NarayanganjToday

শিরোনাম

আমি এবং তিন টোকাই

আসিফ হোসাইন


আমি এবং তিন টোকাই

রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। ঢাকা ক্লাব যাবো। গ্যাম্বলিং খেলবো, মদ খাবো। পকেটে টাকা নেই কিন্তু এটিএম কার্ড আছে। হাজার পঞ্চাশের মতো টাকা হবে। সব খরচ করে ফেলবো। যা ইচ্ছে তাই করবো।

রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি। তপ্ত রোদে, পিচ ডালা রাস্তার যান্ত্রিক শহরে একটা গাড়ি না হলে চলে না। ইচ্ছে করছে হেটেই চলে যেতে। কিন্তু হাটতে আমার কাছে বিচ্ছিরি লাগে। অবশেষে পেয়ে গেলাম রিক্সা। চালক বৃদ্ধ। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা যাবেন?’

‘কই যাইবেন?’

‘ঢাকা ক্লাব।’

‘যামু। কিন্তু বিশ টাকা দিতে হইবো।’

বুড়োর উপর প্রচন্ড মেজাজ গরম হলো। নিজের শরীরের দিকে একবার চোখ বুলালাম। সিল্কের পাঞ্জাবি, দামী জিন্স এমনকি স্লিপারটাও দামী। আমাকে দেখতে তো অবশ্যই ফকির লাগছে না। একটু ধমকের সুরে বললাম, ‘ওই বুড়ো, আমাকে কি তোর কাছে ফকির মনে হয়?’

‘আমি যামু না।’

‘কেন যাবেন না। ২০ টাকাই দিবো। চলেন।’

‘আপনি বিশ হাজার টাকা দিলেও যামু না।’

ভাল মসিবতে পড়লাম। বুড়োর দিকে একবার তাকিয়ে রিকশায় উঠে বসলাম- ‘তুই নিবি না, তোর ঘাড় নিবে।’

‘কইছি না যামু না।’

‘না গেলে নাই। এই যে বসলাম।’ -ভেবেছিলাম নিয়ে যাবে। কিন্তু বুড়ো হলো নাছোড়বান্দা। এই রোদের মধ্যে রিকশা দাঁড় করিয়েই রাখলো। এই রাস্তা দিয়ে আমার মামা, চাচা, খালা, ফুপি সবাই চলাচল করে। যদি দেখে ফেলে তাহলে বুড়োর সাথে হেরে যাবো।

যা চিন্তা করলাম তাই হলো। খালা দেখে ফেলেছে। গাড়ি থেকে নেমে রিক্সার সামনে এসে দাড়ালো- ‘কিরে এই রোদের মধ্যে রিক্সায় বসে আছিস কেন?’ মাথা নিচু করে আছি। কি বলবো বুঝতে পারছি না। রিক্সাওয়ালা জবাব দিল- ‘দেখেন না আফা, একশোবার কইলাম, যামু না তবুও বসে আছে।’ খালা আমার দিকে তাকিয়ে বললো- ‘এই নাম তুই। দেখ আমি নতুন গাড়ি কিনেছি। প্রিমিও জি সুপার। চৌত্রিশ লাখ টাকা দাম। তোকে তো এর আগে কতবার ফোন করে বললাম, বেকার থাকিস আমার গাড়িটা চালা।’

রিকশা থেকে নেমে পড়লাম। বুড়ো রিক্সা নিয়ে চলে গেল। এমনি রাগ হচ্ছে প্রচুর। তার উপর যাওয়ার সময় বলে গেল- ‘শালায় এই পাগল ছাগল কইতে যে আহে।’

বুড়োর থেকে বেশি রাগ হচ্ছে খালার উপর। খালা আমার দিকে তাকিয়ে বললো- ‘কোথায় যাবি?’

‘না যাবো না কোথাও।’

‘আচ্ছা এই নে গাড়ির চাবি। আমি রিক্সা করে চলে যাচ্ছি। রাত দশটার আগে গাড়ি জমা দিলেই হবে।’ চাবি দিয়ে চলে গেল খালা। এখন ভালই লাগছে। এই খালাকে দেখতে পারি না দুইটা কারনে, প্রথমত বড়লোক আর দ্বিতীয়ত দশটার সময় গাড়ি জমা দিতে বলেছে কারন উনি নাইট ক্লাবে যাবে।

গাড়ির সামনে যেয়ে ভাল করে গাড়িটাকে দেখলাম। লেটেস্ট মডেল। গাঢ় খয়েরী কালার। ড্রাইভিং সিটে বসে এসি টা পুড়ো বাড়িয়ে দিলাম। নাহ ঢাকা ক্লাবে যাবো না। গাড়ি নিয়ে ঘুরবো। আজকে টঙ্গী বাস্তুহারা যাবো। বস্তি এড়িয়া। তিনটা ছেলের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক। তিনজনই টোকাই। ওদের সাথে পরিচয়টাও খুব মজার।

একদিন দেখি রাস্তার পাশে ষাট, সত্তর জনের মতো মানুষ গোল হয়ে দাড়িয়ে আছে। কৌতুহল নিয়ে আমিও গেলাম। যেয়ে দেখি ওদের তিনজনকে বেঁধে রেখেছে। আর একজন ইচ্ছে রকমে পিটাচ্ছে। কেন যানি ওদের দেখে মায়া হলো। দেখতে তিনজনই কালো। কিন্তু এই কালো, ময়লা জামাকাপড় পড়া ছেলেগুলোর চেহারার মধ্যেও খুব মায়া মায়া একটা ভাব আছে। যখন ওরা অসহায় বোধ করে তখন ওদের চেহারাটা আরো মায়াবী দেখায়। পৃথিবীতে ‘মায়া’ জিনিসটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। পৃথিবীটা টিকে আছে এই মায়ার কারনে। এই মায়ার বাইরে যারা জীবন অতিবাহিত করে তারাই একমাত্র উন্নত করতে পারে জীবনে। যেমন আমার বাবা।

যে লোকটা পিটাচ্ছে তার থেকে লাঠিটা নিয়ে নিলাম। জিজ্ঞেস করলাম- ‘পিটাচ্ছেন কেন?’

‘আমার দোকান থেকা রড চুরি করছে।’

‘এ জন্য পিটাবেন?’

‘তা না হলে কি করমু?’

‘যদি চুরির শাস্তি হয় পিটানো। তাহলে আগে আপনার আসনের এমপি কে গিয়ে পিটান।’ -সব লোক আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। সবার সামনেই, ওদের হাতের রশির বাঁধনটা খুলে দিলাম। সবার সামনে থেকে ওদের হাত ধরে নিয়ে চলে আসলাম। এরপর থেকেই ওদের সাথে পরিচয়।

গাড়ি নিয়ে সরাসরি বাস্তুহারা চলে এলাম। ওরা যেই কারখানায় বোতল, ভাঙা টিন, রড, ভাঙা প্লাস্টিক জমা দেয় সেই কারখানায় চলে গেলাম। কারখানার মালিকের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে ওরা যে এড়িয়ায় কাজ করে সেখানে চলে গেলাম। দূর থেকেই দেখতে পেলাম, ওরা তিনজন একটা নর্দমায় নেমে মহামূল্যবান বোতল, ভাঙা প্লাস্টিক খুঁজছে। ওদের হাতে যদি একটা বড় ব্যাগ না থাকতো তাহলে সবাই মনে করতো এখানে ওরা ডায়মন্ড খুজছে। ওদের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামলাম। আমাকে দেখেই ঘর্মাক্ত চেহারার মধ্যেই ভালবাসার হাসি দিল। ব্যাগ ফেলেই দৌড়ে আসলো আমার কাছে- ‘আস্সালামুঅলাইকুম ভাইজান।’

তিনজনের চোখেমুখেই হাসি। আমিও হেসেই জিজ্ঞেস করলাম- ‘কিরে ভাল আছিস তোরা?’

‘জ্বি ভাইজান ভালা।’

‘চল তোদের নিয়ে এক জায়গায় যাবো।’ ওরা আমার গাড়ির দিকে তাকিয়ে বিষ্ময়ভরা চোখে বললো- ‘এই গাড়িটা কি আফনার?’

‘হুম। আপাতত আমার। চল তাড়াতাড়ি।’

পাশের পুকুরপাড় থেকে ভালভাবে হাত পা ধুয়ে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি বললাম- ‘গাড়িতে উঠ।’ ওরা তিনজনই আমার দিকে তাকিয়ে আছে- ‘ভাই আমাগো জামাকাপড় তো ময়লা।’ আমি একটু ধমকের সুরে বললাম- ‘উঠতে বলছি উঠ।’

ওদের নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। সামনে বসেছে বুলবুল আর পিছনে রতন ও সাব্বির। রতন আর সাব্বির খুব মনযোগ দিয়ে ভিডিও গান দেখছে। আর বুলবুল, যেদিক দিয়ে এসির ঠান্ডা বাতাসটা বের হয় সেদিকে হাত দিয়ে রাখছে। বুলবুল আমাকে জিজ্ঞেস করলো- ‘ভাইজান বাইরে তো রোইদ। কিন্তু এই ঠান্ডা বাতাস আহে কইত্তে?’

এই প্রশ্নের জবাব ভালভাবে দিলে বুলবুল বুঝবে না তাই ওকে বললাম- ‘এই গাড়িতে যাদু আছে। তুই যদি শীতের সময় এই গাড়িতে উঠিস তাহলে এই দিক দিয়ে গরম বাতাস আসবে। আর গরমের দিন ঠান্ডা বাতাস। বুঝছিস?’ বুলবুলের মাথা ঝাকুনি দেয়া দেখে বুঝলাম, যা বললাম সবটুকুই বিশ্বাস করেছে।

হঠাৎ ফোনে ভাইব্রেটের শব্দ। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলাম প্রীতি ফোন করেছে। বলিউডের প্রীতি জিনতার মতোই অনেকটা চেহারা। হাসলে গালে টোল পড়ে।

একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম- ‘আচ্ছা তোমার এই প্রীতি নামটা কে দিয়েছে?’ উত্তরে ও বলেছিল, ওর মা নাকি প্রীতি জিনতার খুব ভক্ত। আর ও যখন ওর মায়ের গর্ভে ছিল তখন নাকি ওর মা শুধু প্রীতি জিনতার ছবিই দেখতো। হয়তো এ জন্যই আল্লাহ ওর চেহারাটাও প্রীতির মতো বানিয়ে দিয়েছে।

চিন্তা করছি ফোন ধরবো কি না। রিসিভ করলেই দেখা করতে বলবে। আগেপরে খুব কম রিসিভ করি প্রীতির ফোন। আজকে কেন যানি ইচ্ছে হলো রিসিভ করার জন্য। তবুও দশবার ফোন দেয়ার পর রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো- ‘কেমন আছো?’

‘গাড়ি চালাচ্ছি।’

"আমি জিজ্ঞেস করেছি কেমন আছো?"

‘ভাল না থাকলে তো আর গাড়ি চালাতাম না। তাই না?’

‘আচ্ছা তুমি কি আমাকে কখনো বুঝবে না?’

‘একজন মানুষ অন্য একটা মানুষকে কখনোই বুঝতে পারে না। এর বাইরে তুমিও নও।’

‘কোথায় আছো?’

‘উত্তরা।’

‘আজকে আমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হবে?’

‘কোথায় যাবে?’

‘যেখানে নিয়ে যাও।’.

‘চলো আজকে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে সাঁতার কাটি।’

‘ছিঃ তুমি কি পাগল। ওইটা কি নদী নাকি বাংলাদেশের সবথেকে বড় ড্রেন?’

‘মানুষতো সবসময় সুইমিং পুল, পুকুর, নদী এগুলোতেই সাঁতার কাটে। তুমি আর আমি আজকে ড্রেনে সাঁতার কেটে রেকর্ড করবো।’

‘দেখো ফাজলামো করো না প্লীজ।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি রেডি হও আসছি।’ ফোন কেটে দিলাম। জানি এখন প্রীতি ওর রুমে ড্যান্স করছে খুশিতে। কিন্তু আমি যাবো না। সেজেগুজে বসে থাকবে। আমার জন্য অপেক্ষা করবে প্রায় দুইদিন।

বুলবুল, রতন আর সাব্বিরকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে নাক ছিটকাচ্ছে। এজন্যই আমি ওদের নিয়ে এসেছি। আমার বড়লোকের বাচ্চাদের নাক ছিটকানি দেখে ভাল লাগছে। একজোড়া কাপলের মুখোমুখি বসলাম ওদের তিনজনকে নিয়ে। আমি জানি এখন এই এই যুগল আমাকে নিয়ে কথা বলছে। বুলবুল বসেছে মেয়েটের পিছনে। হেলান দিলে মেয়েটার গায়ে বুলবুলের নোংড়া জামাটা লেগে থাকবে। বুলবুলকে ইশারা দিয়ে বললাম হেলান দিতে।

আমার কথামতো বুলবুল হেলান দিল। কাপলজোড়া খুব রোমান্টিক মুডে ছিল। বুলবুল হেলান দেয়ার পরের দৃশ্যটা দেখার মতো। মেয়েটা কষে হ্যান্ডসাম ছেলেটার গালে চড়- ‘এই রকম একটা রেস্টুরেন্টে তুমি আমাকে নিয়ে আসছো কেন?’ আমি হাসছি। প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে। প্রেমিক প্রেমিকাদের মধ্যে ঝগড়া দেখতে আমার বেশ লাগে।

খাওয়া ধাওয়া করে ওদের নিয়ে বের হলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায়। খালা বলেছে দশটার মধ্যে গাড়ি জমা দিতে। কিন্তু আমি আজকে গাড়ি জমা দিবো না। এদিকে প্রীতি ফোন দিয়েই যাচ্ছে। ফোনের সুইচটা অফ করে দিলাম। বুলবুল, সাব্বির আর রতনের মধ্যে সবথেকে বেশি মায়াবী বুলবুল। বুলবুলকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘বুলবুল, তোর মা বাবা নেই?’

‘আছে। কিন্তু মা'য় অন্য বেডার লগে সংসার করে।’

‘কেন? তোর বাবার সাথে সসংসার করে না কেন?’

‘আমার বাপের একটা পা নাই। ট্রেনের নিচে পইড়া পাও ডা কাইট্টা ফালায়।’

‘তুই কার কাছে থাকিস?’

‘বাপের লগে।’

‘তোর মা কোথায় থাকে জানিস?’

‘হ। আমাগো বস্তিতই থাকে।’

‘চল তোর মা'র কাছে যাবো।’

গাড়ি নিয়ে বুলবুলদের বস্তিতে গেলাম। বুলবুল, সাব্বির আর রতনকে বললাম- ‘তোরা সবাই বস্তির লোকদের বলবি, আমি পুলিশ।’

বুলবুলের সাথে ওর মায়ের কাছে গেলাম। বুলবুলকে দেখে ওর মায়ের কোন উৎসাহ দেখলাম না। শালায় গরীব মানুষও বড়লোকদের মতো জানোয়ার হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। বুলবুলের মা'কে ভয় দেখাতে হবে। কঠিন ভয়। সামনে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ‘আপনার স্বামীর নাম কি?’

বুলবুলের মায়ের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বুঝলাম ভয় পেয়েছে। মনে মনে সেই মজা পাচ্ছি। আরেকটু ভয় দেখানোর জন্য বললাম- ‘আমি উত্তরা থানার পুলিশ সুপার। আপনার বর্তমান স্বামী গাঁজা বিক্রি করে। সাথে আপনিও জড়িত। আপনার স্বামী এখন জেলখানায়। আপনারও যেতে হবে আমার সাথে।’

মহিলা মারাত্মক রকমের ভড়কে যায়। কান্না শুরু করে দেয় পায়ে পড়ে। আমি কেন জানি একটা পৈচাশিক আনন্দ পাচ্ছি। একটু পুলিশি কন্ঠে বললাম- ‘আপনার আগের স্বামীর কাছে যদি আপনি ফিরে যান তাহলে সরকার থেকে ক্ষমা করা হবে আপনাকে। আর সরকার থেকে কিছু টাকাও পেতে পারেন।’

মহিলার চোখমুখ দেখে বুঝলাম, কথায় কাজ হয়েছে। বুলবুলকে ইশারা দিলাম ওর মা'কে যেন নিয়ে যায়। বুলবুল ওর মায়ের হাত ধরে বললো- ‘মা চলো।’ বুলবুলের মা ভদ্র মহিলার মতো বুলবুলের সাথে চলে গেল।

