NarayanganjToday

শিরোনাম

বক্তাবলীর গণকবরটি সরকারি ভাবে বধ্যভূমি ঘোষণার দাবি


বক্তাবলীর গণকবরটি সরকারি ভাবে বধ্যভূমি ঘোষণার দাবি

২৯ নভেম্বর। প্রচণ্ড শীত। ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন পুরো এলাকা। নদী বেষ্টিত হওয়ায় কুয়াশা ছিল অনেক বেশি। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় যে বক্তাবলী পরগনা ছিলো হানাদারমুক্ত, নিরাপদ, সেখানে রাজাকার আলবদরদের সহযোগিতায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আক্রমন।

তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। অপ্রস্তু মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। মুন্সিগঞ্জ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল বক্তাবলীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এসে যোগ দেয়। চার ঘণ্টার সম্মুখ যুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হয় হানাদার বাহিনী।

তবে, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারলেও রাজাকার ও আল বদরদের সহযোগিতায় পুরো বক্তাবলী পরহনার ২২টি গ্রামের ১৩৯ জন নারী-পুরুষ-শিশুদের ধরে এনে নদীর পাড়ে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে নিষ্ঠুর এক হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে পাকিস্তানী মিলিটারীরা। কিছু লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় আর লক্ষ্মিনগর গ্রামে একটি লাশের স্তুপ রেখে ফিরে যায় হানাদার বাহিনী। তবে, ফিরে যেতে যেতে এক এক করে ২২টি গ্রামের বাড়ি-ঘর বাড়িঘর গান পাউডার দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে যায় তারা।

স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে যখন বাংলাদেশ। স্বাধীনতার লাল সবুজের ঝান্ডা হাতে যখন ৭ কোটি বাঙালি উচ্ছ্বাসে মাতবে। ঠিক এর ১৭ দিন আগে নিষ্ঠুর ওই হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এমন হত্যাযজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধে দ্বিতীয় আর ঘটেনি।

এরপর থেকেই এই দিনটিকে ‘বক্তাবলী গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই এই দিনটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য বেদনাবিধুর। প্রতিবছরই এই দিবসকে স্বজন হারানোর ব্যথা ও কষ্ট নিয়েও শ্রদ্ধায় পালিত করেন বক্তাবলীর মানুষ। থাকে সরকারি বেসরকারি ও রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনের নানা আয়োজন।

বক্তাবলীর সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রহিম জানান, বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে এসে থাকতেন। এ খবর রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের জানিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে এসে ২৯ নভেম্বর তারা এখানে হামলা চালায়।

তৎকালীন ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন রিজভী জানান, তারা মুজিব বাহিনীর অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করে বক্তাবলী ও এর আশপাশ গ্রামে অবস্থান নেন। ওই সময়ে বক্তাবলী গ্রামে এক থেকে দেড়শ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এলাকাটিকে নিরাপদ মনে করতো মুক্তিযোদ্ধারা। বক্তাবলীতে অবস্থান করেই মূলত মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন করার পরিকল্পনা করতো। ওই এলাকাতে তখন কমান্ডার ছিলেন বিএনপির সাবেক এমপি প্রয়াত সিরাজুল ইসলাম। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুল ইসলাম, বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর আজহার হোসেন, আবদুর রব, মাহফুজুর রহমান, স ম নূরুল ইসলামসহ অনেকে।

এদিকে পাকিস্তানিদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার ১৩৯ জন। তাদের দেওয়া হয় গণকবর। দীর্ঘদিন ধরেই এই গণকবরটিকে সরকারি ভাবে বধ্যভূমি ঘোষণা করার দাবি তুলে আসছেন মুক্তিযোদ্ধারা। সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবে এবং অতিদ্রুত তা বাস্তবায়ন করবেন বলে আশা করছেন বক্তাবলীর মানুষ।

২৯ নভেম্বর, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে