NarayanganjToday

শিরোনাম

ওদের কয়েকজনের কাছে কুতুবপুরের প্রায় ৩ লাখ মানুষ জিম্মি!


ওদের কয়েকজনের কাছে কুতুবপুরের প্রায় ৩ লাখ মানুষ জিম্মি!
মীরু, খালেক, আলাউদ্দিন, টেনু, চুন্নু ও মালেক

মেছের ও তোফাজ্জল, যাদের নাম শুনলেই হৃদকম্প শুরু হতো কুতুবপুরবাসীর তারা এখন ইতিহাস। কিন্তু ভয় এবং আতঙ্কে এখানকার মানুষের হৃদকম্পন এখনও হয়। কুতুবপুরকে বলা হয়ে থাকে, সন্ত্রাসীদের জনপদ। কালের বিবর্তনে মেছের তোফাজ্জলদের মতো ডাকসাইডেট সন্ত্রাসীরা হারিয়ে গেলেও এদের উত্তরসূরিরা এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই অঞ্চলটি।

সূত্র বলছে, থানা থেকে কুতুবপুরের দূরত্ব এবং এই অঞ্চলের রাস্তাঘাটের দুরাবস্থার কারণে পুলিশ পৌঁছাতেও অনেকটা সময় লেগে যায়। তাছাড়া পুলিশের টহল এই অঞ্চলে বৃদ্ধি করা হলেও ফলপ্রসূ তেমন কোনো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা, ভৌগলিকভাবে ফতুল্লা থানার অন্তর্ভূক্ত এই কুতুবপুর ইউনিয়ণটি অন্যান্য ইউনিয়ণের তুলনায় বেশ বড় এবং লোক সংখ্যাও অনেক। ১০ দশমিক ১০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে কুতুপুর ইউনিয়ণ পরিষদটি গঠিত। এখানে ১৯টি গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৩ লক্ষ প্রায়।

স্থানীয়দের মতে, এ যাবৎকালে যে সরকারই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে সেই সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরাই কুতুবপুরকে অশান্ত করে তুলেছেন সন্ত্রাসা, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতাসহ বানিয়েছে মাদকের অভয়ারণ্য। এখানকার অধিকাংশ বাড়ির মালিকই নারায়ণগঞ্জের বাইরের হওয়াতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তোলাও সম্ভব হয়ে উঠেনি এখনও পর্যন্ত।

আবার সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাসীন হওয়ার কারণে নানা কিসিমের নেতাদের কারণে সেভাবে জোড়ালো প্রদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারেনি। আর এসব কারণেই সরকারের পর সরকার পরিবর্তন হলেও এই অঞ্চলটি শান্তির, স্বস্তির পথ হিসেবে এখনও গড়ে উঠেনি। একদল সন্ত্রাসীদের বিদায় হয়তো আরেক দল সন্ত্রাসীরা এসে ঘাঁটি গাড়ে। চলে নানা অপকর্ম ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়।

সম্প্রতি এই অঞ্চলের মূর্তমান আতঙ্ক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মীর হোসেন মীরু এক ব্যবসায়ীর দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হয়েছে। এই মীরু পক্ষঘাতগ্রস্থ হলেও সে হুইল চেয়ারে বসেই সন্ত্রাসের রামজত্ব কায়েম করেন তার নিজস্ব বাহিনী দ্বারা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং ভূমিদস্যুতাসহ সকল অপরাধ কর্মকা-ই সংঘঠিত হয় মীরুর শস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে।

এই মীরু ফতুল্লা থানার তালিকাভূক্ত ১০ নম্বর সন্ত্রাসী। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করায় কিছুটা হলে স্বস্তিবোধ করছেন কুতুবপুরের আপামর জনতা। তবে, সেই সাথে তারা এ-ও আক্ষেপ করছেন যে, হত্যাসহ প্রায় ১৯টির মতো মামলার আসামী মীরু। কখনো তাকে কারাগারে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতাসীনদের ক্যারিশমায় জামিনে বের হয়ে এলাকায় ফিরে আসেন স্বরূপে। এবারও এর ব্যত্যয় হবে বলে মনে করেন না তারা।

এদিকে প্রায় ১১ বর্গমাইলের এই কুতুবপুর যে কেবল মীর হোসেন মীরুর জন্যই অশান্ত হয়ে থাকে তা কিন্তু নয়। এই কুতুবপুরে আরও বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু এবং মাদক কারবারিও রয়েছে। তাদের সাথে সাথে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন আরও কেউ কেউ। এসব সন্ত্রাসীরা নিজ নিজ বাহিনী দ্বারা এই অঞ্চলের একেকদিক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই তালিকায় মীরুর পরেই যাদের নাম আসে তারা হলেন খালেক ও মালেক।

এই খালেক ও মালেক দুই ভাই কদমতলী থানা এলাকার সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাস করে থাকেন। একদিকে কদমতলী অন্যদিকে শ্যামপুর খুব সহজেই তাদের অবস্থান থেকে যাওয়া এবং আসা করা যায়। ক্ষমতাসীন দলের যুবলীগের রাজনীতির সাথে এরা সম্পৃক্ত রয়েছে। তাদেরও রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। এই বাহিনী দ্বারা মাদক ব্যবসা, জমি দখল, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজির মতো ঘটনাও ঘটে থাকে।

এছাড়াও নীরব চাঁদাবাজ হিসেবে এই অঞ্চলের আরও রয়েছে কুতুবপুর ইউনিয়ণের দুই নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আলাউদ্দিন হাওয়ালদার। তিনি মূলত এই অঞ্চলে ভূমিদস্যু হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। সাবেক সাংসদ সারাহ বেগম কবরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই তার উত্থান। বর্তমান সাংসদের লোক হিসেবে তিনি সর্বত্র পরিচয় দিয়ে থাকেন। এছাড়াও কথিত রয়েছে, তার ছত্রছায়ায় এই অঞ্চলে অনেকেই মাদকের ব্যবসা করে থাকে।

এদিকে আলাউদ্দিন হাওলাদারের সাথে নতুন করে সম্পৃক্ত হয়ে শাহ আলম গাজী টেনু নামে আরেকজন। তিনি পাগলা বাজার সমবায় সমিতির সভাপতি। হাট, ঘাটসহ নীরব চাঁদাবাজির মতো বিভিন্ন অপরাধে তিনি সম্পৃক্ত। গেল কোরবানির ঈদে এই টেনু ও আলাউদ্দিন ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় তালতলা এলাকার হাটটি ডাক নেন। এখানে তারা তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা জোরপূর্বক গরু নামিয়ে রাখা এবং ব্যবসায়ীদের মারধর করে ব্যাপক আলোচনায় আসে।

পুলিশের ব্যবহৃত ওয়াকিটকি নিয়ে তাদের বাহিনীর লোকজন নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে গরু বোঝাই ট্রলার জোর করে নিজেদের ঘাটে নামিয়ে রাখে। প্রতিবাদ বা আপত্তি জানালেই বেপারীদের মারধর করা হতো। এমন অভিযোগ ফতুল্লা মডেল থানার ওসি শাহ মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদির নিজেই অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতে আলাউদ্দিন ও টেনু উভয়েই দৌড়ে পালিয়ে বাচে সেবার।

অপরদিকে, এদের বাইরেও এই কুতুবপুর অঞ্চলের লামাপাড়া নয়ামাটি এলাকার আরেক সন্ত্রাসী মোফাজ্জল হোসেন চুন্নু। তিনি নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসেবেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় রয়েছে অসংখ্য মামলা। মাদক ও অস্ত্রসহ একাধিকবার র‌্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হয়েছিলো এই সন্ত্রাসী।

চুন্নুর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, ঝুট সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যুতা ও চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসীর বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তার নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। এই বাহিনী অনেকেই ইতোপূর্বে অস্ত্র ও মাদকসহ আটকও হয়েছিলো। ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এই সন্ত্রাসী এখন লামাপাড়া এলাকার মূর্তমান আতঙ্কের নাম।

এলাকাবাসীর দাবি, এসব সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে প্রচলিত আইনের আওতায় শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে কুতুবপুর কখনোই শান্তির জনপদে রূপান্তরিত হবে না। তবে, মীর হোসেন মীরুর মতো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করায় এখানকার মানুষ অন্ধকারেও আশার আলো দেখছে। তারা বলছেন, বর্তমান পুলিশ সুপার যেসব দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন তা যদি তিনি অব্যহত রাখেন তবে, কুতুবপুরও হয়ে উঠতে পারে সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত একটি সুন্দর অঞ্চল।

উপরে