NarayanganjToday

শিরোনাম

কখন যে তার বিয়ের বয়স পেরিয়েছে তা তিনি নিজেই জানেননি


কখন যে তার বিয়ের বয়স পেরিয়েছে তা তিনি নিজেই জানেননি

”বয়স তার ৪৮ পেরিয়ে ৪৯ ছুঁই ছুই’। এ বয়সে যে কেউ স্বামী, সন্তান, ছেলে-মেয়ে, নাতী, নাতনি নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে বয়সে তাকে পিঠা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।

৪৮ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো বিয়ে হয় নি তার। বলা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জে রূপগঞ্জ উপজেলার গন্ধর্বপুর এলাকার মৃত আক্কাস আলীর মেয়ে মনোয়ারা আক্তারের কথা। এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর নির্মমতা বুঝে উঠার আগে মনোয়ারা আক্তার তার মাকে হারায়। মায়ের মৃত্যুর পর ৬ বছর বয়সে বাবা আক্কাস আলীও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায় পরপারে। মা-বাবাকে হারানো পর যখন আত্মীয় স্বজনরাও যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল তখন মনোয়ারা বেগম পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা হারে হারে টের পান। যখন অবহেলা অনাহারে দিন কাটছিল তার তখন বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করা শুরু করেন।

মানুষের বাড়িতে কাজ করতে গিয়েও তাকে সহ্য করতে হয়েছে নানা বঞ্চনা। কখনো কখনো এক বেলা খেলে দুই বেলাই না খেয়ে দিন কাটতো তার। তখন অবহেলা অনাদরে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে বড় হতে থাকেন তিনি। জীবন যুদ্ধে অংশ নেয়া মনোয়ারা আক্তার মানুষের বাড়িতে কাজ করতে করতে ভুলে গিয়েছিলেন যে তার বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে। অভিভাবকহীন একটি মেয়ের যখন তার স্বামীর ঘরে থাকার কথা ছিল তখন তাকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে সময় কাটতো। জীবনের চড়াই উৎরাই পার করতে করতে পেরিয়ে গেছে ৪৮ টি বছর। বর্তমানে মনোয়ারা আক্তার পিঠা বিক্রি করেই তার জীবন পরিচালনা করছে।

কথায় আছে, অভাগা বুঝে অভাগার দুঃখ। তাই মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করেও তার দূর সম্পর্কের এক বোনের ছেলে রজব আলীকে সে বহু কষ্টে করে লালন পালন করে বড় করে তোলেন। অভাবের সংসারে রজব আলীকে লেখাপড়া করাতে না পারলেও নিজে না খেয়ে তার মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতেন।

রজব আলী বিয়ের করেছেন কয়েক বছর আগে। মনোয়ারা আক্তার এখন রজব অলীর সঙ্গেই থাকেন। রজব আলী এলাকাতেই মাটি কাটাঁর কাজ করে সংসার চালায়। রজব আলীর স্বল্প আয়ে সংসার ভালভাবে চলে না। তাই সংসারে সহযোগিতা করার জন্য মনোয়ারা আক্তার পিঠা বিক্রি শুরু করেন। বাঁশ ও প্লাস্টিকের কাগজের সমন্বয়ে একটি ছোট ঘর তৈরী করে তাতে সারাবছরই পিঠা বিক্রি করেন তিনি। তবে, সারা বছর পিঠা কম চললেও শীতের মৌসমে পিঠার চাহিদা বেড়ে যায়। সারাবছর শুধু চিতৈ পিঠা তৈরী করলেও শীতকালে ভাঁপা পিঠাসহ নানা রকমারি পিঠা তৈরী করেন তিনি। দূর দূরান্ত থেকে তার হাতের পিঠা খেতে ছুটে আসেন পিঠা প্রেমীরা।

