NarayanganjToday

শিরোনাম

যাপিত জীবন কথন : চলার পথে


যাপিত জীবন কথন : চলার পথে

একুশে বইমেলা উপলক্ষে ঢাকা এসেছিলাম। বইমেলার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে দেশে বিদেশে ব্যস্ততম সময় পার করে আজ দেড়মাস পর উত্তরার ফ্ল্যাটে তালা ঝুলিয়ে এয়ারপোর্ট রেলওয়ে ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। গন্তব্য প্রিয় শহর, কর্মক্ষেত্র, আরেক নিজ বাসভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আবার কতদিন পরে ফের আসা হবে শহুরে ইটকাঠে গড়া আধুনিক যান্ত্রিক অথচ মায়াময় ঢাকায় অবস্থিত নিজের ছোট্ট নীড়ে, তা জানিনা। জীবন মানেই কেবল ছুটে চলা। স্থীরতা নেই, যাযাবর পথচলায় কতো চড়াই উৎরাই।

নিজে হাতে একটু একটু করে গুছানো ফ্ল্যাটে কেটে গেছে প্রায় একযুগের বেশি। সারা বাসাময় সবকিছু যেমন আছে তেমন পরে রবে শুধু আমরা কেউ থাকবো না। মেয়ের কক্ষ তেমনি সাজানো, ছেলের কক্ষও তার মতন করে সাজানো। থরে থরে সাজানো ওদের স্মৃতি। আমি দরজা লক করার উদ্দেশ্যে চাবিতে হাত দিই। চোখ গড়িয়ে ঈষদুষ্ণ গরম জল বেয়ে পড়ে। পাশে বাবু দাঁড়িয়ে আছে। শান্তশিষ্ট পৃথিবীর অন্যতম ভালো মানুষ আমার বরটি। ওর মনও খুব খারাপ, বাচ্চাদের স্মৃতি তাড়িত করে ওর নরম কোমল মনকে। বাস্তবতার নিয়মে শৃঙখলিত শক্ত মনের আমি অন্তরে দহনের শিখা জ্বাজল্যমান থাকলেও আমার টুনার হাতে হাত রেখে লিফট এড়িয়ে সিঁড়িতে হেঁটে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে আসি। এপার্টমেন্টের মূল ফটকরক্ষকদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিকশায় উঠে বসি। সি সি ক্যামেরা আমাদের যাওয়ার মুহূর্তগুলো ভিজ্যুয়াল করতে থাকে।

যতোটা সহজে বিমানবন্দর রেলষ্টেশনে পৌঁছাই, এবার তেমন নির্বিঘ্নে পারিনি। সেক্টরের আভ্যন্তরীণ রাস্তা পার হয়ে বাম পাশে ষ্টেশনের দিকে বাঁক নিতেই কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার সব রিকশা আটকে দিচ্ছেন। নিয়মমতো আমরাও তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। বহু যাত্রী শিশুদের নিয়ে, সাথে থাকা লাগেজ নিয়ে গহীন বিপাকে পড়লো। আমাদের সাথেও বেশ ভারী দুটো লাগেজ। এমন স্থানে সাহায্যকারী কুলি পাওয়াও অসম্ভব। আগে এখানে রিকশা যাতায়াতের লেন ছিলো অথচ বিকল্প কোন রাস্তা না রেখেই রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলো। যাত্রীসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়নি । আমি অফিসারকে অনুনয় করে আমার সমস্যার কথা জানাতে বাধ্য হলাম যদিও ব্যক্তিগতভাবে কখনোই আইন অমান্য করার পন্থী নই। তিনি প্রথমে না না বললেও শেষতক স্বীকার করলেন, সরকারি এই ব্যবস্থায় উওরার ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের পূর্বপাশে থাকা সেক্টরের যাত্রীরা ষ্টেশনে যাতায়াতের আসা যাওয়া উভয় ক্ষেত্রে ভীষণ সমস্যা মোকাবেলা করছে। যারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন তাদের কথা ভিন্ন। স্বল্প দুরত্বের জন্য মালামাল নিয়ে রিকশাকেই বাহন হিসেবে ব্যবহার করা সহজ এবং খরচ পড়ে কম। পুলিশ অফিসার রিকশা চড়ে আমাদের  অল্প কিছুদূর যাওয়ার অনুমতি দিলেন এবং আমাকে পরামর্শ দিলেন আমি যেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে এই নিয়ে কমপ্লিন করে যাত্রীবান্ধব আশু ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করি। কোন রিকশাচালক আইন অমান্য করলে তাকে ১২০০ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে, এই তথ্যও জানালেন। তথ্যটি জানার পর আমরা ভীত হয়ে পড়শীকে ( ইদানিং আমরা সকল রিকশাচালকদের পড়শী নামেই সম্বোধন করছি) পূর্ণ ভাড়া মিটিয়ে যারপরনাই কষ্ট ভোগ করে লাগেজ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে করতে দেখতে পেলাম বহু পড়শী তাদের বাহন চালাচ্ছেন, আইন অমান্য করছেন পেটের দায়ে। শুনলাম আইন অমান্য করার দায়ে কোন কোন পড়শী ১২০০ টাকা জরিমানা নামক মাশুল গুনেছেন।

বিমানবন্দরের নিকটবর্তী সুপ্রশস্থ রাস্তার কেবলমাত্র বাম পাশে একটা রিকশার লেন অনায়াসে রাখা যেতো। অথবা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্ল্যাটফর্মের ১ নম্বর লাইন সংলগ্ন উত্তরপ্রান্ত দিয়ে একটা বিশেষ নিরাপত্তা গেইটের ব্যবস্থা রাখা যেত। ওখানে নিরাপত্তা কর্মী দিয়ে চেকিং করিয়ে ষ্টেশনে যাত্রী প্রবেশ এবং প্রস্থানের মধ্য দিয়ে যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে পারতো। অথচ বিনা টিকেটের যাত্রী এবং অনেক অসাধু লোক সীমানা রেলিং গলিয়ে নিত্য যাওয়া আসা করছে। সেদিকে রেল কর্তৃপক্ষের বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা নেই।

মনখারাপ করে ষ্টেশনে বসে আছি। অনিয়ম দেখতে দেখতে ক্লান্ত মন বলে,বাচ্চা দুটোকে এইসব অনিয়মের মধ্যে বেড়ে উঠতে হচ্ছে না -- এটাও কিছুটা স্বস্তির। কিন্ত যারা সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠছে তাদের পেরেশানি ক্ষণে ক্ষণে।মাইকে ঘোষনা করা হলো অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ১ নাম্বার প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবে। জয়ন্তিকা হুইসেল বাজাতে বাজাতে এসে নির্দিষ্ট স্থানে থামলো। আমরাও লাগেজ নিয়ে রেল কামরার দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় দাঁড়ানো। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি, কেউ কারে নাহি ছাড়ে সূচাগ্রমোদিনী। বয়োজ্যেষ্ঠ, মহিলা, শিশুদের ধাক্কা দিয়ে পেছন থেকে ট্রেনে উঠতে তৎপর থাকা যুবককে দেখি আর হতাশ হই। মনে মনে ভাবি, এখানে যদি তার নিজ পরিবারের সদস্যরা থাকতো তাহলেও  কি সে একই আচরণ করতে পারতো? ট্রেনে উঠে, নিজেদের সিটে বসে হাফ ছেড়ে বাঁচি।সাথের লাগেজগুলো ভারী বিধায় উঠাতে যখন খুব কষ্ট হচ্ছিলো তখন একজন তরুণ তার কোলে ছোট শিশু থাকা সত্বেও সাহায্য করলো। আমাদের সব তরুণ যুবক একরকম নয়। তাদের অধিকাংশের মানসিকতা অনেক উন্নত। তারা অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং পরোপকারী।তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি অগ্রগামী বাংলাদেশ অধিকতর উন্নতির নিমিত্তে এগিয়ে যাবে।

রেল ছুটছে, আমি মুগ্ধ নয়নে সবুজ গ্রাম বাংলা দেখছি।মফস্বল শহর পেরুচ্ছি। মাঠে মাঠে ফসল ফলানোয় ব্যস্ত কৃষক দেখছি। হরেকরকম সবজিচাষের ক্ষেত, মাঠে চড়ানো গবাদিপশু, হাঁস- মুরগী, সাদা বকের সারি দেখছি। শুকিয়ে যাওয়া নদী মন খারাপের কীর্তন গায়। রোদেপোড়া কৃষকের তামাটে মুখে ঘামের চিকচিক অবয়ব আমাকে খাদ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়। আজন্ম ঋণী আমি কখনো তাদের দায় শোধের জন্য কিচ্ছুটি করতে না পারার বেদনায় দৃষ্টি লজ্জাবনত করি। পথিমধ্যে ট্রেনের যাত্রাবিরতিতে শ্রমে ক্লান্ত শিশু কিশোরদের পানি,জুস,চিপস বিক্রি করে পরিবারের অর্থনৈতিক চাকায় জ্বালানি দিতে ব্যস্ত মুখ দেখি। হঠাৎ পাশে বসা আমার বরের উপরে উড়ে এসে পড়ে এক ঠোঙা চানাচুর ভর্তা। আশপাশ নোংরা হতেই সচকিত অনেকেই দেখতে পাই এবং বুঝতে পারি পাশের সিটের নব বিবাহিত দম্পতির মধ্যে বউটির অপকর্মটি। বর লজ্জায় চুপচাপ বসে,বউটি চানাচুর ছুড়েই শান্ত হয়নি। এরপর বরের মুখে তার হাতে থাকা পেপার ছুড়ে মেরে,যেন কিছুই হয়নি সেই ভাব নিয়ে সিটের উপরে হাঁটু ভেঙ্গে পা তুলে জানালার বাইরে মুখ ঘুরিয়ে বসে উদাস হয়ে আছে। হায় মেয়ে, কি শিক্ষা পেয়েছো পরিবার থেকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তা আমার জানার কথা নয়। বিব্রত করতে চাইনি বলে মোবাইলে লিখেই যাচ্ছি। পার হচ্ছি দীর্ঘ ভৈরব সেতু। শুকিয়ে চর পরা মেঘনা নদীর এই অংশে ছোট ছোট নৌকা,মাল বোঝাই জাহাজ।সকল নদীর নাব্যতা ফিরে আসুক। নদীগুলো ড্রেজিং করা হোক ভাবতে ভাবতেই সেতু পার হয়ে আশুগঞ্জ ষ্টেশনে ট্রেন পুনঃ যাত্রাবিরতিতে থামলো টের পেলাম।আশুগঞ্জ থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শুরু। অল্প কিছুক্ষণ পরেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে জেলা শহরে আমার ইহজগতের আপাতত স্থায়ী আবাসে প্রবেশ করবো। প্রবেশ করবো ডলি - বাবু নামক দুই টোনাটুনির শান্তির নীড়ে।

ট্রেনে জানালার পাশের সিটে বসে থাকা আমি আলোকোজ্জ্বল দিগন্তবিস্তৃত নীলাকাশে মুখ তুলে চাইতেই তারা ইশারায় আমাকে বললো,তোমার মনের সুপ্ত ইচ্ছেগুলো একদিন পূর্ণতা পাবে। বাংলাদেশ উন্নত শিরে উঠে দাঁড়াবে, আলোকোজ্জ্বল দীপ্তি ছড়াবে, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। মনে বিশ্বাস রাখো, বিশ্বাসের জয়ে নিশ্চয় পুলকিত হবে। আমাদের আছে মেধা,করতে পারি অফুরন্ত পরিশ্রম। আমাদের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে তাদের সুনাগরিক করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সরকারসহ সকল সামর্থ্যবানের উপরে বর্তায়। নানা দেশে অবস্থানরত আমাদের সন্তানরা, তোমরা যে যেখানেই থাকো প্রকৃত মানুষ হও। ভালো কর্মে বাংলাদেশের সুনাম বইয়ে দিয়ে আলোকিত মানুষ হও, আলোকিত  করো দেশ, আলোকিত করো বিশ্ব।

উপরে