NarayanganjToday

শিরোনাম

শেকড়ের টানে

তুলতুল


শেকড়ের টানে

দুই দশকের ক্ষুধা কি আর দুই দিনে মেটে? বিগত দুটো দিন প্রতিটা নিশ্বাস অনুভব করে করে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। পা তুলে তুলে হাঁটিনি, খালি পায়ে পা ছিঁছড়ে হেঁটেছি, যাতে মাটির স্পর্শ পাই, শানের, রাস্তার, শ্যাওলার আরও কত কি।

স্ক্যান্ডেনেভিয়ান কান্ট্রি থেকে আসা হাভাতে ট্রাভেলারের মত চোখের সামনে ক্যামেরা ধরে রেখেছি। প্রতিটা সিনের স্ক্রিনশট নেয়ার মত করে শত শত ছবি তুলেছি৷ নদীর ছবি, রাস্তার ছবি, বাড়ির ছবি, বাড়ির চারপাশের গাছগাছালির ছবি, নোনা ধরা কলের পাড়ের ছবি, মাটির চুলার পাড়ের ছবি, শ্যাওলা পরা উঠানের ছবি।

যদি হলিক্রসের সিস্টার পলিনের মত ফটোগ্রাফিক মেমরি হত, যদি নাম না জানা কোন কারো মত শ্রুতিধর হতাম, যদি মরুভূমির ঊটের মত পেটের মাঝে টিউবয়েলের পানি জমিয়ে রাখার থলে থাকত, তাহলে বিগত এই দুই দিনের সমস্তটা নিজের মাঝে জমিয়ে রাখতাম, কারন আগামী দুই দশকে এমন দুই দিন আমার জীবনে আর আসবে কীনা জানি না।

এই যেমন গত এক দশকে মাত্র তিনবার বাড়ি গিয়েছি, এক দশকে দশ দিন তো নয়ই, তিন তিরিক্কি নয় দিনও থাকা হয়নি, থাকতে পারি নি বললে সে আরেক গল্প হয়ে যাবে, থাকিনি, অন্তত এই গল্পের খাতিরেই দায়টুকু আমার কাঁধেই থাকুক। অথচ, ওটাই কিন্তু আমার বাড়ি। বিলিয়ন বিলিয়ন স্কয়ার ফিটের পৃথিবীতে শুধু ঐ একটাই৷ আমার ভেতরে, বাহিরে, অন্তরে অন্তরে, কাগজে, কলমে, ফরমে, মুরাদপুরহাউস, বাঙ্গাবাড়িয়া, নওগাঁ।

ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া করতে আমার খুব কষ্ট হত। ওয়ানে নওগাঁ সরকারী গার্লস স্কুলে আমার রোল ছিলো চুরাশি। সে যুগে রোল জিজ্ঞাসা করার একটা সংস্কৃতি খুব প্রচলিত ছিলো। বাবু তোমার নাম কি? তুলতুল? গাল টিপে পরীক্ষা করে নেয়া চাই আসলেও তুলতুল কিনা! কে বেশি ভালোবাসে, বাবা নাকি মা? দুজনেই। তোমার তো খুব বুদ্ধি। রোল কত তোমার? চুরাশি, ভর্তি রোল। আমি বুঝতামও না ভর্তি রোল কি জিনিস, শুধু জানতাম, ভর্তি রোল হলে চুরাশি সংখ্যাটা মেনে নেয়া যায়। মেধার অপমান হয় না।

প্রতি ক্লাসে আমার রোল আগাচ্ছিলো, কারন আমি ভালো রেজাল্ট করতে চাইতাম, আমার মাও তাই চাইতেন, বাসার পরিবেশটাও তেমন ছিলো, চাচাফুফুরা একেক জন স্টার, মামাতো খালাতো ভাইবোনরাও, এক আমাদের বাড়িতেই তখন কত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, মাস্টার, আর্মি অফিসার। যখন বড় একটা পরিবারে জন্ম হয়, তখন অনুপ্রেরণার জন্য বাড়ির বাইরে যেতেও হয় না, আমিও পড়তাম কিন্তু লেখাপড়াকে ভালোবাসতে পারতাম না, ভয় পেতাম, সব কিছু ধোঁয়া ধোঁয়া লাগত। পড়তাম, কিন্তু ততটুকু না যতটুকু পড়লে ধোঁয়া কেটে যায়।