সরেজমিনে মনোয়ারা আক্তার পিঠের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, যখন পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ে। তখন মনোয়ারা আক্তার তার দোকানে পিঠার বানানোর নানা রকম পসরা সাজিয়ে পিঠা বানাতে শুরু করেন। তার হাতের বানানো চিতৈয় পিঠা, ভাপা পিঠা, পিয়াজু, বেগুনি, ছোলা খেতে গন্ধর্বপুর, রূপসী, মুড়াপাড়াসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন ছুটে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভীড় লক্ষ্য করা যায় যুবক বয়সী ছেলেদের। তার দোকানের পিঠা গুলোর দাম ৫ টাকা থেকে শুরু করে ২০ টাকা। এছাড়াও মনোয়ারা আক্তার ডিম দিয়ে খুব মজাদার পিঠে তৈরী করে যা ক্রেতাদের এখানে আসতে বেশী আকৃষ্ট করে।

আল-আমিন নামে এক ক্রেতা জানান, তিনি রূপসী এলাকা থেকে এখানে পিঠা খেতে আসেন। সারা বছর অন্য কোথায় পিঠা পাওয়া না গেলেও এখানে আসলে তিনি পিঠা পান। তাই প্রায়ই সময়ই বন্ধুদের নিয়ে চলে আসেন পিঠা খেতে। মনোয়ারা আক্তার তার দোকানে চিতৈ পিঠা, ভাপা পিঠা, ডিম পিঠা তৈরী করে থাকেন।

মনোয়ারা আক্তার জানান, জীবনে তাকে নিষ্ঠুরতার, বঞ্চনা ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে। জীবনে তাকে অনেক চরাই উৎরাই পার করতে হয়েছে। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর তাকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছে। অভিভাবকহীন হয়ে যাওয়ায় তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না। যে বয়সে মনোয়ারা আক্তারের কোমল হাতে দিয়ে বই নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া কথা ছিল সে বয়সে তাকে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে কাটাতে হতো। বাবা মা থাকলে হয়তো তাকে দেখেশুনে বিয়ে সুপাত্রের কাছে তুলে দিতে পারতো। কোনো অভিভাবক না থাকায় তার বিয়ের কথা কেউ ভাবে নি। ছোটবেলা থেকেই মনোয়ারা আক্তার ভালভাবে কানে শুনেন না। তার কানের চিকিৎসা করা অনেক টাকার প্রয়োজন। কানের চিকিৎসার ডাক্তার দেখিয়েছেন কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেন, পিঠা বিক্রি করে তিন বেলা খাবারই জোটে না আবার চিকিৎসা করামো। এতো টেহা কই থেকা পামো। মনোয়ারা আক্তার আরো বলেন, সারাজীবন কষ্টই করছি সুখের মুখ দেহা অইলো না। ছোড থেইকা মাইনষের বাড়িত কাজ করছি। জীবনে তো আর বিয়া অইলো না। শুনছি সরকারি নাকি অনেক গরীব মাইনষেরে ফ্রি চিকিৎসা করায়। আমিও কি পামো তাইলে ফ্রি চিকিৎসা। এছাড়া স্বল্প পুজির কারনে মনোয়ারা আক্তার পিঠা বিক্রির দোকানকে বড় করতে পারছে না। বৃষ্টি এলেই তার দোকানটি ভেঙ্গে যায়। তিনি যদি সরকারিভাবে কোন সহযোগীতা পেত তাহলে সে তার পিঠার দোকানটিকে ভালভাবে করতে পারতো।

স্থানীয় কাউন্সিল রফিকুল ইসলাম মনির জানান, মনোয়ারা আক্তারকে পৌরসভা থেকে সরকারিভাবে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগীতা করা হয়। ভবিশ্যতে পৌরসভায় গরীব দুস্থ্যদের জন্য সরকারি কোন অনুদান এলে মনোয়ারা আক্তার অবশ্যই পাবেন। 

২৫ নভেম্বর, ২০১৮/এসপি/এনটি

উপরে