NarayanganjToday

শিরোনাম

মুরুব্বীর দয়ায় পতিতা পল্লীর আইয়ূবের পেটে বন্ধনের কোটি কোটি টাকা


মুরুব্বীর দয়ায় পতিতা পল্লীর আইয়ূবের পেটে বন্ধনের কোটি কোটি টাকা

আইয়ূব আলী যিনি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জু রুটে চলাচলকারী বন্ধন পরিবহনের এমডি। এর আগে তার পরিচয় ছিলো বিলুপ্ত পতিতা পল্লীর বাড়ির মালিক ফিরোজের ক্যাশিয়ার। পতিতা পল্লী থেকে টাকা উঠানো ছিলো তার একমাত্র কাজ।

সেই আইয়ূব আলী অদৃশ্য এক ক্ষমতা বলে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে জিম্মি করে রেখেছিলেন বন্ধন পরিবহন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তার করে এই পাঁচ বছরে তিনি সাধারণ বাস মালিকদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা, এমন অভিযোগ তার কাছে জিম্মি থাকা বন্ধন পরিবহনের প্রায় ৪০ জন মালিক।

সম্প্রতি এই আইয়ূব আলীর কাছ থেকে বন্ধন পরিবহনের এক মাসের হিসেব বাবদ ৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ফেরত চেয়ে মালিকদের পক্ষ থেকে একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে। এমনকি অসহায় বাস মালিকেরা আইয়ূবসহ তার দোসরদের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে সরণাপন্ন হয়েছিলো প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের সহধর্মীনি পারভীন ওসমানের।

সূত্র জানায়, ২৯ নভেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে শহরের গলাচিপা কলেজ রোড এলাকায় বন্ধন পরিবহনের ভুক্তভোগি প্রায় সব মালিকই উপস্থিত হন। সেখানে আইয়ূব আলীকেও ডেকে নেওয়া হয়েছিলো। তবে, এক সপ্তাহের সময় তাকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, বন্ধন পরিবহনের কথিত এমডি আইয়ূব আলী সেদিন নাসিম নিজের কীতকর্মের জন্য প্রয়াত ওই সাংসদের স্ত্রীর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসেন এবং নিজেকে শুধরে নিবেন বলেও কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস মালিকেরা তাকে আর এমডি হিসেবে চান না জানালে, পারভীন ওসমান আইয়ূব আলীকে বলে দেন, ‘তোমাকে তো তারা কেউ চায় না। তাহলে তুমি কীভাবে থাকবে? এক সপ্তাহ সময় নাও। দেখো মালিকরা যদি তোমায় চায় তবেই তুমি থাকবে নয়তো জোর করে থাকার অধিকার তো কারো নেই।’

এদিকে একাধিক বন্ধন পরিবহনের মালিকদের সাথে কথা বললে জানা যায়, বিগত পাঁচ বছর ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার প্রভাবে বন্ধন পরিবহন জিম্মি করে রাখেন আইয়ূব আলী। আর এই পাঁচ বছর তার হুকুমের এদিক সেদিক কখনোই হতে পারেনি। তার করে দেওয়া নিয়মই শেষ কথা। এর বাইরে যদি কোনো মালিক যেতেন তার গাড়ি চলতে দেওয়া হতো না। ফলে, বাধ্য হয়ে মালিক পক্ষ তার নির্দেশ, আদেশ মেনে নিতে বাধ্য হতেন।

সূত্র জানায়, আইয়ূব আলী যখন নিয়ন্ত্রন করতেন সেসময় একেকজন মালিক নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা অথবা ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে একবার আসার জন্য পেতে সর্বোচ্চ সাড়ে ৬শ টাকা। তখন হিমাচল, মৌমিতাসহ অন্যান্য কোম্পানীও ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে এই রুটে আরও কয়েকটি কোম্পানীর বাস চলাচল করার পরেও এক সিঙ্গেলের জন্য গাড়ি মালিকেরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা করে। সে হিসেবে বন্ধন মালিকদের বিগত পাঁচ বছরে জিম্মি করে কয়েক কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন আইয়ূব আলী। ফুলে ফেঁপে তিনি হয়েছেন অঢেল ধন সম্পদের মালিক। অর্থের প্রভাবে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম সাইফউল্লাহ বাদলের বৌদলতে কাশিপুর ইউনিয়ন কমিটির কোথাও তিনি না থাকলেও হয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।

৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকার চিঠি প্রসঙ্গে আইয়ূব আলীর দাবি, “বন্ধন চালায় এখন দেলু আর আকরাম প্রধান। এই টাকা নিছে তারা। ধার হিসেবে নিয়েছে। আমি এই টাকা কেন দিতে যাবো?”

