NarayanganjToday

শিরোনাম

ছাত্রদল থেকে যুবলীগের সভাপতি অতঃপর আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক!


ছাত্রদল থেকে যুবলীগের সভাপতি অতঃপর আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক!

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে এবং পারিবারিক ভাবে দলটির একনিষ্ঠ কর্মী হয়েও অনেকে পাদপদবী পাননি। অথচ ছাত্রদল থেকে এসে প্রথমে যুবলীগ বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন মীর সোহেল আলী! এ নিয়ে চলছে সর্বত্র আলোচনা সমালোচনা।

গেল কয়েকদিন ধরে সর্বত্রই এমন আলোচনা চলছে। গণমাধ্যমে তাকে অনুপ্রেবশকারী হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে। এমনকি আওয়ামী লীগ দলীয় অনেক নেতাকর্মীও তাকে আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বলা হচ্ছে। এমনকি দল থেকেও তার বহিস্কার দাবি করেছেন অনেকে।

তবে, মীর সোহেল আলীর দাবি, তিনি নামকাওয়াস্তে বিএনপি করেছিলেন। তখন তিনি বুঝতে না পেরে বিএনপিতে ছিলেন। কিন্তু তার দলীয় কোনো পদপদবী ছিলো না।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, ১৯৯১ সালে সৈয়দ মোহাম্মদ আকসিরের বিপরীতে ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী হয়েছিলেন মীর সোহেল আলী। সেসময় তিনি তৎকালিন এমপি কমান্ডার সিরাজুল ইসলামের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করেও ১ ভোট পান আর আকসির ১৩ ভোট পেয়ে সভাপতি হয়েছিলেন। এরপর মোহাম্মদ আলী বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জয়েন হওয়ার পর এই কমিটি ভেঙে দিয়ে ১৯৯৫ সালের শুরুর দিকে মীর সোহেল আলীকে ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়।

তবে, রবর্তীতে মীর সোহেল ফতুল্লা থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক থাকাকিলন ২০০০ সালের কিছু সময় পূর্বে আওয়ামী লীগের যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি মীর সোহেল আলীর বিরুদ্ধে চাঁদ শিকদার সেলিম নামে এক ব্যক্তি মামলা দায়েরের পর থেকে আলোচনা শুরু হয় তাকে নিয়ে। বলা হচ্ছে, দলের ভেতর অনুপ্রবেশকারীরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দলের দুর্ণাম করছে।

তবে মীর সোহেল আলী নিজেকে অনুপ্রবেশকারী বলতে রাজি নন। তার দাবি, তিনি ২৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন। সাংসদ শামীম ওসমানের কর্মী হওয়ার কারণে সাংসদের বিপরীত পন্থী লোকেরা তাকে নিয়ে অপরাজনীতি করছেন। তার দাবি, তিনি অপরাজনীতির শিকার হচ্ছেন।

এদিকে আওয়ামী লীগে পদ দেওয়ার আগে বিগত দিনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও অবস্থান যাচাই বাছাই করার কড়া নির্দেশনা ছিল দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের। খোদ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। দলে অনুপ্রবেশকারীদের স্থান না দিতেও ছিল নির্দেশনা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে মীর সোহেল আলীর পদ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

তবে, মীর সোহেল আলীর দাবি, তিনি তার মামার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর কথা শোনার পর আওয়ামী লীগের প্রতি তিনি অনুরিক্ত হন। কিন্তু বুঝে উঠতে পারেননি কোন দল করবেন। সেসময় না বুঝে বিএনপিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু দলীয় ভাবে তার কোনো পদপদবী ছিলো না। নামকাওয়াস্তে তিনি এই দলটির মধ্যে ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা একটি বক্তব্যে জানিয়েছেন ২০০৯ সাল থেকে যারা আওয়ামী লীগে এসেছে তারা পদপদবী পাবে। তারপরও এসব কথা যারা বলছেন, তারা সাংসদ শামীম ওসমানের বিপরীত পন্থী লোক। আমাকে নিয়ে অপরাজনীতি হচ্ছে।

সূত্র বলছে, মুন্সিগঞ্জ থেকে ফতুল্লায় আসার পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ে মীর সোহেলের বাবা মীর মোজাম্মেল আলী গ্রাম সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় থেকেই মীর সোহেল তার ছোট ভাই ফয়সাল, ফুফাতো ভাই হারুন অর রশিদ আরিফ ওরফে বাঘা আরিফ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিগত ১৯৯৫ সালে ফতুল্লা থানা ছাত্রদলের আহবায়ক নির্বাচিত হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেন মীর সোহেল। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফতুল্লা থেকে বাস যোগে মিছিল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ডিআইটিতে বিএনপির এক মিটিং যাওয়ার পথে চাষাড়া সান্ত¦না মার্কেটের সামনে যুবলীগ নেতা পারভেজ ভূঁইয়া ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মীর সোহেলকে বাস থেকে নামিয়ে মারধর করে। এ ঘটনার কিছুদিন পর মীর সোহেলের ছোট বোন জামাতা টিপু সুলতানের মধ্যস্থতায় ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় শামীম ওসমানের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সুবিধা বুঝে তৎকালীন সাংসদ কবরীর বলয়ে চলে যান মীর সোহেল। তার বাবা মীর মোজাম্মেল আলী নিজে সাংসদ কবরীর হাতে মীর সোহেলকে তুলে দেন। সাংসদ কবরীর বলয়ে চলে যাওয়ার পর ফতুল্লার দাপা ঘাট এলাকার অবস্থিত কেরানীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা রশিদ ও কাশেমের ঘাট এবং দোকান দখল করে নেয়। এ ঘটনায় মীর সোহেল ফতুল্লা থানা যুলীগের সভাপতি পদ থেকে সাময়িক বহিস্কার হয়েছিলেন বলে সূত্র জানায়।

এদিকে সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন মীর সোহেল আলী। পাশে দাঁড়ানো সেসময়কার বিএনপির মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া। এমন একটি ছবি বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ পায়। আর এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। অনেকেই বলছেন, ছাত্রদল থেকে এসে যুবলীগের সভাপতি এবং বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগে সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ তিনি কীভাবে পান, একজন অনুপ্রবেশকারী হিসেবে এটা কোনো ভাবেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না।

তবে, মীর সোহেল আলী বলেন, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সম্মানিত লোক। তাদেরকে যে কেউ ফুল দিতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়। আমি অপরাজনীতির শিকার। শামীম ওসমানের কর্মী হওয়ার কারণে তার বিপক্ষের লোকজন আমাকে নিয়ে এমন নোংরা খেলা খেলছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারী দলের সাইনবোর্ড ও ক্ষমতার দাপটে মীর সোহেল এখন ফতুল্লার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হিসাবে পরিচিত লাভ করেছে। তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। ফতুল্লা মডেল থানার পাশে একটি অফিস তৈরি করে সেখানে বসেই সকল সেক্টর নিয়ন্ত্রন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমান নিজ সংসদীয় আসনের আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে সংযত হয়ে রাজনীতি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি স্পষ্ট বলেছেন, দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি কোন ধরনের অপকর্ম করে তাহলে ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করা হবে তেমনি আইনও তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যা করার প্রয়োজন তাই করা হবে। আমি কেন, দলও কোনো অপকর্মকারীর ব্যাপারে দায়িত্ব নিবে না। আমাদের একটি বিষয় খেয়াল করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন সুশাসন কায়েম করতে চান। কারণ উন্নয়ন তো হচ্ছেই, সেটা হবেই। এখন মানুষ চায় সুশাসন। তাহলেই দেশে পুরোপুরি শান্তি বিরাজ করবে।

তিনি আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সে কারণেই আগে নিজ ঘরে, নিজ দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারাও পার পায়নি। কোন দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না, হবেও না। এ বার্তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। এটা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে প্রধানমন্ত্রী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন দল করে অবৈধ আর বেআইনী কাজ করলে ছাড় পাওয়া যাবে না।

২০ নভেম্বর, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে