NarayanganjToday

শিরোনাম

নতুন বউ

তাসলিমা শাম্মি


নতুন বউ

সেদিন সকাল সকাল মা'র ফোন। আমি বিরক্ত হয়ে রিসিভ করি। বিরক্ত হবার কারণ সকালের ঘুম আমার অসম্ভব রকমের পছন্দ। মা ফোনের ওপাশ থেকে ফিচফিচ করে কাঁদছে আর বলছে, 'মুনা এক্ষণ বাসায় আয়, এক্ষণ মানে এক্ষণ'।

মা'র এই ধরনের কান্নার সাথে অবশ্য আমার ভালমতন পরিচয় আছে। এই কান্না হচ্ছে আহ্লাদী কান্না। আমি ঘুম ঘুম গলায় মা'কে বল্লাম, ‘আমি ঘুমটা শেষ করে আসি? যেন এই লেখাটা শেষ করে আসি টাইপ! মা এবার তার পুরানা সিনেমাটিক ডায়লগ বলে উঠে, 'আমি মরে গেলে আসিস’ বলেই ফোনটা কেটে দিল। ঘুমের মায়া ত্যাগ করে রেডি হলাম। হাজার হলেও একটা মাত্র মা আমার!

আমাদের বসারঘরে আদালত বসেছে। বিরাট পারিবারিক আদালত। আদালতে উপস্থিত প্রধান বিচারকের আসনে আমাদের একমাত্র বড় খালা এবং মা'র প্রধান উপদেষ্টা মাজেদা খালা। বড়খালু, আমার একমাত্র ছোট বোন নীতি এবং ওর জামাই শান্তনু হচ্ছে মেম্বার অব কোর্ট রুম। শুনানি সম্ভবত আমার জন্যই দেরী হচ্ছিল। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দশ কেজি ওজনের একটা ধমক খেলাম। দেরী করার জন্য না, আমি ধমক খেলাম চোখ কেন ফোলা ফোলা, দিনদুপুর অবদি ভোঁস ভোঁস করে কেমনে ঘুমাই সেই অপরাধে।

যাই হোক, বিচারে আসি এবার। বিচারটা বসেছে আমাদের একমাত্র অপদার্থ ভাই রঞ্জুকে নিয়ে। রঞ্জু আমাদের দুই বোনের পর একমাত্র ভাই। পরিবারের একমাত্র ছেলে। মহা অপদার্থ রঞ্জু বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে আজ সকাল সকাল। অবশেষে বিচার কাজ শুরু হল। ঘটনা ভিক্টিমের মুখ থেকে প্রথমে শোনা হবে তারপর ক্রিমিনালরা বলার সুযোগ পাবে। এখানে ভিক্টিম আমার মা আর ক্রিমিনালরা হচ্ছে আমার মা'র মহা অপদার্থ পুত্রধন রঞ্জু আর তার সদ্য বিবাহিত বউ প্রীতি।

প্রধান বিচারক মাজেদা খালা একটা সিঙ্গেল সোফায় দুই হাতায় দুই হাত ছড়িয়ে বসল। খালু আর শান্তনু লম্বা সোফায় আর মাকে অন্য সিঙ্গেল সোফাটাতে বসানো হল। ডাইনিং রুম থেকে দুটো চেয়ার এনে আমি আর নীতি বসলাম আর ক্রিমিনাল দুইটাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হল। মূল ক্রিমিনাল রঞ্জুর চেহেরার মধ্যে কোনধরনের ভয় ডর দেখতে পাচ্ছি না।

অপদার্থটা হে হে করে হাসছে। দরজা খুলেই দাঁতের পাটি দেখিয়ে আমাকে বলে, 'বড়পা, টুনটুনিকে আনিস নি?’ আমি রাগ দেখিয়ে বল্লাম, ‘সামনে থেকে সর, যা! এই রোদে ওকে বের করি নাই।’ বেহায়াটা আবার বলে, 'আমি এক দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসি?’ আমি আবারো রাগ দেখিয়ে বল্লাম, ‘কেন তোদের বাসায় কি পার্টি হচ্ছে?’

বেহায়াটা হে হে করে হেসে আবার মাকড়সার মত পেঁচিয়ে ধরে। এত বকাঝকা কিছুই গায়ে মাখে না। ধুর! এই বান্দরটার সাথে রাগও করা যায় না। প্রীতিও দেখছি মিটি মিটি হাসছে, এঘর থেকে ওঘর ছুটাছুটি করছে। রান্নাঘরে মনেহয় হালুয়া জাতীয় কিছু রান্না হচ্ছে, খাঁটি ঘিয়ের ঘ্রাণ আসছে। আমি নীতিকে ফিসফিস করে বল্লাম, ‘মেয়েটা প্রিটি আছে তাইনা?’

নীতি কুনুই এর গুঁতো দিয়ে আমাকে বল্ল, ‘প্রীটি না প্রীতি ওর নাম। টাইট দিতে হবে বড়পা বুঝলি! প্রথমদিন থেকেই লাই দিলে একেবারে আমার ভাইরে কেঁচো বানায় রাখবে।’ আমি কোনমতে হাসি চেপে রেখে বল্লাম, ‘আহারে শান্তনুকে কিছু খেতে দিলিনা? খিদায় বেচারা কেঁচোর মত হয়ে আছে।’

অবশেষে আম্মাজান তার বয়ান শুরু করল, “টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাত বাজে সাড়ে বারটা, হেলেনা বাথরুমে যাবার জন্য উঠে দেখে আমি তখনো বসে আছি। হেলেনা বলে, 'নানী আপনে ওষুধ খান নাযই? ঘুমাননা কেন?’ আমি বল্লাম, ‘রঞ্জুতো আসল না এখনো।’ হেলেনা আবার বলে, 'আপনে ঘুমায় থাকেন। মামু আসলে আমি দরজা খুলে দিমুনে, আপনি ঘুমাতে যান।’ আমি ঘুমাইলাম রাত দুটার দিকে। ও মা! ছেলে সকাল আটটায় দিকে দেখি বউ নিয়ে হাজির! আজকে তোর বাপ থাকলে ... " বলে মা ফিচ ফিচ করে কান্না শুরু করল (এইটা মা র সেকেন্ড সিনেমাটিক পুরানা ডায়লগ)।

রঞ্জু এই সময়টাতে শরবত নিয়ে আসল আর পিছন পিছন প্রীতি ট্রেতে হালুয়া আর সমুচা নিয়ে। হালুয়ার ঘ্রাণটা ভাল আসছে। মনেহচ্ছে স্বাদটাও ভাল হবে। নীতি এক চামচ মুখে দিয়ে চোখ কুঁচকে মিষ্টি ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করল। শান্তনু খালুকে বল্ল, ‘মজা হইছে খালু, অল্প একটু হলেও খান।’ সাথে সাথে নীতি শান্তনুকে ধমক দিল 'তুমি চুপ কর! খালুর ডায়বেটিস।’

ধমক খেয়ে বেচারা শান্তনু কেঁচোর মত চুপ হয়ে গেল! মাজেদা খালা হালুয়ার চামচ নাড়িয়ে খালুকে সমুচা খাওযার নির্দেশ দিলেন। খালু চুপচাপ লক্ষ্মী ছেলের মত কুচমুচ করে সমুচা চিবুতে লাগল। মাজেদা খালা হালুয়া মুখে দিয়ে চামচ নেড়ে নেড়ে লেকচারের মতন করে মা কে বলল, ‘শাহেদা শোন, ছেলে বিয়ে যখন করে ফেলছে আর কিছু করার নাই। এখন ছেলের বউকে এই হালুয়ার মতন তোর সংসারের এর সাথে ঘুঁটা দিতে হবে। ঘি এর সাথে অল্প তাপে ঘুঁটে ঘুঁটে অল্প অল্প চিনি মানে ভালবাসা মিশাবি বুঝলি? তোর কপাল ভাল হইলে হালুয়া মজা হইতে বাধ্য। আর যদি কপাল খারাপ হয় বাদ দে। ইয়া নফসি, ইয়া নফসি।’

এই পর্যায়ে আমি হাই তুলতে তুলতে খালাকে বল্লাম, ‘খালা তেজপাতা, এলাচ এর কথাতো বল্লেন না! আর হালুয়াতে একটু রং দিলে মনেহয় দেখতে ভাল লাগে, তাই না?’

খালা প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বল্ল, ‘রং, রূপ, সুগন্ধি সংসারে কুনু কামের না, বুঝলা? এখনোতো ঘুমায়ে ঘুমায়ে সংসার করতাছ। বুঝবা কেমনে? সংসারে মেয়েদের হইতে হয় চিনির সিরার মতন। সবাইরে মিঠা করব আর নিজে খাইব পিপড়ার কামড়!’

মরার হাই কোনমতেই দমাতে পারলাম না আমি। আবারো হাই তুলতে তুলতে আমি খালাকে বল্লাম, ‘কিন্তু খালুর মতন কারো কারো তো আবার ডায়বেটিস থাকে তখন আবার হালুয়া মিষ্টি হইলেও লাভ নাই!’

এইবার মাজেদা খালা কড়া চোখ সরু করে আমাকে বিশ কেজি ওজনের ধমক দিয়ে বল্ল, ‘এই ছেমরি এই, সারাদিন হাই তুলস কেমনে? রাইতে কি গাঞ্জা খাস? বাচ্চা মাইয়াটারে বুড়া শাশুড়ির কাছে রাইখা আইসা এইখানে বইসা আছস কেন? যা এবার ঘরে যা, তোর আর কুনু কাম নাই এইহানে।’

আমি ভাবলাম আর বেশী কথা বলা নিরাপদ হবে না মানসন্মানের জন্য। আসার সময় বারান্দার কোনায় প্রিটি মেয়েটাকে বলে আসতে ভুললাম না, ‘কাল সারারাত জেগে হালুয়া রান্না শিখানো সার্থক। হালুয়াতে মিষ্টি, ফ্লেভার আর রং ঠিকঠাক মত পড়েছে। তুমি ঠিকই অল্প অল্প চিনি দিয়ে দিয়ে অল্প তাপে ঘুঁটা দিয়েছ।’

দিন কয়েক পরে আবার সকাল সকাল আরামের ঘুম হারাম করে মা'র ফোন রিসিভ করতে হল। বিরক্ত মুখে ঘুম ঘুম গলায় মাকে বল্লাম, ‘কি হল এত সকালে? আবার কি রঞ্জু বউ নিয়া আসছে?’ মা আহ্লাদি রাগ দেখায় বল্ল, 'এই দুপুর অবদি ঘুমাতে হবে না, উঠ। তুই , নীতি আর বউ গিয়ে শাড়ি কিনবি আজ।’ আমি মাকে সুর করে বল্লাম, ‘মা শোন, বউরে লাই দিবানা। লাই দিলেই মাথায় উঠবে।’ মা আহ্লাদী ধমক দিয়ে বলে, ‘খবরদার কুটনামী করবিনা। মেয়েটা প্রিটি আছে।’

দশ মিনিট পর নীতির ফোন, ‘বড়পা, আমারটা কামরাঙ্গা সবুজ, তোরটা কলাপাতা সবুজ আর প্রীতির জন্য জলপাই সবুজ কাতান অর্ডার করছি।’ আমি বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে বল্লাম, ‘বউরে টাইট দিতে হবে বুঝলি, লাই দিবিনা লাই দিলেই সবাইরে কেচোঁ বানায় রাখবে।’

‘বড়পা কুটনামী করিসনাতো, মেয়েটা প্রিটি আছে। আর কেঁচো কি খারাপ জিনিস? মাটি উর্বর করে।’ বলেই নীতি ফোন রেখে দিল। আমার এখন কামরাঙ্গা আর জলপাই খেতে ইচ্ছে করছে। নীতি শুনলে আবার বলবে কলাপাতা খা কুটনি কোথাকার! আপাতত ফ্রিজ থেকে সেদিনের হালুয়া বের করেই খাই। হালুয়ার ঘুঁটাটা ভাল হয়েছিল।

উপরে