NarayanganjToday

শিরোনাম

একদিন সকালে

রিপন ইমরান


একদিন সকালে

“ভাবি আর যাই বলেন, এদের সবজিটা কিন্তু দারুণ। আপনার ভাই আর আমি তো প্রায়ই সকালে এসে এখানে নাস্তা করি। ও আমাকে সাত সকালে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বলে, ‘রোজী চলো আজ ব্রেকফাস্ট বানানো লাগবে না। আমরা দুজনে বাইরে খাবো।’ আমি যতোই বলি, এ বয়েসে শুধু আমরা দু’জন। বাসার বাকিরা কী ভাববে? কিন্তু কে শোনে কার কথা! এমন পাগল আপনার ভাই।”

নীপা মুগ্ধ হয়ে ওদের গল্পগুলো শোনে। কী দারুণ দারুণ সুখী জীবনের গল্প করছে সবাই। এক নীপারই কোন গল্প নেই। তবে, নীপা খুব ভালো শ্রোতা। মন দিয়ে শুনে সবার গল্প। কেউ যখনই জিজ্ঞেস করে, ‘ভাবি আপনি কিছু বলছেন না যে?’ নীপা মাথা ঝাঁকিয়ে মিষ্টি করে হাসে আর বলে, ‘আমি খুব শ্রোতা, তবে বক্তা হিসেবে যাচ্ছে তাই’ নিজে কথাটা মুখে বলে বটে, তবে মনে মনে বিশ্বাস করে অন্য।

নীপা জানে ও খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারে। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ও কবিতা আবৃত্তি করেছিলো। প্রিন্সপাল ম্যাডাম নিজে স্টেজে উঠে ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো, ‘তুমি মেয়েটা যেমন মিষ্টি, তোমার গলার স্বর তার চেয়েও বেশি মিষ্টি’। এরপর তো বিয়েই হয়ে গেলো।

নীপা এই কবিতা আবৃত্তির ঢঙটা রপ্ত করেছিলো ওর বড় ভাইয়ের এক বন্ধুর কাছ থেকে, .নামটাও এখন ঠিকঠাক মনে আছে, চেহারাটা একটু আবছায়া, কতোদিন দেখা নেই...।

রবিন ভাই ওদের বাসায় খুব আসতো। দেখতে মোটেও ভালো না, কালো, মাথা ভর্তি এলোমেলো চুল, খুব কমদামী সিগারেট খেতো বোধহয়, বাসায় এলেই কেমন কটু তামাকের গন্ধে পুরো ঘর ভরে যেতো; কিন্তু গলার স্বরটা! রবিন ভাই যখন ভাইয়ার ঘরে বসে কবিতা আবৃত্তি করতো, নীপা দরজার ওপাশ থেকে শুনতো.। ওর সারা শরীর তখন ঝনঝন করতো।

রবিন ভাইয়ের সঙ্গে ওর কখোনই খুব বেশি কথা হয়নি। তবে, নীপা একদিন অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, রবিন ভাইয়ের তামাকের গন্ধটা আর তেমন খারাপ লাগছে না। এমনকি চেহারাটাও কেমন মায়া মায়া লাগে!

নীপা আজ বাবলুর স্কুলে এসেছিলো প্রিন্সিপাল স্যারকে একটু বলতে, এ মাসের বেতনটা আগামী মাসে দিয়ে দেবে একসঙ্গে, এ নিয়ে যেন বাবলুকে কিছু না বলে। কাল বাসায় ফিরে বাবলু খুব মুখ কালো করে বলেছিলো, ওকে আজ ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস টীচার দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো, এ মাসের বেতন দেয়া হয়নি তাই।

প্রিন্সিপাল স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে স্কুলের গেটে আসতেই এদের সাথে দেখা। এদের বাচ্চারা সব বাবলুর স্কুলেই পড়ে। বাচ্চাদের স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়ে এরা বাইরের গেটে বসে আড্ডা মারে। কখনো সখনো এদিক ওদিক ঘোরাঘুরিও করে দলবেঁধে। এদের মধ্যে একজন নতুন গাড়ি কিনেছেন। সে উপলক্ষে আজ খাওয়া-দাওয়া কাছেরই একটা রেস্টুরেন্টে।

নীপা ওদের সঙ্গে আসতে চায়নি। বরাবরেই ও এসব আয়োজন এড়িয়ে চলে। কিন্তু সবাই মিলে জোর করে নিয়ে এসেছে তাকে।

নীপা অবাক চোখে টেবিলের উল্টো দিকে বসা ভাবিদের দেখে। সবাই নীপার চেয়ে বছর খানেকরে বড় হবেন। প্রত্যেকেই হিজাব ধরেছেন। হজটাও বোধহয় করা শেষ। এদের হাত পায়ে বেশ যত্নের ছাপ আছে। তবে প্রত্যেকেরই শরীরের ওজনটা বেড়ে যাওয়াতে বেশ একটা ভারিক্কিভাব চলে এসেছে চেহারায়। সে তুলনায় নীপা শুকনো পাতলা।ওকে বয়েসের তুলনায় ছোটই মনে হয়।

নীপার পাশে বসা শান্তা ভাবির পরনের জামাটা খুব সুন্দর, হলুদ রঙের জামায় নীল সাদা জংলি ফুল ছাপা। নীপা একবার ভাবে জিজ্ঞেস করবে, কোথা থেকে কিনেছেন?  কিন্তু জিজ্ঞেস করতে অস্বস্তি হয়, কারণ ও তো জামাটা কিনবে না, কিনতে পারবেও না, শুধু শুধু জিজ্ঞেস করে কী লাভ!

খাওয়া শেষ, বিল দিয়েছে রেস্টুরেন্টের বয়টা। সবার মধ্যে হুড়োহুড়ি কে বিল দেবে। নীপা ওর হাতে রাখা ছোট পার্সটা মুঠোয় চেপে শক্ত করে ধরে রাখে। ওর পার্সে দুটো দশটাকার নোট আর একটা পাঁচ টাকার কয়েন ছাড়া কিছুই নেই। এ দিয়ে এই রেস্টুরেন্টের বয়ের টিপস্ও হবে না।

রোজী ভাবি সবাইকে আটকে বিলটা দিয়ে দিলেন। এরপর বেশ শুনিয়েই বলেন, ‘আজ আপনারা আমার গেস্ট, এরপরেরবার আমাদের খাওয়াবে নীপা।’ নীপার মুখটা একটু কালো হয়ে যায়, তবুও কাউকে তেমন বুঝতে না দিয়ে মুখে হাসি টেনে বলে, ‘নিশ্চয়ই ভাবি, এরপর আমিই.. .।’

এরা বোধহয় এখানে আরও কিছুক্ষণ বসে গল্পগুজব করবেন। নীপার ভালো লাগে না। মনটা খারাপ লাগতে শুরু করেছে। ও উঠে দাঁড়ায়। পাশে বসা শান্তা ভাবি খুব আগ্রহ নিয়ে বলেন, ‘চললে কোথায়? আরেকটু বসো।’ নীপা হাসিমুখেই বলে, ‘না ভাবি। আমার একটু কাজ আছে।’

নীপা আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে আসে রেস্টুরেন্ট থেকে। ও রেস্টুরেন্টের গেটে আসতেই কারো কোন কথায় সব ভাবিরা একসেঙ্গ হেসে উঠেন। নীপা হাসিটা শুনতে পায় তবে, পেছনে ফিরে তাকায় না। রাস্তায় নেমে নীপা হাঁটতে থাকে। ওর বাসায় ফিরতেও ইচ্ছে করছে না। ভিড় রাস্তায় একা হাঁটতেও ওর তেমন খারাপ লাগে না। শুধু গলার কাছটা যেনো কেমন করে।

উপরে