পারভীন ওসমানের কাছে বাস মালিক ও তার যাওয়া প্রসঙ্গে তার দাবি, “তিনি (পারভীন ওসমান) অনেক সময়ই ডাকেন। সেদিনও ডেকেছেন।” তবে, এদিন বন্ধন সম্পর্কে ডেকেছিলেন এবং আপনি তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন জানালে, এ নিয়ে তিনি আর কথা বলেননি।

আইয়ূব আলী বলেন, “আমি কোনো প্রভাব বিস্তার করি নাই। বন্ধন পরিবহন আমার নামে। আমি এটির এমডি। কেউ বলতে পারবে না কোনো নেতার নাম ব্যবহার করে জোর খাটিয়েছে।”

এদিকে কথিত আছে থানা আওয়ামী লীগের মরুব্বী খ্য্যাত এক নেতার আশীর্বাদেই একসময়কার পতিতা পল্লীর ফিরোজের ভাড়া উঠানো আইয়ূব আলী কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বন্ধনের এমডিসহ ভূমিদস্যুতা করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন। এরমধ্যে অধিকাংশ টাকাই রয়েছে বন্ধন পরিবহনের সাধারণ বাস মালিকদের রক্তচুষে নেওয়া।

স্থানীয়রা বলছেন, আইয়ূব আলীর অর্থবিত্তের উৎসহ সন্ধান করলেই এর নেপথ্যের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। একই সাথে পাওয়া যাবে, এই বন্ধন পরিবহনের টাকার একটি বিরাট অংশ তিনি কাকে তুলে দিতেন, সেই মুরুব্বীর সন্ধানও।

তবে, আইয়ূব আলী বলেন, “আমি পতিতাপল্লীর ভেতরে কখনো যাইনি। তবে ফিরোজের বেতনভূক্ত লোক হিসেবে পতিতা পল্লীর বাইরে অফিসে বসে টাকা সংগ্রহ করতাম। এরপর আমি ৫ নং ঘাটে সারের ব্যবসা করেছি। যদিও সে ব্যবসায় ৯৮ সালের বন্যায় সম্পূর্ণ পুঁজি হারাই। এরপর গাড়ির ব্যবসা করি। আমি চারটি বন্ধন বাসের মালিক।”

এদিকে বন্ধন বাসের অসংখ্য মালিক জানান, তিনি নানা খাতের খরচ দেখাতেন, এই ভাই, ওই ভাইকে টাকা দিতে হয়, পুলিশ-সাংবাদিকদের টাকা দিতে হয় বলে অনেক টাকা খরচ দেখাতেন। এসব তিনি করতেন মিলন ও ল্যাপটপ দেলুর মাধ্যমে। এছাড়া আইয়ূব আলী এক সিঙ্গেলের জন্য সাড়ে ৬শ টাকা দিতেন আমাদের। কিন্তু এখন তিনি নেই আমাদের কোনো খরচও নেই। আমরা মালিকেরা সিঙ্গেল প্রতি এক হাজার টাকা করে পাচ্ছি। আর এতেই বোঝা যায় তিনি আমার রক্তচুষে বছর বছর কোটি কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন এখান থেকে।

আইয়ূব আলী বলেন, “যখন যা ইনকাম হয়েছে তাই দিয়েছি। আমারও তো গাড়ি আছে। কই আমিতো এক হাজার টাকা করে পাই না। এসব মিথ্যা বলছে। এতদিন আপনারা লিখেন নাই কেন, এখন কেন লিখছেন? এসব ষড়যন্ত্র।”

তবে, আপনি কত করে পাচ্ছেন সিঙ্গেল প্রতি, “আইয়ূব আলীর কাছে এমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৮শ টাকার বেশি পাচ্ছি না। আমি কোনো লুটপাট করি নাই। আমার কাছে ডকুমেন্ট আছে। ক্যাশিয়ারের কাছে টাকা থাকতো। আমার কাছে কোনো টাকা থাকতো না। তার কাছে জানতে পারেন। সে বড় প্রমাণ। আপনি (প্রতিবেদক) চাইলে আপনার অফিসেও এসেও সব ডকুমেন্ট দিয়ে যেতে পারি।” তবে, ডকুমেন্ট দিয়ে যেতে বললে এই প্রতিবেদকের হাতে আইয়ূব আলী দীর্ঘ চার ঘণ্টাও কোনো ডকুমেন্ট পৌঁছাতে পারেননি।

প্রসঙ্গত, টানবাজার ও নিমতলী পতিতা পল্লী দুটি উচ্ছেদ চালান সেসময়কার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। ওই সময় এর প্রতিবাদ জানিয়ে শামীম ওসমানের কুশপুত্তলিকাও দাহ করেছিলেন আইয়ূব আলী। তারপরও তিনি গঠনতন্ত্রের নিয়মাবলির বাইরে এসে হয়ে উঠেন কাশিপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর সেটি সম্ভব হয়েছে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির কল্যানে। কথিত আছে, বাদলের শেল্টারেই বন্ধন পরিবহন জিম্মি করে রেখেছিলেন আইয়ূব আলী।

২ ডিসেম্বর, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে