NarayanganjToday

শিরোনাম

লাল-নীল সংসার-১৩

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার-১৩

তিন তিনটা কিভাবে যেন দিন পেড়িয়ে গেল টেরই পেলনা জাহিদ। অনেক অস্থির হয়ে আছে সে কারণ, যে বন্ধুকে দিয়ে নিরুকে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে ছিল, সে বন্ধু এখনো ফেরেনি সেইসাথে তার ফোনও বন্ধ হয়ে আছে। এই কদিনে কিছুক্ষণ পরপরই জাহিদ তাকে ফোনে চেষ্টা করছে আর বন্ধ পাচ্ছে। অজানা আশংকাতে বুকটা কেঁপে উঠছে কেন যেন বারবার। কার জন্য সে অস্থির হচ্ছে, নিরু নাকি বন্ধুর জন্য ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল, কালও যদি বন্ধুর কোন খবর না পায় তবে কাল নিরুদের বাড়ি যাবে নিজেই। এটা ভাবার পর একটু অস্থিরতা কমে গেল তার। ভাবল একটা বিপদের হাত থেকে নিরুকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছে সে। মনে পড়ল দুলাভাই সেদিন বাসায় ফিরে নিরুকে না পেয়ে কি রকম হৈচৈ করেছিলেন। জাহিদ বলেছে সে বাসায় ফিরে এসে দরজা খোলা পেয়েছে, তাই বলতে পারবেনা কি হয়েছে কিংবা নিরু কোথায় গেছে। তবে এটাও বলেছে, নিরু অনেক অসুস্থ্য ছিল আর নিরুর সাথে দুলাভাই কি করেছে তা সে জানে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আর ছাড়বে না দুলাভাইকে। তার আপাও আর কিছুতেই বাঁচাতে পারবেনা এবার। আপা ফিরে আসা মাত্রই জাহিদ সব জানাবে এবং এবার সবার সামনেই দুলাভাইয়ের আসল চরিত্র উন্মোচন করে দিয়ে তারপর একেবারেই আপাকে নিয়ে যাবে। তারপর থেকেই দুলাভাই চুপচাপ আছে।

এভাবে শেষ হল আরেকটি রাত, কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ঘুম হয়েছে জাহিদের। সকালে ঘুম ভাঙতেই মাথা ভার লাগল খুব। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা টেনে নিতেই বেজে উঠল তা, তাকিয়ে দেখল আপার ফোন। আজ বাসায় ফিরছে তার বোন তাই একটু বাজার করে রাখতে বলল। ফোন কেটেই ফোন দিল বন্ধুকে, এখনও ফোন বন্ধ। মনে পড়ল নিরুর বাড়িতে যেতে হবে খবর নিতে। অতঃপর তাড়াতাড়ি সব কাজ সেরে, বাজার করে, খেয়েই রওনা দিল জাহিদ। বাসে যেতে যেতে ভাবতে লাগল কেন সে নিরুর গ্রামে যাচ্ছে? মেয়েটা বাড়িতে পৌঁছালে তার কি কিংবা না পৌঁছালেই বা তার কি। এই মেয়েটির সাথে তার কোনদিন কথাও হয়নি সেদিনের আগে। কখনো মেয়েটির মুখের দিকে ভাল করে তাকায়নি পর্যন্ত। জাহিদের মনে হল কোথায় যেন তার আর নিরুর মাঝে মিল আছে। সেজন্যই হয়ত নিরুর জন্য তার খারাপ লাগছে, ভাবনা হচ্ছে। ভাবতে ভাবতেই পৌঁছে গেল নিরুদের গ্রামে। 

গ্রামে ঢুকেই চিন্তা করল কৌশলে কারও কাছ থেকে খবর নিতে হবে। যদি নিরু না এসে থাকে তবে সরাসরি গিয়ে জানতে চাইলে তাতে হয়ত ব্যাপারটা ভাল নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে অন্যরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে সামনে একটা ভ্যান খালি পেয়ে তাতে উঠে বসল জাহিদ। চালক জানতে চাইল কোথায় যাবে? জাহিদ বলল, কোথাও যাবেনা। সে সাংবাদিক, কিছু খোঁজখবর নিতে এসেছে গ্রামের মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপার আর তারা শহরে কাজ করতে যায় কিনা তা নিয়ে পেপারে লিখতে। চালক খুশি হয়ে গেল। বলল যা জানতে চায় সব গ্রামের বাজারে গেলেই জানতে পারবে সে। আর নিজেই বলতে লাগল, “এই গ্রামে একটাই হাইস্কুল আছে, তাতে ছেলে-মেয়েদের আলাদা ক্লাস হয়, মেয়েদের সকালে আর ছেলেদের দুপুরে। মেয়েরা বেশিরভাগ সময়ই পড়া শেষ করতে পারেনা, ভাল ঘর পেলে বিয়ে দিয়ে দেয় তাদের পরিবার”। জাহিদের এসব কথা ভাল লাগছিলনা। তাই সে একটু ঘুরিয়ে জানতে চাইল, “এই গ্রামের মেয়েদের কি শহরে কাজ করতে পাঠানো হয়? যেমন কারও বাসায় কিংবা গার্মেন্টসে কাজ করতে”? চালক অমায়িক হাসি দিয়ে বলল, “কি যে বলেন স্যার, আমরা পরের বাসায় কেন নিজেদের মেয়েদের পাঠাব? আমাদের গ্রামের মেয়েরা শহরে যায়না কাজ করতে”। তারপর হঠাৎ যেন মনে পড়ল এমনি ভাবে বলে উঠল, “ মনে পড়ছে স্যার, আমাদের খালেক ভাইজানের সংসারে টানাটানি পরাতে তার মেয়েকে তার ভাইরে দিয়ে দিছে পড়ালেখা করাতে ঢাকায়, সেটা কিন্তু কাজ করতে না”। বুঝল জাহিদ যা চাচ্ছিল এটাই সেই খবর। তাই সে প্রশ্ন করল আবার, “উনার মেয়ে আসেনা বাড়িতে”? চালক বলল, “ না, খালেক ভাই কালই তো বলল ঈদে আসবে বাড়িতে, এখন আসতে পারবেনা”। বাজার চলে আসাতে চালক তাকে বাজারে নামিয়ে দিয়ে হোটেল দেখিয়ে দিয়ে বলল, “ ঐ হোটেলে যান ভাইজান, সব খবর পাবেন”।

তখন অবশ্য আর অন্য কোন খবরের দরকার নাই জাহিদের, যা জানার জেনে গেছে সে, তবুও নিশ্চিত হতে হোটেলে গিয়ে ঢুকল সে। বেশ ক্ষিদেও পেয়েছিল জাহিদের, তাই হোটেলে ঢুকেই চা নাস্তার জন্য বলে ভিড় দেখে এই টেবিলের পাশে গিয়ে বসল সে। তারপর যেভাবে ভ্যান চালকের সাথে কথা শুরু করেছিল সেভাবেই হোটেলেও কথা শুরু করল। তার মনে হল গ্রামের মানুষগুলি বড় বেশি অমায়িক, অল্পতেই সব কথা বলে ফেলে। যদিও নতুন কোন তথ্য আর পেলনা জাহিদ, তাই ধরেই নিল নিরু বাড়িতে ফেরেনি। মাথাটা আবার ধরে গেল তার। কোথায় গেলো মেয়েটা? তার বন্ধুর ফোন ও ক্রামাগত বন্ধ। কিছুই আর ভাবতে পারছেনা যেন! ফেরার জন্য রওনা হল সে। সারাটা পথে কেবল আজেবাজে চিন্তা মাথায় ঘুরল। একবার মনে হল কোন না কোন বিপদ হয়েছে, আবার মনে হল কোথাও এক্সিডেন্ট করেছে তারপর হয়তো ..., কিংবা তার বন্ধুই কি কোন ক্ষতি করল নিরুর? উফ আর কিছুই ভাবতে পারছেনা জাহিদ।

ফিরেই সে চলে গেলো ভার্সিটিতে। যদিও সন্ধ্যে হয় হয় প্রায়, জাহিদের উদ্দেশ্য ছিল যদি কোন খবর পাওয়া যায় তার সেই বন্ধুর।

উপরে