NarayanganjToday

শিরোনাম

কুতুবপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মীরুর আমলনামা


কুতুবপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মীরুর আমলনামা

মীর হোসেন মীরু ফতুল্লার কতুবপুর এলাকার এক আতঙ্কের নাম। অনেকের কাছে এই মীরু এক মূর্তমান আতঙ্ক হিসেবেই পরিচিত। তাঁর রয়েছে একটি প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে থেকে শুরু করে ভূমিদস্যুতা ও মাদক ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণকর্তা সে।

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা হিসেবেই পরিচিত মীর হোসেন মীরু। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। এরমধ্যে হত্যা, বিস্ফোরক, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক মামলা অন্যতম। ফতুল্লা থানা পুলিশের তালিকাভূক্ত একজন সন্ত্রাসী এই মীরু রয়েছেন এই তালিকার টপ টেনে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এতো অপকর্মে পরও মীর হোসেন মীরুসহ তাঁর সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী কীভাবে সুরক্ষিত থাকে?

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পক্ষাঘাতে আক্রান্ত মীরু হুইল চেয়ারে বসেই গত ৮ বছরের অধিক সময় পাগলা, রসূলপুরসহ আশপাশের এলাকার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তাঁর মাথার উপর ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রেখেছে বলেই সে সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েম করে যেতে পারছে।

মীরু বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে পরিচিত ভাগিনা শাকিল। অনেকের কাছে ছোট শাকিল হিসেবেও পারিচিত। মূলত মীরুর নির্দেশে এই ভাগিনা শাকিল মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েম করে। কখনো মীরুও বিভিন্ন সংঘর্ষে যোগ দিয়ে গোলাগুলিতে অংশ নেয়, জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।

স্থানীয়রা জানায়, মীর হোসেন মীরু এলাকাবাসীর কাছে শামীম ওসমানের অনুসারি হিসেবে পরিচিত এবং ওই এলাকার মৃত নূর মোহাম্মদের ছেলে। এছাড়াও সে কুতুবপুর ইউনিয়ণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক।

পঙ্গুত্ব¡ বরণ করায় অনেকেই তাঁকে সহমর্মিতার চোখে দেখলেও এর আড়ালে যে মীর হোসেন মীরু কতটা ভয়ঙ্কর একজন সন্ত্রাসী তা একমাত্র স্থানীয় এলাকাবাসীই ভালো করে জানেন। আর জানেন তাঁর হাতে নৃশংসতার শিকার অসংখ্য পরিবারগুলো। পুলিশের খাতায়ও এই মীরু একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী হিসেবেই বেশ পরিচিত।

রসূলপুর এলাকার সন্ত্রাসী জগতের ‘গডফাদার’ তোফাজ্জল সিকদারের একনিষ্ঠ সহযোগি ছিলো মীরু। তোফাজ্জলের বিরুদ্ধে ১৫টি হত্যাসহ সর্বমোট ২০টি মামলা ছিলো। আততায়ীদের গুলিতে সে নিহত হলে এলাকার অপরাধ জগতের একক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে সন্ত্রাসী মীর হোসেন মীরুর কাছে। তবে একই বাহিনীর অপর সন্ত্রাসী সজল বাবুর্চিও এলাকার নিয়ন্ত্রন নিতে মরিয়া হয়ে ওঠলে দুই গ্রুপের মধ্যে প্রকাশ্যেই বন্দুকযুদ্ধ হয়।

সময়টা ছিলো ২০০৯। সন্ত্রাসী তোফাজ্জলের মৃত্যুর পর এলাকার আধিপত্য বজায় রাখতে মুখোমুখি মীরু ও সজল বাবুর্চি বাহিনী। চলে তুমুল গোলাগুলি। এই গোলাগুলি চলাকালে একটা সময় বাবুর্চি বাহিনীর আক্রমণে পিছু হটতে শুরু করে মীরু বাহিনী। দলবল নিয়ে গুলি করতে করতে পালিয়ে যাওয়ার সময় নিজের কাছে থাকা পিস্তলের গুলিতেই সে আহত হলে পরে পুঙ্গত্ববরণ করে নিতে হয় তাঁকে।

