NarayanganjToday

শিরোনাম

গৃহশিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মানি দিতে শিখুন


গৃহশিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মানি দিতে শিখুন

কিছু কিছু অভিভাবক গৃহশিক্ষকদের মানুষ বলেই মনে করেনা।ব্যাপারটা এমন যে গৃহশিক্ষকেরা রাস্তার ভিখারি। তাদের ছেলে বা মেয়েকে পড়াচ্ছে কিংবা পড়াতে চাচ্ছে শুধু টাকার জন্য। কাজেই এদের হাতে ১০/৫ টা টাকা ধরিয়ে দিলেই হবে।

একজন শিক্ষক যে কতটা সম্মানীয় তারা যেমন বুঝে না তাদের বাচ্চারা তো আরও বুঝে না! শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের ব্যবহার দেখলে মনে হয় টাকা নেওয়ার কারনে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীকে যদি হোম টিউটর 'হুজুর হুজুর' করে তাহলে এনারা বেশি খুশি হন।

এমনটা হতেই পারে অভিভাবকরা যখন পড়াশুনা করেছেন তারা কখনও গৃহশিক্ষকই রাখেননি, কাজেই তারা বুঝেন না। তাহলে পরামর্শটা এমন যে আপনারা আপনাদের বাচ্চাদের গৃহশিক্ষক ছাড়াই পড়ান। কেউতো আর বাধা দিচ্ছে না। দেখুন, আপনার বাচ্চারা তাল মিলাতে পারে কিনা বাকিদের সাথে। একবার যাচাই করুন আপনার বাচ্চাদের। আমি নিজে প্রথম প্রাইভেট শুরু করেছি এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার তিন মাস আগে থেকে। আমি জানি আমার মতো আরও অনেকে এমন আছে। আমরা যদি পারি আপনাদের বাচ্চারাও পারবে ইনশাআল্লাহ্‌।

আর যদি গৃহশিক্ষক ছাড়া আপনাদের না-ই চলে তাহলে তাকে প্রাপ্য সম্মান এবং সম্মানী দিতে শিখুন। শিক্ষককে শিক্ষকের মর্যাদা দিতে কার্পণ্য কেন? আপনারাই যদি এমন করেন তাহলে বাচ্চারা আপনাদের কাছে কি শিখবে? তারপরেও গৃহশিক্ষকের কত দোষ!

কিছু দোষের বর্ণনা দেই- একবার আমি গেলাম এক নতুন শিক্ষার্থীর বাসায়। কথাবার্তা মোটামুটি একেবারে পাকা না করেই। যাওয়ার পর ওই শিক্ষার্থীর মা আমাকে শিক্ষার্থীর আগের শিক্ষকের বদনাম করলেন পাক্কা দেড় ঘণ্টা- ‘ওই শিক্ষকতো ফাঁকিবাজ, আমার ছেলেকে পড়াতেই আসেনা। আমি বাসায় না থাকলেই ফাঁকি দেয়। ১ ঘণ্টাও পড়ায় না ঠিক মত। ওই শিক্ষকের পড়ানোর কথা অংক, ফিজিক্স আর বায়োলজি। ওই শিক্ষক শুধু অংকই পড়ায় ১ ঘণ্টা ধরে।’ এরপর আমাকে খাতা এনে দিলেন- ‘এই দেখো খাতায় খালি অংক করা। তাও ওই শিক্ষকের হাতের লেখা। আমার ছেলেকে দিয়ে কিছুই লেখায় না। তাহলে আমার ছেলে পরীক্ষায় পারবে কি করে! একদিন দেখি সে আমার ছেলেকে এত জোরে ধমক দিছে(!) যে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেছি। আমার ছেলে পড়া পারে নাই দেখে এত জোরে ধমক! এইটা কোন কথা! আমি সচেতন অভিভাবক দেখে ধরে ফেলছি। অন্যেরাতো পারতোই না। আমি কি তাকে টাকা কম দিই? বরং আমি তাকে বলেছি তোমার পড়ানোর শেষের দিকে আমি তোমাকে এমন গিফট দিব যা তুমি সারাজীবন মনে রাখবে। তারপরেও আমার ছেলেকে সে এইভাবে পড়িয়ে আমার সোজা শান্ত ভাল ছেলেটার জীবন নষ্ট করে দিছে! ইত্যাদি।’