বুলবুলকে ইশারা দিয়ে বললাম- ‘তোর মা'কে রেখে তাড়াতাড়ি আয়।’ বুলবুল ওর মা'কে রেখে চলে আসলো। জিজ্ঞেস করলাম- ‘তোর মায়ের সাথে এতদিন সংসার করলো যে লোকটা উনি কোথায়?’ বুলবুল বললো- ‘ওই বেডা ভালা না। চোখে সব দেখে তবুও চশমা লাগাইয়া যায়গায় যায়গায় ভিক্ষা করে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন উনাকে কোথায় পাওয়া যাবে?’ বুলবুলের আগে সাব্বির বলে ফেললো- ‘ভাই ওভারব্রীজে পাইতে পারেন।’

গাড়ি ঘুড়িয়ে ওভারব্রীজের দিকে ছুটলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, যদি পেয়ে যাই তাহলে আরেকটা মজার দৃশ্য দেখতে পাবো। ওভারব্রীজের উপরে উঠার পরেই বুলবুল বললো- ‘ভাইজান ওইযে ওই বেডায়।’

লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনি ভিক্ষা করছে- ‘আমার আল্লাহ নবীজির নাম, দুইটা টাকা দিয়া যান, আখিরাতে সোওয়াব পাইবেন পাহাড়ও সমান।’

আমি সরাসরি লোকটির চোখ থেকে কালো চশমাটা খুলে ফেললাম। ‘আমি সিআইডি অফিসার। চোখে দেখার পরেও যারা অন্ধের অভিনয় করে তাদের সরকারের নতুন নিয়মে রিমান্ডে নিয়ে চোখ তুলে ফেলা হয়।’

লোকটিরও বুলবুলের মায়ের মতো একই অবস্থা। পায়ে পড়ে জোড়ে জোড়ে চিৎকার করে কান্না করছে- ‘স্যারগো আমারে মাফ কইরা দেন।’

ভিতরে ভিতরে পৈচাশিক মজা পাচ্ছি। একটু গলাটা ভার করে বললাম- তোমার নামে আরেকটা ওয়ারেন্ট আছে। তুমি নাকি এক পঙ্গু লোকের বউ বিয়ে করেছো? তুমি কি জানো এই জন্য তোমার দশ বছরের জেল হতে পারে। পুলিশ তোমাকে খুঁজছে। আমি না হয় তোমাকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু পুলিশ কিন্তু তোমাকে ছাড়বে না।’

লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ঢোক গিলছে বারবার। আমি আবার বললাম- ‘তোমাকে আমি সাহায্য করতে পারি। তুমি যদি চাও।’

‘কি সাহায্য স্যার?’

‘তোমার বউকে আজকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তোমাকেও ওরা ছাড়বে না। তুমি যদি চাও তোমাকে আমি অন্য জেলায় পাঠিয়ে দিতে পারি।’

‘স্যার আমি যামু।’

লোকটিকে গাড়িতে করে কমলাপুর রেলস্টেশনে গেলাম। রাজশাহীর টিকেট কিনে লোকটিকে ট্রেনে উঠিয়ে দিলাম। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর বুলবুল, সাব্বির, রতন আর আমার হাসি দেখে সবাই তাকিয়ে আছে। চারজনই ইচ্ছেরকমে হাসলাম।

গাড়িতে করে ওদের বস্তিতে নামিয়ে দিয়ে আসলাম। তিনজনকেই একহাজার টাকা করে হাতে ধরিয়ে দিলাম। বুলবুল, সাব্বির আর রতন আমার পা জড়িয়ে বললো- ‘ভাইজান আবার কিন্তু আইবেন?’

আমি বললাম- ‘হ্যাঁ অবশ্যই আসবো। পরের বার যদি আসি তাহলে তোদের আর টোকাই থাকতে হবে না। স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো? তোরা পড়বি না?’

‘হ ভাই পড়মু। কিন্তু বাপ মায় যদি না দেয় পড়তে?’

‘এটা আমি মেনেজ করবো। ঠিক আছে ভাল থাকিস।’ -গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পড়লাম ঢাকার রাস্তায়।

উপরে