো সাথেই তার কোনো যোগাযোগ নেই বা বলা যায় ইশতিয়াকই রাখে নি।

আত্মীয়তা বা পরিচিতের সূত্র ধরে তার কলঙ্কিত অতীত ফিরে আসুক এটা কখনো ইশতিয়াক চায়নি। অনেক কষ্টে সে তার জীবনকে ঢেলে সাজিয়েছে। বলতে গেলে পাথর ঘঁষে ঝর্নার কলতান বইয়েছে। লন্ডনে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত এখন সে। শরীর থেকে মুছে ফেলেছে বাংলাদেশের গন্ধ। সযত্নে ভুলে থেকেছে তার অযত্নের জীবনস্মৃতি।

বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়ে প্যাকেটটা খুলেই ফেললো। ভিতরে আরেকটা মোড়কে মোড়ানে পুরনো একটা রংচটা সূতি শাড়ী বেরিয়ে এলো, সাথে খামের ভিতর থেকে একটি চিঠি-

“বাবা ইশতিয়াক,

আমাকে তুমি চিনবে না। তোমার বাবার আপন চাচাতো ভাই আমি, তোমার মাজহার চাচা। অনেক বয়স হয়েছে আর শরীরটাও ভালো না। যে কোনো সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই ভাবলাম, তোমাকে কিছু কথা না জানিয়ে গেলে বিবেকের কাছে দোষী থেকে যাবো।

অনেক খুঁজে তোমার পুরনো বন্ধু জাহিদের কাছেই তোমার হদিস পেলাম। একমাত্র ওর সাথেই নাকি তোমার মাঝেমাঝে যোগাযোগ হয়! ওই জানালো, কিভাবে তুমি স্কুল থেকে পালিয়ে এতোদূর সিলেট চলে গেলে, অজানা পরিবেশে, নিজেকে এতিম পরিচয় দিয়ে, জায়গীর থেকে পড়াশোনা শেষ করলে!! মেধাবী ছেলেটি একসময় ইন্জিনিয়ার হয়ে কৃতজ্ঞতা স্বরুপ সে বাড়ির মেয়েকেই বিয়ে করে লন্ডনে চলে গিয়ে থিতু হয়, সব জাহিদের কাছ থেকেই জেনেছি।

তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, তোমার মায়ের পরনের শেষ শাড়ীটার চিহ্ন তোমার কাছে পাঠিয়ে দিবো, সাথে তাঁর জীবনের শেষটুকুও আমার জানিয়ে দেয়া উচিত।

১৯৭১ এর এপ্রিল। তোমার বাবা বিয়ে করেছেন এক বছরও হয়নি। মাত্র জীবনটা গুছিয়ে উপভোগ করতে শুরু করবেন, এমন সময়ে যুদ্ধের ডাক এলো। দেশে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতেই অসম্ভব দেশপ্রেমিক, রাজনীতিক সচেতন এই মানুষটি সক্রিয় হয়ে উঠলেন। প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এক পর্যায়ে তোমার মা’কে একা রেখেই যুদ্ধে চলে যান। দেশের প্রতি এই দূর্নিবার টানকে, স্ত্রী এর প্রতি মায়ার টানেও পিছু হটাতে পারেনি।

যাবার পর থেকে প্রথম কিছুদিন খবর দিতে পারলেও এক সময় তাঁর সকল খবর আসা বন্ধ হয়ে যায়। তোমার বাবার প্রতীক্ষায় থেকে তোমার মা আর ওই বাড়ি ছাড়েন নি। যদি তোমার বাবা এসে ফিরে যান! আমি এবং প্রতিবেশীরা যতটুকু পারতাম খোঁজ রাখতাম।

এমনই এক যুদ্ধ চলাকালীন সন্ধ্যায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে তোমার মা’কে ধরে নিয়ে যায়। ছাড়া পায় প্রায় তিন মাস পরে... বিধ্বস্ত, পরাজিত, নীল বেদনায় ডুবে।

এক সময় বিজয় এলো। কিন্ত সে বিজয় সবার জীবনে আসেনি । কেউ কেউ প্রাণ দিয়ে, কেউ বা সতীত্ব বিলিয়ে দিয়ে পতাকার রঙ এনে দেয় হাতের মুঠোয়। তোমার মা, সমস্ত কলঙ্ক মাথায় চাপিয়ে, মূক হয়ে তোমার জন্মের অপেক্ষায় থাকেন। পরে, পরিচিত লোকালয় ছেড়ে, দূরে সরে গিয়ে তোমাকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

তোমার বয়স যখন পনেরো, মাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছো, তখনই একদিন স্কুল থেকে আর বাড়ি ফিরে আসোনি তুমি। তোমার মা সহ আমরা অনেক খুঁজেছি। থানা পুলিশের সহায়তা নিয়েও হঠাৎ নিঁখোজ তোমার কোনো হদিসই পেলাম না! প্রায় এক সপ্তাহ পরে তোমার সহপাঠী, কাছের বন্ধু, জাহিদ এসে একটি চিঠি দিয়ে গেলো...

খুব অল্প কিছু কথা লেখা তাতে....

‘আমি যুদ্ধ শিশু!! পাকিস্তান ক্যাম্পের নির্যাতন থেকে আমি জন্মেছি!!

আরও আগেই বললে না কেন এতো কঠিন সত্যটা? আমাকে জন্ম দিলেই বা কেন? তার আগেই গলায় ফাঁস দিয়ে যদি মরতে তবে আমিও এই পৃথিবী দেখতাম না! আঙ্গুল তুলে, আমাকে দেখিয়ে কেউ বলতো না, ওই যে ক্যাম্পের নষ্ট বীর্য থেকে জন্ম নেয়া... আমি চলে যাচ্ছি। একেবারেই। কখনই আর ফিরে আসবো না। খুঁজে কোনো লাভ হবে না।’

যুদ্ধ শেষে তোমার জন্মের পরে, সদ্য বিধবা একজন মা, একটি ধ্বংসের জনপদে দাঁড়িয়ে কীভাবে তোমাকে বুকে আগলিয়ে বছর গুনেছিলো, জীবনের সংগ্রামের যাঁতাকলে নিজেকে পিষ্ট করে তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলো, সে সব স্মৃতি আজও আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। অসম্ভব কষ্টের ধারক তোমার মা, তোমার সেচ্ছায় নিরুদ্দেশের ঘটনায় মানসিক আঘাত সহ্য করতে ব্যর্থ হয়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়লেন।

আমাদের পরিবারের সাথে ছিলেন প্রায় পাঁচ মাস। সীমিত সাধ্যের ভিতর চেষ্টা করেছি, তাঁর সব চিকিৎসা করার জন্য। সারাটা দিন তোমার শার্ট আর বই বুকে জড়িয়ে রাখতেন। বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে যাকে পেতেন তাকেই জিজ্ঞেস করতেন তোমার কথা। তাঁর সেই আর্তনাদ, তোমাকে একবার দেখার, ফিরে পাবার আকুলতার অসহ্য অস্থিরতায় সবাই কেঁদেছে।

শুধু তোমাকে কিছুই স্পর্শ করতে পারে নি। তুমি পরিচয় আড়াল করতে গিয়ে নাড়ীর বন্ধনের মা’কে অস্বীকার করেছো! তুমি জন্ম পরিচয় লুকাতে গিয়ে নিজের ধমনীর রক্তকে উপেক্ষা করেছো। তোমার মা ক্যাম্পে নির্যাতিত হয়েছিলেন তিন মাস। সেখানে যতটা কলঙ্কিত হয়েছেন, স্বাধীন দেশের মাটিতে নিজের ঔরসজাত সন্তান তাঁকে আরও বেশী অসম্মানিত করে গেলো।

জীবনের শেষ পাঁচটা বছর তার পাবনা মানসিক হাসপাতালের বন্ধ রুমে কেটেছে। ডাক্তারের পরামর্শেই সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। একদমই হৈচৈ করতেন না সেখানে। শুধু প্রতিদিন তোমাকে চিঠি লিখতেন আর বলতেন ‘বাবাটার কাছে পৌঁছে দিও.... ওকে বলো, একটিবার দেখতে চাই আমি ওকে..... একবার ওর গাল ছুঁয়ে আদর করতে চাই... একবার হাত জোড় করে ক্ষমা পেতে চাই বাবাটার কাছে, নিজেকে রাক্ষস গুলোর হাত থেকে লুকিয়ে রাখতে পারিনি.... ওকে ভালোবেসেই আমি আত্মহত্যা করিনি... ওর জন্ম দিতে গিয়ে আমিতো লজ্জিত হইনি? একটুও তো কুণ্ঠিত হইনি?... ”

ইশতিয়াকের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর স্রোত চিঠি আর তার মায়ের পুরনো শাড়িটা ভিজিয়ে দিতে লাগলো। মনে পড়েনা, শেষ কবে কখন সে এতোটা কেঁদেছে... বুকের সবগুলো পাঁজরের হাড় যেনো সমস্বরে চিৎকার করে তাকে ব্যঙ্গ করে উঠলো... গগনবিদারী নিশ্চুপ প্রাণ যেনো চিৎকার তুলে বলে....

“ক্ষমা করে দিও মা.... পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তোমার সম্ভ্রম লুটেছে আর আমি তোমাক বাঁচতেই দিই নি। তুমিও যে এই লাল সবুজের পতাকায় মিশে আছো, আমি বুঝতে পারিনি। তোমাদের মতো সবার আত্মত্যাগে এদেশের প্রতিটি বালুকণা সমৃদ্ধ, আমি কখনো জানতেও পারিনি..”

বহু বছরের পুরনো গ্লানি আজ যদি ইশতিয়াকের চোখের জলে মিশে বুকের ভার কমিয়ে দেয় তবে সে কান্নার জলে নতুন করে শুদ্ধ হোক এদেশের স্বাধীনতা।

উপরে