NarayanganjToday

শিরোনাম

লাল-নীল সংসার-১৬

ফেরদৌস কান্তা


লাল-নীল সংসার-১৬

লাগাতার জার্নিতে, বিশ্রামের অভাবে আর টেনশানে জাহিদের বেশ দুর্বল লাগছে শরীরটা। ঢাকায় ফিরল সে প্রচণ্ড জ্বর গায়ে নিয়ে। বাসায় ফিরেই তার শরীর আরও খারাপ হল। তার বোন বারবার জানতে চাইল কি হয়েছে। নিরুত্তর জাহিদ কটা দিন শুধু পরে পরে ঘুমাল। চারদিন পর তার শরীরটা একটু ভালো বোধ হওয়াতে চিন্তা করলো এবার নিরুর খোঁজে বের হওয়া দরকার। সেদিন রাতেই সে তার বোনের সাথে আলাপ করল নিরুর সাথে ঘটে যাওয়া পুরা ব্যাপারটা নিয়ে। তার বোন না থাকাকালীন সময়ে যা যা ঘটেছে এই বাসায় নিরুর সাথে এবং তার দুলাভাইয়ের নোংরা আচরণ কিছুই বাদ দিলনা জাহিদ। এবং বলল যে, নিরুকে সে যে করেই হোক খুঁজে বের করবেই। নীরবে তার বোন শুধু কেঁদেই গেলো সব শুনে। এক পর্যায়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বোন বলল যে, ‘নিরুকে তুই কিভাবে খুঁজে পাবি? এটা কি সম্ভব? এতো বড় শহরে সেই লোক দুটিই বা কে? কি উদ্দেশ্যে তারা নিরুকে ধরে নিয়ে গেছে? তুই তো কিছুই জানিস না। যা হয়েছে হয়ে গেছে। সব বাদ দে। নিরুকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দে। কপালের বাইরে কেউ যেতে পারেনা।’ খুব ঠাণ্ডা ও গম্ভীর কণ্ঠে জাহিদ বলে উঠল, ‘না, নিরুকে আমি খুঁজে বের করবোই। যেভাবেই হোক, যেখান থেকেই হোক’ ওর শীতল কণ্ঠের আওয়াজে কেন যেন কলিজা কেঁপে উঠল তার বোনের। অসহায় হয়ে জিজ্ঞ্যেস করল, ‘এখন তাহলে কি করতে চাস? তোর সামনে পরীক্ষা। কত আশা করে আছি আমরা সবাই তোর উপর।’ জাহিদ খুব শান্ত ভাবে বলল, ‘আমার পরীক্ষা নিয়ে একটুও ভেবনা। পরীক্ষা আমি ঠিক ভাবে সময় মতই দিবো। রেজাল্ট ও ভালো হবে। কিন্তু নিরুকে খুঁজতে বের না হলে আমার জীবন এখানেই আটকে যাবে মনে হচ্ছে। নিরুও আমাকে বিশ্বাস আর ভরসা করে বাড়ি ফিরতে গিয়েছিল। জানিনা কেন শুধু ওর মুখটা মনে পরছে আর মনে হচ্ছে ও আমার অপেক্ষায় আছে। আমি কাল সকালেই বের হব সপ্তাহখানেকের জন্য। তুমি পারলে আমায় কিছু টাকা দিও। আমার হাত একেবারেই খালি।’

জাহিদ খুব ভোরেই গাজীপুরের উদেশ্যে বের হয়ে গেল বাসা থেকে। বাসে উঠেই সে তার পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে ভেবে ফেলল। এরি মাঝেই গতরাতে সে তার গাজীপুরের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেছে। রিপন ও শামিম নামের দু’জন বন্ধু আছে তার, যারা গাজীপুরের স্থায়ী বাসিন্দা। দুজনেই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি ও বেশ ভাল সেখানে। তাদের সাথে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে জাহিদের এবং তারা বলেছে সব রকমের সহযোগিতা করবে তাকে। তারা দু’জন আজ বাস কাউন্টারে জাহিদের জন্য অপেক্ষা করবে। এসব ভাবতে ভাবতেই সে পৌঁছে গেল গন্তব্যে। বাস থেকে নেমেই সে দেখতে পেল বন্ধুদের। কুশল বিনিময়ের পর জাহিদ সরাসরি কাজের কথা শুরু করল। কি ঘটেছিল সেদিন আবার বলল বন্ধুদের। তারপর বলল সেই দুজনের নাম যারা সেদিন ঘটনাটা ঘটিয়ে ছিল, ‘সেলিম আর রফিক’।

রিপন আর শামিম দুজনেই আশ্বস্ত করল জাহিদ কে তারা তার সাথেই আছে, তাই অহেতুক চিন্তা করতে মানা করল। যেহেতু তুহিনের ঠিক মনে নেই হোটেলের নামটা , তবুও অসুবিধা হবার কথা নয়। কারণ, এখানে সব হোটেলই কম বেশি তাদের পরিচিত, তাই খুঁজে বের কথা কষ্টকর হবেনা সেদিন কোন হোটেলে ঘটনাটা ঘটেছে। রিপন বলল, ‘চল আমরা চৌরাস্তার মোড় থেকে শুরু করি, কারণ সব বাস এখানেই আশেপাশে থামে। যেকোন একটা হোটেলে ঢুকি, নাস্তা খাই আর খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করি। আর মনে হয়না তুহিন সেদিন খুব দূরের কোন হোটেলে ঢুকেছিল। যেহেতু, বাস কাউন্টার থেকে নেমেই খেতে ঢুকেছে, সেহেতু আশেপাশের কোন হোটেলই হবে’। বুদ্ধিটা সবার পছন্দ হল। কাউন্টারের কাছের হোটেলে ঢুকল সবাই। এক কর্নারের একটা টেবিলে গিয়ে বসল তিনজন। খাবারের অর্ডারের জন্য ডাকল হোটেল বয়কে। একজন কাছে আসতেই, হাতে একশত টাকার একটা নোট গুঁজে দিল শামিম। তারপর জানতে চাইল, এই হোটেলে কিংবা আশেপাশের কোন হোটেলে সপ্তাহ দুয়েক আগে একটা ঘটনা ঘটে, যাতে একটা ছেলেকে মেরে তার সাথের মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যায় দুজন লোক। এই ঘটনা সম্পর্কে সে কিছু জানে কিনা? ছেলেটি জানাল সে জানে কিন্তু এখানে বলা যাবেনা, সমস্যা আছে। জাহিদ আরও একশ টাকার একটা নোট তার হাতে গুঁজে দিল। ছেলেটি টাকাটা নিয়ে মাথা নিচু করে টেবিল মুছতে মুছতে বলল। তার কাজ চারটার পরে শেষ হবে তাই ওরা যেন বিকালে তার সাথে পাঁচটার দিকে গাজীপুরের কাঁচাবাজারে দেখা করে। এখন সে দোকান থেকে বের হতে পারবেনা। অতএব জাহিদরা চা খেয়ে বেড়িয়ে পরল দোকান থেকে। একসাথে আরও কয়েকটি হোটেল ঢুঁ মারল, কিন্তু কেউ আর তেমন কিছুই বলতে পারলনা। রিপনের বাসায় গিয়ে দুপুরে খেয়ে নিল সবাই। তারপর অপেক্ষায় রইলো বিকেলের আর সেই হোটেলের ছেলেটির। (চলবে)

উপরে