বিকেল বেলা স্যাররা আসতেন, যখন যার কাছে পড়তে হয়েছে, কিন্তু কেউই সে ধোঁয়া কাটাতে পারেননি। স্যার আসার দুশ্চিন্তায় আমার বুক ধড়পড় করত। বিকেলবেলার এই ধড়পড়ে অনুভূতি এখনো আমার মাঝে রয়ে গেছে বলেই হয়তো, এখনো বিকেলগুলো ঘুমিয়ে পার করি, ধড়পড়ানো বিকেলের মুখোমুখি হতে চাই না। তখনো আমরা ঘুমাতাম, যাতে পড়তে না হয়, ঘুম না আসলে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম দুই ভাইবোন। আম্মা এত ডাকত, তখন বুঝতাম না, অতটা ডাকলে ততটা ঘুমানো যায় না আসলে, বড্ড অভার অ্যাক্টিং ছিলো। আমার ভাই মনে হয় না, ভীতু ছিলো কোনদিন, ও ছিলো প্রচন্ড মেধাবী, একই সাথে প্রচন্ড ফাঁকিবাজ। একদিন স্যারের কাছে পড়ায় ফাঁকি দিতে কাঠের সোফার নিচে লুকিয়ে থাকল, যেহেতু ওর বুক ধড়পড় করে না, সুতরাং ওখানে আরামে ঘুমিয়ে গেলো। সেদিন সমস্ত পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজে ১০৮ টি নীল পদ্ম আনা গেলেও ভাইকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না, অথচ কে না জানে বাত্তির নিচেই অন্ধকার।

ভালো টিউশনের জন্য আম্মা যে আমাদের কত টিচার বদল করেছেন। যখন যার কাছে ভালো শিক্ষকের খোঁজ পেয়েছেন, আম্মা তাঁকেই আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় আমাদেরকে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছেন আমার মামাতো ভাইদেরকেও। আগের স্যার কে বলেছেন, আমরা কোথায় যেন যাচ্ছি, ফিরে আসলে জানাবো। আমাদের যাওয়াই হয়নি কখনো, ফিরে আসব কি! বাংলাদেশ যদি চলে ইন্ডিয়ার ইশারায়, আম্মা চলেছেন মামাবাড়ির ইশারায়, বিশেষ করে লেখাপড়ার ব্যাপারে মেজো মামার উপর আম্মা একরকম অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। তাই আমাদের পড়ালেখা ঠিকঠাক চললেও মামার বাসায় শিক্ষকের বদল হলে আমাদেরও শিক্ষক বদল।

এই বদলের পরিক্রমায়, এক হাত থেকে আরেক হাতে যেতে যেতে ক্লাস ফাইভে গিয়ে পড়লাম মোজাম্মেল স্যারের কাছে। এরপর শুরু হলো আমার দিন বদলের গল্প। স্যার বাড়িতে গিয়ে পড়ান না, স্যারের বাড়িতেই যেতে হয়। ওটা ঠিক বাড়িও না, এক রকম উপাসনালয়। কত ছেলে মেয়ে সেখানে বই নিয়ে উপাসনা করতেছে দিনরাত, ধোঁয়া তাড়ানোর উপাসনা। সরকারী স্কুলে পড়তাম, ছাত্র হিসেবে স্কুলে যাওয়ার অত বাধ্যবাধকতা ছিলো না, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে স্যারেরতো স্কুলে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিলো। স্যারের অবর্তমানে সে সময় আমাদের তদারকি করতেন স্যারের চার ছেলে। তাই নির্দিষ্ট কোন ঘন্টা ছিলোনা পড়লেখার। অর্থের লেনদেন ছিলো, কিন্তু সেটা ব্যবসা ছিলো না। কত ছেলে স্যারের বাসাতেই থাকত, যাদের বাড়ি দূরে ছিলো, গ্রামে। আমার বাসা সে তুলনায় কাছেই ছিলো, শহরেই, আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্যারের বাসায় থাকতাম, বিসিপিএস বা পিজির লাইব্রেরির মত। খুব সকালে স্যারের বাসায় যেতাম, খেয়ে যেতে পারতাম না, বেলা হলে রূপকথার গল্পের ওবার মায়ের মত আমার আব্বা অফিস যাওয়ার পথে আমার সকালের খাবার দিয়ে যেতেন।

ধোঁয়া কেটে যেতে যেতে আমার চোখে জ্ঞানের আলো লাগা শুরু করল। কি যে চমক সেই আলোতে। লেখাপড়াকে ভালোবাসা শুরু করলাম। গভীর সে ভালোবাসা, দুর্নিবার সে আকর্ষণ। কি যে ভালো লাগত তখন পড়তে, শুধু পড়তে ইচ্ছা করত। এরপর দেখা যাবে, এই ভালোবাসাই কয়েক মাস পর আমাকে বাড়ি ছাড়া করবে।

সাল ১৯৯৯। আমার ফুপাতো ভাই, বড় ফুপুর ছোট ছেলে আমাদের বাসায় পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন নিয়ে এলেন। আম্মাকে বললেন, মামী আমি এই স্কুলটাতে শিক্ষকতা করতাম, খুব ভালো একটা স্কুল, আপনাদের তো সামর্থ্য আছে, আর তুলতুল তামিমও তো লেখাপড়ায় ভালো, ক্লাস সেভেনে অ্যাডমিশন হবে, আপনে তুলতুলকে একটু পরীক্ষা দেয়ান, ওর একটু অভিজ্ঞতা হবে।

আমি তখন পড়ি ক্লাস সিক্সে, কিন্তু আমি তো পরীক্ষা দিবো অভিজ্ঞতার জন্য, পরীক্ষা দিলেই যে চান্স পাব তাও তো না। সুতরাং, পরীক্ষা দিলাম, এবং এত বছর পর এখনো আমার অবাক লাগে যে, সেই পরীক্ষাটা দিয়েছিলাম৷ শুধু দেইনি চান্সও পেয়েছি।

রিটেন পরীক্ষার দিন স্কুল দেখেই আমি বিস্মিত, সেই স্কুলে ভাইভার ডাক পেয়ে আমি আরো বেশি বিস্মিত৷ ভাইভা বোর্ডে প্রবেশের আগে আমার ছোট চাচু মিঠু, তৎকালীন মেজর মাহফুজ আলম, বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার আমাকে শিখিয়ে দিলেন যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কেন আমি এই স্কুলে পড়তে চাই, তাহলে যেন আমি বলি, আমি আমার ভাই এর কাছ থেকে শুনেছি এটা খুবই ভালো স্কুল, তখন তাঁরা আমার ভাই এর কথা জিজ্ঞাসা করবেন, আর আমি সারওয়ার-ই আলমের বোন একথা শুনে খুব খুশি হবেন। সেটা আমার জীবনে শেখা প্রথম ডিপ্লোম্যাসি।

কমাস আগে আমার এক সিনিয়র ডাক্তার আপু খুব অবাক বিশ্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এক বছরের ভিসা আছে, তোমার জামাই এখনও অস্ট্রেলিয়া, তুমি কেন দেশে ফিরে আসছো। আপু হতভম্ব হয়ে বললেন, আল্লাহ তোমাকে বেহেস্ত দিছে তুলতুল, আর তুমি এই পোড়া দেশের জন্য কাঁদো। রাজউকে চান্স পেয়ে আমারো তখন তেমন একটা অবস্থা৷ মফস্বল থেকে আসছি, ঢাকা আসলে তখনো নাকে একটা ঢাকা ঢাকা গন্ধ লাগে, সেখানে এত্ত সুন্দর একটা স্কুল, টিচাররা একই রকম ইউনিফর্ম পরা, স্টুডেন্টরা কি স্মার্ট, লাংগুয়েজ ল্যাব, কম্পিউটার ল্যাব, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড আরও কত কি দেখে তো আমার চোখ কপালে, আদেখলা আমি তখন মনের হয় স্বপ্নের রাজ্যে ঢুকে গেছি। এরকম এক বিদ্যাপীঠে সুযোগ পেয়েও আমি পড়ব না, তাও কি মেনে নেয়া সম্ভব৷ আর পড়ালেখার প্রতি আমার ভালোবাসা তখন এমন পিকে আমি তো সুদূর চীন যেতে রাজি ছিলাম, আর এটা তো সামান্য ঢাকা।

আমার কাছে সামান্য হলেও আমার বাবার কাছে এটা মোটেও সামান্য ছিলো না। আব্বা তার ঐ অত অল্প বয়সী একমাত্র মেয়েকে এত দূরে হোস্টেলে রেখে পড়াতে এতটুকুও রাজি ছিলেন না। আমি এখনকার মত তখনও শুধু দুইটাই ভাষা জানতাম, দাঁত বের করে হাসি, আর চোখের পানি ঝরায়ে কান্না। আব্বাকে রাজি করানোর কাজটা করলেন চাচু, আমি শুধু পাশে বসে বসে কাঁদলাম, তাদের মধ্যে কি বিতর্ক হলো, সেটা আর বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না, যা হতে পারত তাই হলো, যা হতে পারত না তাও হলো। আব্বা বললেন, কিছু হলে তুই আমার মেয়ের দায়িত্ব নিবি? চাচ্চু বলতে পারতেন, আল্লাহ ভরসা। দায়িত্ব নেয়ার জন্য মহান আল্লাহ তো সদা সর্বদা প্রস্তুতই থাকেন, কখনো কোন দায় নিতে না করেন না। কিন্তু, চাচু বললেন, হ্যাঁ আমি দায়িত্ব নিবো। এরপর আব্বার আর কিছু বলার ছিলো না।

আব্বা রাজি হওয়ায় আমাকেও আর কান্না থামাতে হলো না । শুধু কারনটা বদলে নিলাম। একদিকে স্বপ্নকে ধাওয়া করার আনন্দ, আরেকদিকে বাড়ি ছাড়ার তীব্র বেদনা। কারনে অকারনে চোখে পানি আসে। আমার মেঝো চাচীমুণি খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন করলেন, তুমি সব গুছিয়ে নিয়েছো তুলতুল, তাতেও কিনা আমার চোখে রাজ্যের পানি চলে আসলো।

বাড়ির ছাড়ার স্মৃতি বলতে ঐ সময়টার কথাই মনে পড়ে, চাচুর সাথে ঢাকা আসার পথে সারা রাস্তা কেঁদেছি, আমার মা নওগাঁ বাস স্ট্যান্ডে আমাকে বিদায় দিয়েছেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন, সেই দৃশ্যই আমার মেয়ে জীবনের বিদায়ের দৃশ্য, বিয়ের দিনের দৃশ্য নয়, কারন আমি তো বিয়ের অনেক অনেক অনেক আগেই বাড়ি ছেড়েছি।

এরপর হোস্টেলে থাকলাম, হোম সিকনেসে তখন ডুবে থাকতাম, হলুদ খামে রোজ আম্মার চিঠি আসত, একদম রোজ। পরের বছরটা আমার মেঝো খালামুণির বাসায় থাকলাম। খালুজি বললেন, বাড়িতে পাঠানো চিঠিতে যেন লিখি, আমার সব কিছু ঠিক আছে কিন্তু তোমাদেরকে খুব মিস করি। এটা আমার জীবনে শেখা দ্বিতীয় ডিপ্লোম্যাসি। এরপর আব্বা আম্মা ঢাকায় চলে আসলেন, আব্বা ঢাকায় একটা উঁচু লম্বা বিল্ডিংও বানায়ে ফেললেন, সেই বাসাতেও কিছুদিন থাকা হলো, ম্যাট্রিক পাশের পর হলিক্রসে ভর্তি হলে আবার একটা নতুন এলাকায় থাকা হলো, সিলেট মেডিক্যালে ভর্তি হয়ে ঢাকা থেকেও দূরে চলে গেলাম, আর বাড়ি থেকে তো বহু বহু দূর। প্রেম করার অপরাধে থার্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতে বিয়ে হয়ে গেলো, উদ্বাস্তু থেকে বাস্তুহারা হলাম, বাড়ি ফেরার রাস্তা পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে গেলো, একটা সময় তিনটা ঠিকানায় যাতায়াত ছিলো,ভালো করে গুনলে পাঁচ, কিন্তু বাড়ি আর যাওয়া হত না। বিয়ের পর কুরবানী ঈদে বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি দুখানেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমরা কি কুরবানী দিচ্ছো, তখন কিংবা তার আগেপরে আমি বুঝতে পারলাম, কোন বাড়িতেই আমি আসলে বিলং করি না। হোস্টেলে বাচ্চা নিয়ে কখনো শরনার্থী শিবিরের মতও থেকেছি, জীবন যুদ্ধে নদীর পারের ঐ দোতলা বাড়ির কথা মনে করবারও আর অবসর পাইনি।

পাশ করার পর স্বামীর কর্মস্থলের পাশে নিজের একটা কর্মের ব্যবস্থা করে বা কখনো না করেও নোয়াখালী, কুমিল্লা, লাকসাম চষে বেড়িয়েছি, উত্তর বঙ্গের মেয়ে আমি দক্ষিণবঙ্গে মিশে গিয়েছি। এখন যখন যেখানে থাকি, আমার কতগুলা ছেড়া কাপড়, ভাঙা আসবাব নিয়ে দেয়াল ঘেরা যেই ছাদের নিচে থাকি, সেটাই আমার ঘর, সেটাই আমার সংসার।

আজ যখন দুই দশক পর, নওগাঁ গার্লস স্কুলের রি-ইউনিয়ন উপলক্ষে বাড়ি গেলাম, তখন মনে হলো, আমার দেয়ালের খসে পড়া চুন আমার সাথে কথা বলতেছে। বাসার ভেতরের সিঁড়িতে বসে কোন একাদশী মেয়ে কিংবা আরো ছোট, আমাকে ডাকতেছে,যেই মেয়েকে আম্মা যখন সকালে ঘুম থেকে উঠায়ে পেস্ট লাগায়ে একটা ব্রাশ ধরায়ে দিত, সে ব্রাশ নিয়ে ওখানে এক দফা ঝিমাতো, তারপর বকা দিলে কলের পাড়ে গিয়ে আরেক দফা ঝিমাতো, প্রায় রোজই স্কুলের ভ্যান মিস করত, পরে আম্মা রিক্সায় করে দুই ভাই বোনকে স্কুলে দিয়ে আসত। সিঁড়িতে গিয়ে যখন বসলাম, তখন মনে হলো, গাছের পাতার মাঝে বাতাস কেঁপে কেঁপে আমাকে গান শুনাচ্ছে, দুই দশক আগের সে গান।

ঢাকায় এত মানুষ, অর্ধেক মানুষ ঈদে বাড়ি গেলেও ঢাকা ফাঁকা হয় না। আর আমার আব্বারা বারো ভাইবোন, ঈদে অর্ধেক চাচাফুফু আসলেও বাড়িতে অর্ধশতাধিক মানুষ হয়ে যেত। তখন ঈদ মানে সত্যি সত্যি আনন্দ ছিলো। সবাই যখন ঈদের পর বাড়ি ফাঁকা করে দিয়ে চলে যেত, আমার এত মন খারাপ হত, মোবাইল ছিলো না, পড়ালেখার ক্ষতির ভয়ে ডিশ অ্যান্টেনার ক্যাবল কানেকশান ছিলো না, কি বিষন্ন সে দুপুর। তেমন এক দুপুরে আজ আমি আবার বাড়ি ছাড়লাম, আমার দিদুকে একা রেখে।

স্কুল ছুটি হলে বাসায় যাবো। রিক্সাওয়ালাকে বলবো, ডিগ্রী কলেজের উত্তরে যাবেন? উচুঁ রাস্তার নিচে। আমাকে কেন স্কুল থেকে বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে। কেন এইদেশেতে জন্ম মাগো এই দেশেতে মরি গাইতে গাইতে এক জীবন পার করে দেয়া যাবে না। আর কতবার বাড়ি বদল হলে, শহর বদল হলে এই পৃথিবী আমাকে যাযাবরের সার্টিফিকেট দিবে? আর দিলেই বা কি? পৃথিবীর কোন্ সার্টিফিকেট শেকড়ের টানকে উপেক্ষা করতে পারবে?

উপরে