অনেকেই ভেবেছিলো এরপর হয়তো ভালো হয়ে যাবে সে। কিন্তু কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। মীরুর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং সন্ত্রাসী সজল বাবুর্চি ওই সংঘর্ষের পর থেকে নিখোঁজ হয়। যার হদিস আজও মিলেনি। স্থানীয় অনেকেরই ধারণা, মীরু বাহিনী হয়তো সজলকে হত্যার পর গুম করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সজলের সন্ধান বের করতে তেমন কোনো তৎপরতা দেখায়নি। ফলে বাবুর্চি সজলের নিখোঁজের বিষয়টি রহস্যই থেকে গেছে।

স্থানীয়রা জানায়, সন্ত্রাসী মীরুসহ তাঁর বাহিনীর অপরাধ কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কেউ কখনো যদি কোনো প্রতিবাদ করে তবে, তাঁর উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতনে খড়গ। প্রতিবাদকারীকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে, কুপিয়ে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিতো। কখনো কখনো খুনের ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বশেষ সন্ত্রাসী মীর হোসেন মীরুকে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গ্রেফতার করেছিলো ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। এর আগের দিন রাতে পাগলা রেলষ্টেশন এলাকায় ৪ যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত ও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার ঘটনায় দায়ের করা মামলা তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, এদিন রাতে পাগলা বউ বাজার এলাকার ইউছুফ বেপারীর ছেলে ইমরান হোসেনের বাসায় তার বন্ধু সোহেল, মাসুম, শামীম ও মুরাদ বেড়াতে আসে। রাত সাড়ে ৮টায় তাদের বাড়ি থেকে নিজ নিজ বাড়িতে যাওয়ার পথে পাগলা রেলষ্টেশনের কাছে মীর হোসেন মীরু লোকজন নিয়ে তাদের ৪জনের পথরোধ করে। এসময় মীরুর নির্দেশে তার সহযোগীরা ইমরান হোসেনের ৪ বন্ধুকে মারধর করে এবং চাপাতি দিয়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। এসময় আশপাশের লোকজন ছুটে আসলে সন্ত্রাসী ভাগিনা শাকিল কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যায়। এঘটনায় ইমরান হোসেন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

একই বছরের ৩ মার্চে মীরু বাহিনীর এক সদস্য হত্যা মামলার আসামীকে গ্রেফতার করে দারুণ বিপাকে পড়েছিলো ফতুল্লা থানা পুলিশ। এদিন মীরু বাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে সেই সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। যদিও এতে ব্যর্থ হয়েছিলো তাঁরা। এখানেই শেষ নয়, এ বছর আরও একটি হত্যাকা- ঘটায় সন্ত্রাসী মীরু বাহিনী।

সূত্র জানায়, এ বছর ১০ ফেব্রুয়ারি শাহী বাজার এলাকায় ডিস ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ হলে ডিস ক্যাবল কর্মচারী শাজাহান নামে একজনকে প্রকাশ্যেই কুপিয়ে হত্যা করে মীরু বাহিনী। এ সংঘর্ষে আরও ৬ জনকে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহতও করে তাঁরা। এসময় বেশ কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটনানো হয়। এ ঘটনায় ডিস ক্যাবল ব্যবসায়ী মনির হোসেন মীরুকে প্রধান আসামী করে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

এ হত্যাকা-ের আগে অর্থাৎ এ মাসের ৫ তারিখে মীরু বাহিনীর ৩ সন্ত্রাসীকে অস্ত্র, গুলি ও এক হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনা পুলিশ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানা অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি এবং সালাউদ্দিন হাওলাদার নামে এক ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনে আরও একটি মামলা করে। পৃথক

এছাড়াও ২০১২ সালের ৩ নভেম্বর রাতে নিজ বাসা থেকে মীরু এবং তার সহযোগী ইকবালকে ৫ রাউন্ড গুলিভর্তি একটি পিস্তল ও ১৩ পিস ইয়াবা সহ গ্রেফতার করে র‌্যাব-১০। এঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে আস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দু’টি মামলা হয়।

এর আগের বছর ২০১৩ সালের ১৪ অক্টোবর এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মীরু ও তাঁর ক্যাডাররা ভাঙ্গাপুল এলাকায় গিয়ে জাকের পার্টি নেতা হোসেনের বাড়ির সামনে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং ফাঁকা গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

শুধু তাই নয়, ভয়ঙ্কর এই সন্ত্রাসীর মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে এলাকাবাসী একটি মিছিল করেছিলো ২০১৪ সালে। এই মিছিলে অংশ নেয়ার অপরাধে এই বছরের ২৮ এপ্রিল রাতে স্থানীয় দুই সহোদর আব্দুর রহমান ও সজলকে শাহী বাজার এলাকার একটি দোকান থেকে তুলে নিয়ে যায় মীরু বাহিনী। পরে তাঁদের এলোপাথাড়ি কুপিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সড়কের পাশে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় মীরু ও তাঁর বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সহোদর ভাইয়ের মা শাহনাজ বেগম একটি মামলা দায়ের করেন।

এখানেই এ ঘটনার শেষ নয়। মামলা করেও বিপাকে পড়েন শাহনাজ বেগমের পরিবার। কারণ মামলাটি তুলে নিতে মীরু তাঁর শ্যালক আরিফ, শরিফ ও রিয়াজ, রাজিব সহ ১৫-২০ জনের একটি দল ওই বছরের ১২ মে রাত ১২টায় আব্দুর রহমান ও সজলদের বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায় এবং বাড়ির ভেতরে কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় আরও একটি মামলা দায়ের হয় মীরু ও তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে।

শুধু কি তাই? মীরুর নির্দেশে মাদক ব্যবসা করতে রাজি না হওয়ার কারণে নূরুল হক নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগও রয়েছে মীরুর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ১০ জুন। নূরুল হককে মাদক ব্যবসায় বাধ্য করতে চেয়েছিলো মীরুসহ তাঁর বাহিনী। কিন্তু এতে রাজি হয়নি সে। এরপরও নূরুল হককে তাঁর মায়ের সামনেই ঘর থেকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এই সন্ত্রাসী বাহিনী। এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। মামলার প্রধান আসামী ছিলো মীর হোসেন মীরু।

একই বছরের ১৯ মার্চ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোর অভিযোগে এক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী মীরুসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর দুদনি আগে এক এএসসি পরীক্ষার্থীকে ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় এলাকাবাসীর উপর হামলা চালায় মীরু বাহিনী। এ হামলায় ২০ জন নিরীহ এলাকাবাসী আহত হয়।

স্থানীয় পর্যায় খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, মীর হোসেন মীরু ওরফে ল্যাংড়া মীরু বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে স্থানীয় দুলালের ছেলে ভাগিনা শাকিল, রসুলপুরের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সুমন, শান্ত, হৃদয় আহমদ রাশেদ, আবুল পাটোয়ারীর ছেলে কালা জাহাঙ্গীর, ইউসুফের ছেলে কালা ইমরান, নুরু সর্দারে ছেলে আলমগীর, রবু মাতবরের ছেলে হাবিব, আবু তাহেরের ছেলে মমিন, আমিন, জামাল মৃধার ছেলে স্টিকার বাবু, মনিরের ছেলে ইকবাল, বিডিআরের ছেলে সজিব, বাশার, রসুলপুর আটবাড়ির হাফিজ উল্লাহর ছেলে ওমর ফারুক।

এ প্রসঙ্গে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) শাহ মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদের বলেন, “সন্ত্রাসী যে দলের হোক, যত প্রভাবশালীই হোকে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। মীরু গ্রেফতার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।”

২০ জানুয়ারি, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে