NarayanganjToday

শিরোনাম

অনুশোচনা

শাহীন চৌধুরী ডলি


অনুশোচনা

৬ মার্চ, রোজা শুরুর আগের দিন। উওরা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসবো। রিকশা থেকে নেমে দুটো ব্যাগ নিয়ে একা হাঁপাতে হাঁপাতে রেলষ্টেশনে পৌঁছলাম। এয়ারপোর্ট ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নিরিবিলি একটা জায়গায় বিশ্রাম নিতে বসেছি। প্রচণ্ড গরমে প্রাণ যেন যায় যায় অবস্থা। আপাদমস্তক ঘামের নহর বইছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। খোলা ষ্টেশনে চাইলেই শীতল হওয়ার ব্যবস্থা নেই।

বোতলের মুখ খুলে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে কিছুটা পানি পান করতে করতে শুনি- ‘আচ্ছা আপা আগামীকাল কি রোজা শুরু হবে? আজকে রাতে কি সেহরি খাবো?’ তাকিয়ে দেখি এক লোক শুধু শুধু গল্প জমানোর চেষ্টা করছেন। এড়িয়ে যেতে বললাম, ‘ভাই পেপার পড়ে দেখেন এই সম্পর্কে কি লেখা আছে। নয়তো এক কাজ করেন, মসজিদে যেয়ে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করে আসুন।’ উনি বেজার মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন। না, অযথা গায়েপড়া ভঙ্গি একদম নিতে পারছি না।

যেখানে বসেছি সেখানে লোক সমাগম অনেক কম। নিরিবিলি দেখেই বসা। আমাদের দেশের রেলষ্টেশন মানেই নানা কথার আওয়াজ, হকার, কুকুর, ছাগল, পাগল, মানুষ, চোর, ছ্যাঁচড় সকলের সহ-অবস্থান। আমার কামরার নাম্বার অনুযায়ী এদিকে থাকলেই ট্রেন ধরতে সুবিধা বেশি সেটাও এদিকটায় বসার অন্যতম কারণ।

মনে মনে ভীষণ ভয় পাচ্ছি, গায়ে পড়ে কথা বলতে আসা লোকটা কি ছিনতাইকারী! আচ্ছা যখন ট্রেন আসবে তখন কি ছিনতাইকারী আমার হাতব্যাগটা ছোঁ মেরে নিয়ে পালাবে! এই হয়েছে এক মহাজ্বালা। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের ভয়ানক ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর থেকে এই ব্যাপারে আমি বলতে গেলে মানসিক রোগী হয়ে গেছি।

হাতের ভ্যানিটি ব্যাগটা চেপেচুপে ট্রাভেল ব্যাগে চালান করে দিলাম। শুধু কমদামী একটা সিম্ফনি ফোন ব্যাগের বাইরের দিকের চেইন টেনে তাতে রেখে দিবো। এর মধ্যে বরের করা ইনকামিং কল আসতেই ওর সাথে কথা বলছি, ‘হুম হুম চিন্তা করোনা, ঠিকভাবে ষ্টেশনে এসে পৌঁছেছি। এই তো মাত্রই মাইকে এনাউন্স করলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ১ নাম্বার প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবে। আমি ঠিক পারবো, অতো ভেবোনা তো।’

আমার কাছে এন্ড্রয়েডের কয়েকটা ভালো কোম্পানির মোবাইল ফোন আছে, মেয়ে রেখে গেছে একটা, ছেলের একটা যা সে দেশে এলে ব্যবহার করে, নিজের লেখালেখির কাজে ব্যবহারের জন্য দুইটা। চারটা এন্ড্রয়েড ফোন, স্যামসাং এর একটা ট্যাব আমার দখলে থাকা সত্বেও আমি আজো সেলফি তোলা শিখিনি। ছবি কিভাবে এডিট করে সুন্দর করে তোলা যায় তাও জানিনা। সচরাচর এদের বাইরে বেরও করি না। কোনো অনুষ্ঠানে আমার মোবাইলে ছবি তোলা হয় না। অন্য যারা ছবি তোলেন তাদের কাছ থেকে পেলেই নিজেকে মুখবইয়ে প্রদর্শন করি। যেহেতু সেলফি তুলতে জানিনা তাই বিখ্যাত কারো কাছে ঘেঁষে বত্রিশ দাঁত কেলিয়ে বলা হয়না, ‘আপনার সাথে একটা সেলফি নেয়ার বড্ড সাধ আমার।’

গরিবী হালতে থাকলে নিরাপদ থাকা যায় এটা আমার ধারণা। চোর বাটপার ভাববে, এর কাছে থেকে নেওয়ার মতন দামী কিছু নেই, ব্যাস তারা অন্য শিকার খুঁজবে। নিজেকে তথাসম প্রদর্শনে মধ্যবিত্ত আমি একা কোথাও দূরে জার্ণি করলে মাথাভর্তি তেল দিয়ে মুখ চুপসে রাখি। পরিধেয় কাপড় থাকে নামমাত্র মুল্যের আর ফোনটাও হাজার টাকা গণ্ডি পেরোনা দামের না। তাও কোনোরকমে প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ রাখাটাই মূখ্য উদ্দেশ্য হয়। যাত্রাপথে কাছের মানুষরা আমাকে এই অতি সস্তা দামের মোবাইলে রাখা সিম নাম্বারেই কল দেয়। এটা শুরু হয়েছে ওই যে জানালাম ২০১৭ সালে এয়ারপোর্ট ষ্টেশন থেকে উওরার বাসার যাওয়ার পথে ভয়ানক ছিনতাইয়ে অতি মূল্যবান জিনিসপত্রের সাথে থাকা সবকিছু হারানোর পর থেকে। তখন থেকে শরীরের স্বাভাবিক সুস্থতাও হারিয়ে গেছে, ডান দিকের হাত-পা, ঘাড়, কাঁধ, হাঁটু আধা- অকেজো। মনের সুস্থতার জায়গাও দখল করেছে ভয়।

প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসতেই যা হয় সচরাচর তাই হলো। মানুষের ভিড়ে ট্রেনের দরজার কাছে এসে আটকে আছি। কিছু মানুষ এমন আছে যারা ট্রেনের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকে। না নিজে কামরার ভেতরে প্রবেশ করে, না অন্যকে কামরায় প্রবেশের সুযোগ দেয়। আসা যাওয়া করতে করতে এটা বুঝে গেছি, এরা আসলে পকেটমার বা ছিনতাইকারী।

আমার দুইহাতে ব্যাগ, বাম হাতে রাখা বড় ব্যাগটা বেশ ভারী। কিছুতেই যখন ব্যাগগুলো নিয়ে ট্রেনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিলাম না তখন ১৭/১৮ বছরের একটা ছেলেকে অনুরোধ করলাম আমার একটা ব্যাগ উঠিয়ে দিয়ে সাহায্য করতে যদিও পারতপক্ষে কারো সাহায্য নেয়া আমার একদম পছন্দ না। আজকে পুরো নিরুপায় বোধ করছি। কারো সাহায্য নিলে তার বিনিময় দেওয়া আমার কাছে কর্তব্য মনে হয়। কর্তব্যের খাতিরে তার বিনিময় মনে মনে নির্ধারণ করে রাখি। যদিও সব বিনিময়ে প্রকৃত স্বস্তি মেলে না। মনে হয় সাহায্যদাতার পাওনা আরো বেশিকিছু ছিলো।

ছেলেটি আমার ব্যাগ শুধু উঠিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সে নিজে তা বহন করে কামরার সামনের দিকে আগাচ্ছিল। আমি অনেকবার ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে দিতে বললেও সে আমাকে সাহায্য করতে স্বতঃস্ফূর্ত ছিলো। নিজের সিটের দিকে আগাতে আগাতে তার সিট নাম্বার কত জানতে চাইলাম। উত্তরে বললো- ‘আপু, আমি ট্রেনের সিট পাইনি।’ উত্তর শুনে মনে মনে খুশিই হলাম।

না, আপনারা প্লিজ ভাববেন না যে ছোট ছেলেটি ট্রেনের বসার আসন ক্রয় করতে পারেনি বলে আমি খুশি হয়েছি বরং আমি খুশি হয়েছি তার সাহায্যের বিনিময়ে আমি তাকে বিনামূল্যে একটি সিট উপহার দিতে পারবো বলে। হ্যাঁ আমার আর আমার বরের একইসাথে যাওয়ার কথা ছিল। বিশেষ কাজে ওকে একদিন আগেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আমাদের উভয়ের জন্য দুটো টিকেট কাটা আছে। আমার আসন নাম্বার ঠ ১১-১২। আমি ১১ নাম্বার সীটে বসে তাকে ১২ নাম্বার সিটে বসার আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্যাগটি ট্রেনের দরজা থেকে সিট পর্যন্ত এনে মালামাল রাখার তাকে রেখে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম।

ট্রেনের জানালার পাশে বসে তাকে নাম জিজ্ঞেস করতেই সে তার নাম জানালো, রফিক। গাজীপুর মহানগর কলেজে ২য় বর্ষে পড়ছে। মায়ের কাছে বাড়ি যাবে, বাড়ি মাধবপুরের কাছাকাছি, তাই নামবে হরষপুর ষ্টেশনে। হিসেবমতন আমি তার কয়েকষ্টেশন আগেই নেমে যাবো।

রফিক আমার পাশের সিটে বসেই তার প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বলে উঠলো, আমার মোবাইলটা নেই। তার চোখমুখ আঁধারে ছেয়ে গেছে। আমি তাকে ভালো করে খুঁজতে বললাম। সে তন্নতন্ন করে খুঁজে জানালো, না নেই। আহা! তার সদ্য কেনা শাওমি মোবাইল সেট। কিছুক্ষণ আগেও নাকি প্ল্যাটফর্মে বসে ফেসবুক ইউজ করছিলো। ভিড়ের সুযোগে কোনো পকেটমার হাতসাফাই করেছে। প্ল্যাটফর্ম থেকেই হয়তো চোর ব্যাটা রফিকের শাওমি নিজের দখলে নিতে তাকে অনুসরণ করছিলো।

আমার কমদামী সিম্ফনি ফোন এগিয়ে দিয়ে রফিককে নিজের নাম্বারে ডায়াল করতে বললাম। ডায়াল করতেই বুঝা গেল নাম্বার সুইচড অফ। মাঝে মাঝে কিছু ব্যাপার মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।

রফিক উচ্চমাধ্যমিকের একজন ছাত্র মাত্র। তার মোবাইল খোয়া যাওয়ার ঘটনায় প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল। চলন্ত ট্রেন থেকে বাইরের প্রকৃতির দিকে যতই দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করছি কিন্তু মন খারাপ ভাব যাচ্ছে না। সোনালী ফসলের মাঠ দেখে যে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনে মনে কবিতা সাজাই সেই আমি মনখারাপের বসতবাটিতে হাহাকারের মালা গাঁথছি।

ট্রেনে বসে নিজের ফোন থেকে পুলিশ অফিসার ছোটভাই মাসুদ রানাকে কল দিতেই ও সাথে সাথে কল রিসিভ করলো, ঘটনাটা মাসুদকে জানিয়ে যদি পারে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করলাম। মাসুদ আশ্বস্ত করলো, মোবাইলের আইএমও নাম্বার দিয়ে রফিক যেন তার সাথে যোগাযোগ করে। রফিককে মাসুদের নাম্বার দিয়ে কিভাবে কি করলে তার মোবাইল ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে তা বুঝিয়ে দিলাম। এর আগেও আমার অনুরোধে পরোপকারী ছোটভাই মাসুদ রানা আরেক ছোটভাই লিখনের হারিয়ে যাওয়া মোবাইল উদ্ধার করে দিয়েছিল, তাও রফিককে বললাম।

আমার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে তাকে অনুরোধ করলাম যেন মোবাইল ফেরত পেলে আমাকে জানায়। যে কোনো সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলে যেন অবশ্যই দেখা করে। কারো কারো প্রতি একটা মায়া পরে যায়। আমার ভেতর দ্বৈত স্বত্তা আছে। মায়া যেমন আছে তেমন ক্ষেত্রবিশেষে রুক্ষ্মতা আছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই কারণ আমি রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ বই তো মানবী নই।

রফিক আমার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলো। ওর সাথে সাথে আমারও খুব বিষন্ন লাগছে। মাত্র ঘণ্টা দেড়েক সময়ে আমার গন্তব্যস্থানে প্রায় এসে গেছি। আমি মাথার উপরের সেলফ থেকে নিজের ভারী ব্যাগটা নামাতে যেতেই রফিক বাধা দিলো। সে নিজেই ব্যাগটা নামালো। আমাকে হাতের ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে নামার অনুরোধ জানিয়ে বললো, ‘আমি ষ্টেশনে নামামাত্র সে জানালা দিয়ে আমার বড় ব্যাগটা বের করে দিবে এবং রফিক তাই করলো।

যে এতোটা উপকার করার মানসিকতা রাখে তার বিপদ কেন অন্যে ডেকে আনে। রফিক জানালা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমাকে হাত নেড়ে বিদায় দিলো। মনে করিয়ে দিয়ে বললাম, ‘প্লিজ হারানো মোবাইলটা পেলে আমাকে কল দিয়ে জানাইও। আমি চিন্তায় থাকবো।’

আজ পুরো এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। রফিকের কল পাইনি। ভাবছি আগামীকাল আমি রফিককে একটা কল দিবো। ও কি ওর সিমটা উঠিয়েছে? মোবাইল কি ফেরত পেয়েছে?

একটা এন্ড্রয়েড মোবাইল মানে শুধু কথা বলার মাধ্যম না। এতে থাকে আরো কতশত অনুসঙ্গ,কত স্মৃতময় ছবি। ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় কত তথ্য! আগামীকাল যখন রফিকের নাম্বারে ডায়াল করবো, ও যেন রিসিভ করেই মিষ্টি কণ্ঠে সন্তুষ্ট চিত্তে হেসে হেসে বলে, ‘আপু আমার শাওমি ফোনটা পেয়েছি, এটা দিয়েই আপনার সাথে কথা বলছি।’

তুমি ফোনটা না পেলে আমি অপরাধী হয়ে যাবো ভাই। এমন তো হতে পারে, যখন দুই হাত উঁচিয়ে তুমি আমার ব্যাগটা সবার মাথার উপর দিয়ে বয়ে নিচ্ছিলে, ঠিক সেই সময়ে পকেটমার তোমার পকেট থেকে অনায়াসে ফোনটা তুলে নিয়েছে।

উপরে