এরপর আমি ওই ছেলেকে পড়ানো শুরু করলাম। বায়োলজি, ইংরেজি আর ফিজিক্স (ক্লাস ১০)। ৪ দিন পড়ালাম। দুই চ্যাপ্টার শেষ করলাম। আর ছেলের কন্ডিশন এমন যে ৪ দিনে সে একটা পড়াও শিখে নাই। একদিন তার মাথা ব্যথা, একদিন আম্মু বাসায় ছিল না খাওয়া দাওয়া কষ্টের কারনে, একদিন খেলতে গিয়ে ব্যথা পেয়ে, আরেকদিন তার মনেই ছিলনা যে পড়া নামক কিছু দেওয়া ছিল! আর প্রথম দিন তাকে একটা চ্যাপ্টারের ২০ টার মত শুধু প্রশ্ন লিখে দিচ্ছিলাম যাতে প্রশ্ন একত্রিত করার পর সেই চ্যাপ্টার পড়ালে বুঝতে সুবিধা হয়। বিশ্বাস করেন আর না করেন, ওই ২০ টা প্রশ্ন তার শুনে শুনে শুধু খাতায় লিখতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল। প্রথম দিন জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার কোন কোন চ্যাপ্টারে সমস্যা সেটা আগে পড়াই। সে বলে- আমি এই দেড় বছর বই ধরি নাই। বই খুলে দেখি কোন দাগ নেই বইয়ে। আর কাহিনী নাই বললাম।

এদিকে গার্ডিয়ান স্যালারির ব্যপারটা ফিক্সড করতেছেনা। যতই জিজ্ঞেস করি বলে না কিছুই। আজ বলবো কাল বলবো করে আর বলেনা। এদিকে স্টুডেন্টের এই কন্ডিশন। যারা টাঙ্গাইলে থাকেন বা এই শহর চেনেন তারা বুঝবেন। টিউশনি করাতে যেতাম শান্তিকুঞ্জ থেকে এসপি পার্ক হয়ে, হাজেরা ঘাঁট হয়ে 'কাগমারা'তে।

৪ দিন ওই স্টুডেন্টকে পড়ানোর পর আমাকে বলে এবার বলো সপ্তাহে ৫ দিন পড়াতে হবে তুমি কত স্যালারি চাও। আমি আমার মত অ্যামাউন্ট বললাম। উনি বললো আমিতো আগের শিক্ষককে ৩ হাজার দিতাম। তোমাকেও তাই দিতে চাচ্ছি। আমি বললাম আমি যেটা বললাম আপনি একটু চিন্তা করে আমাকে জানান কারন ৩ হাজারে তো আমার জন্য টাফ হয়ে যায়। মহিলা বলল ঠিক আছে। আমি তোমাকে ফোন দিয়ে জানাবো আর কাল কখন আসবা তাও আমি কল করে জানাবো।

আজ ৮ মাস হয়ে গেল ওই মহিলার কল এখনও আসলো না। এখানে মজার ব্যাপার হলো। গার্ডিয়ানদের কথাঃ আগের টিচার ফাঁকিবাজ ছিল।পড়ালেও ভাল পড়াতো না। তুমি অনেক ভাল পড়াবা। আগের টিচার সপ্তাহে ৩ দিন আসতো তুমি ৪/৫ দিন আসবা। আগের টিচার ২ টা সাবজেক্ট পড়াতো তুমি ২ টাই পড়াবা কিন্তু মাঝে মাঝে অমুক সাবজেক্ট টাও একটু দেখিয়ে দিবা।আর বেতন? আরে আগের টিচার যা নিতো তুমিও তাই নিবা। আমরা তো পড়িয়ে আসতেছি এই বেতনেই, তাইনা! এই হলো গৃহশিক্ষকের সম্মান আর সম্মানী। ভাল থাকুক গৃহশিক্ষকেরা। ভাল থাকুক অভিভাবকেরা।

উপরে