NarayanganjToday

শিরোনাম

এই টেনু সেই টেনু


এই টেনু সেই টেনু

শাহ আলম গাজী টেনু যিনি সাবেক এমপি সারাহ বেগম কবরীর লোক হিসেবে ব্যাপক বিতর্কিত ছিলেন পাগলা কুতুবপুর এলাকায়। সেসময় এই সারাহ বেগম কবরীর বিশ্বস্ত লোক হিসেবে অত্র এলাকায় দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন টেনু গাজী ও ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আলাউদ্দিন হাওলাদার।

সূত্র মতে, ওই সময় এই দুই জনের নেতৃত্বে বর্তমান সাংসদ তথা ওইসময়কার সাবেক সাংসদ শামীম ওসমান ঘনিষ্ঠদের উপর নানা ধরণের অন্যায় জোরজুলুম করতে দ্বিধা করতেন না টেনু ও আলাউদ্দিন। এলাকায় ভূমিদস্যুতা থেকে শুরু করে হেন কোনো কাজ নেই যা তাদের বাহিনীর লোক সেসময় করেননি। এমনকি প্রকাশ্যেই শামীম ওসমানের বিরোধীতা করে বিভিন্ন সময় কবরীর উপস্থিতিতে বক্তব্যও রেখেছিলেন তারা।

তবে, পোশাক বদল করার মতো সময়ের সাথে সাথেই তারা নিজেদের বদলে শামীম ওসমান বলয়ে ফিরে আসেন। এরমধ্যে টেনু গাজী নিজেকে সর্বত্র শামীম ওসমানের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। যদিও পাগলা বাজার সমবায় সমিতির সভাপতি তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন সারাহ বেগম কবরীর বদৌলতে।

এদিকে টেনু গাজী সম্পর্কে জানগে গেলে জানা যায়, কুরবানির হাট ইজারা থেকে শুরু করে নানা অপরাধ ও অন্যায় কর্মকা-েই জড়িত রয়েছেন তিনি। খোদ নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) নূরে আলমও সর্বশেষ (৭ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছেন, টেনু গাজীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তারমধ্যে ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসায়ীদের শেল্টার দেওয়া, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় মানুষদের উপর নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে। তাকে এদিন ডিবি পুলিশ সংখ্যালঘু পরিবারের তিন ভাইকে চাঁদার দাবিতে মারধর করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সাবেক এমপি সারাহ বেগম কবরীর আমলে তার বেশ আস্থাভাজন ছিলেন শাহ আলম গাজী টেনু। আওয়ামী লীগের কোনো পদপদবীতে না থাকলেও তাকে সর্বপ্রথম রাজনীতির মাঠে দেখা যায় কবরীর সাথে।

বর্তমানে তিনি নিজেকে শামীম ওসমানের বন্ধু বলে পরিচয় দেয় সর্বত্র। এমকি তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনে দাবিও করেছিলেন যে, সাংসদ শামীম ওসমান তাকে ‘কুতুপুরের এমপি’ হিসেবে ঘোষনা দিয়ে এসেছেন। তবে, সাংসদ শামীম ওসমান এমন কোনো ঘোষণা কোথাও দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে সে খবর নেই, স্থানীয়রাও তা জানাতে পারেননি। ফলে শামীম ওসমান ভক্ত নেতাকর্মীদের মতে, টেনু গাজী সাংসদের নাম বিক্রি করছেন এবং কবরীর ছায়াস্বসরূপ সাংসদকে বিতর্ক করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

জানা গেছে, পাগলা বাজার থেকে শুরু করে রেললাইন পর্যন্ত শাখা রোডে চলাচল রত ভাড়ি যান বাহন থেকে চাঁদা উত্তোলন হয় টেনুর নেতৃত্বে। এতে টেনুর ছোট ভাই সাহেদ আলী গাজী বাবুর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন, ওই মহলটির পক্ষ থেকে চাঁদা উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত একাধিক ব্যক্তিরা।

সূত্র জানায়, পাগলা এলাকার অসংখ্য গার্মেন্টস ও মিল ফ্যাক্টরীর গাড়িগুলোর একমাত্র চলারপথ হচ্ছে পাগলা বাজার থেকে পাগলা রেললাইন মুখি শাখা রোডটি। দৈনিক অসংখ্য যান বাহন চলাচল করে থাকে ওই সড়ক দিয়েই। আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে প্রতিটি যান বাহন থেকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা উত্তোলন করা হয় টেনুর বলয়ে। ভুলক্রমে কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই তার উপর চলে নির্যাতনের খড়গ।

শুধু তাই নয়, পাগলা বাজার এলাকায় ফুটপাতের প্রতিটি হকারের কাছ থেকে টেনুর নামে উত্তোলণ করা হয় নিয়মিত চাঁদা। দৈনিক প্রায় হাজারেরও ঊর্ধ্বে দোকান থেকে নির্দিষ্ট হারে চাদা উত্তোলন করা হয়। এর মূল হোতা খোদ টেনু গাজী হলেও তা নিয়ন্ত্রণে করেন তার ভাই বাবু ও সহযোগি বাচ্চু।

সূত্র আরো জানায়, গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরদিনই কুতুবপুরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মীর হোসেন মীরু ও টেনু গাজী উভয়ের নেতৃত্বে পাগলার ব্যাটারী চালিত ইজিবাইক এর স্ট্যান্ড দখল তথা ওই সেক্টরের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে তান্ডব চালায় একদল সন্ত্রাসী। সংবাদ পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি এসএম মঞ্জুর কাদেরের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে চাঁদাবাজদের বিতারিত করেন। এতে করে ইজিবাইক থেকে চাঁদাবাজির সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায় তাদের।

যদিও এদের দ্বারা পুনরায় ইজিবাইক সেক্টরে চাঁদাবাজির আশঙ্কা করছেন ইজিবাইক চালকেরা।

বৃহস্পতিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পাগলা এলাকায় টেনু গাজীকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসা, স্থানীয়দের নির্যাতন ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) নূরে আলম।

একইদিন সন্ধ্যায় প্যারাগন নামে একটি মাল্টি পারপাসের সিইও কাজল কুমার রায়, সিইও এর বড় ভাই বিধান কৃষ্ণ রায় এবং সিইও এর মেঝ ভাই বিপ্লব চন্দ্র রায়কে ৫ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে তুলে নিয়ে মারধর করে আহত করে। খবর পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ পাগলা বাজার এলাকা থেকে টেনু বাহিনীর হাত থেকে তাদেরকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় প্যারাগন মাল্টিপারপাসের চেয়ারম্যান রাজধানীর সবুজবাগ থানার ৬৪/এ মধ্য মাদারটেকের বাসিন্দা মৃত ফজলুল হকের ছেলে শাহজাহান ফতুল্লা মডেল থানায় উপস্থিত হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এ মামলায় টেনু গাজীকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে, মামলার দ্বিতীয় প্রধান আসামী বাচ্চু এখনও রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) শাহ মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদের জানান, দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।

ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (অপারেশন) মজিবুর রহমান জানান, টেনু গাজীর বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। প্যারাগন মাল্টিপারপাসের চেয়ারম্যান রাজধানীর সবুজবাগ থানার ৬৪/এ মধ্য মাদারটেকের বাসিন্দা মৃত ফজলুল হকের ছেলে শাহজাহান বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন।

ভুক্তভোগি বিধান জানান, তার ছোট ভাই প্যারাগন নামে একটি মাল্টিপারপাস চালান। শাহ আলম গাজী টেনু আমাদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে ব্যবস্থা করতে পারবো না বলেও তিনি হুমকি দেন। আমরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি তার বাহিনী দিয়ে আমাদেরকে ধরে নিয়ে যান এবং মারধর করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় থানা মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধিন।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বেশ কিছু গণমাধ্যমে পাগলা বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি শাহ আলম গাজী টেনুর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। সেসব সংবাদে টেনুর নানা অপকর্ম উঠে আসে। তবে এসব সংবাদকে তিনি মিথ্যা দাবি করে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেকে স্থানীয় সাংসদের বন্ধু দাবি করেন এবং নিজেকে কুতুবপুরের এমপি হিসেবে জাহির করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি অত্যন্ত ভদ্র ও ন্যায় পরায়ন একজন মানুষ। তার বিরুদ্ধে কোনো ধরণের অভিযোগ কোথাও নেই।

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে