NarayanganjToday

শিরোনাম

বই কমিশনের টাকায় আইইটি সরকারি স্কুল শিক্ষকদের পিকনিক


বই কমিশনের টাকায় আইইটি সরকারি স্কুল শিক্ষকদের পিকনিক

বই বাণিজ্যের টাকায় এবার পিকনিক সারছে আইইটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। একটি প্রকাশনির দু’টি বই এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের কিনতে উৎসাহিত করায় প্রকাশনি থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়। আর এই টাকা দিয়েই ১০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক ও তাদের পরিবারের ১৪৩ জন যাচ্ছেন পিকনিকে।

সূত্র জানায়, এডভান্স পাবলিকেসন্স নামে একটি প্রকাশনির প্রতিনিধি রবিউল ইসলাম তাদের প্রকাশনি বাংলা ও ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলটির অন্তর্ভূক্ত করার প্রস্তাব দেন। এ জন্য তিনি ১ লাখ টাকা কমিশন দিতে রাজি হন। কিন্তু স্কুলটির শিক্ষকেরা দাবি করেন ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। দর কষাকষির এক পর্যায়ে রাজি হন এবং শিক্ষকদের দাবিকৃত টাকাও পরিশোধ করেন। বিনিময়ে শিক্ষকেরাও নিজ নিজ ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের এডভান্স প্রকাশনীর বই কিনতে বলে দেন।

জানা গেছে, স্কুলটির সহকারি শিক্ষক মতিউর রহমান, আলমগীর এবং খলিলুর রহমান এই বই বাণিজ্যের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন। এডভান্স প্রতিনিধি রবিউল ইসলাম একটি খামে করে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা স্কুলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক মতিউর রহমানের হাতে বুঝিয়ে দেন। এবং এই টাকা প্রকাশ্যেই গুণে বুঝে নেন শিক্ষকেরা। রবিউলের প্রদানকৃত টাকার মধ্যে এক হাজার ও পাঁচশ টাকার নোট ছিলো বলে জানিয়েছেন খোদ রবিউল ইসলাম।

তবে, স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেলিনা আক্তার প্রথমে ব্যাপারটি অস্বীকার করেন। একই সাথে মতিউর রহমানও অস্বীকার করেন এবং জানান তারা রবিউল ইসলাম নামে কাউকে জানেনই না। আর পিকনিকে যাচ্ছেন তারা নিজ নিজ চাঁদা দিয়ে।

তবে, মজার বিষয় হচ্ছে, পিকনিকে যাবার চাঁদা কত করে দিয়েছেন জানতে চাইলে একেকজন শিক্ষক এই হারটা একেক রকম বলেন। কারো সাথে কারো মিল নেই।

এডভান্স প্রকাশনীর প্রতিনিধি রবিউল ইসলাম দাবি করেন, “আমি স্কুলে গিয়ে টাকাটা নিজ হাতে দিয়েছি মতিউর রহমান স্যারের কাছে। এসময় কালো করে আরেকজন স্যার বসা ছিলেন। টাকা দিয়ে আমি আলমগীর স্যারকে জানিয়েছি। পরে মতিউর রহমান স্যারেরা টাকাটা স্কুলে বসেই গুণে নেন।”

আইইটি স্কুলের সহকারি শিক্ষক মতিউর রহমান বলেন, “এটা মিথ্যা কথা। রবিউল নামে কাউকে চিনি না। কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। পিকনিকে আমরা নিজ খরচেই যাচ্ছি।”

স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেলিনা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে এডভান্স প্রকাশনীর প্রতিনিধি রবিউল ইসলামের স্বীকারোক্তিমূলক রেকর্ডিং শোনালে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান এবং সংবাদটি না করার জন্য অনুনয় বিননয় করতে শুরু করেন।

এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি এখানকার লোকাল একজন মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে এই স্কুলে আছি। সংবাদটি প্রকাশ করলে আমার মান সম্মান থাকবে না। দয়া করে সংবাদটি করবেন না। আপনার সাথে খলিলুর রহমান নামে একজন শিক্ষক দেখা করবেন।”

পরবর্তীতে খলিলুর রহমান নামে একজন ভদ্রলোক এই প্রতিবেদককে ফোন করেন এবং তার সাথে সাক্ষাতের জন্য স্কুলে যেতে বলেন। কিন্তু এই প্রতিবেদক স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, “স্কুলে কেন যাবো? সেখানেতো কাজ নেই। বরং আপনার দরকার হলে অফিসে আসুন। আমরা আপনাদের অফিসিয়াল বক্তব্য চাচ্ছি।” পরে অপরপ্রান্ত থেকে ফোন লাইনটি কেটে দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, “সকারি নির্দেশনার বাইরে কোনো বই কেনার কোনো সুযোগ নেই। যদি এরকম করে থাকে তাহলে ব্যাপারটি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সনের শিক্ষাবর্ষে আইইটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সরকারি পাঠ্য পুস্তক ছাড়াও আরো দুটি বই কিনতে ছাত্রদের বাধ্য করছেন শিক্ষকরা। ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণীর সকল ছাত্রকে অ্যাডভান্সড পাবলিকেশনস এর বাংলা ও ইংরেজি ২য় পত্রের দুটি বই কিনতে স্কুল থেকে বলা হয়েছে। স্কুল থেকে যেই বুক লিস্ট দেয়া হয়েছে তাতে এই দুটি বইয়ের কোন নাম নেই।

শ্রেণী শিক্ষকরা নিজ নিজ ক্লাস বোর্ডে এ দুটি বইয়ের নাম উঠিয়ে তা লিখে নেয়ার জন্য ছাত্রদর বলেছেন। বই দুটির দাম ক্লাস ভেদে একেক রকম। আর এ জন্য সেই প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে শিক্ষকরা নগদ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। সেই টাকায় রোববার সকাল ৮টার দিকে নরসিংদীর পাঁচদোনা এলাকায় অবস্থিত ড্রিম হলিডে পার্কে পিকনিক সফরে যাবেন শিক্ষক পরিবার। ইতিমধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোড হতে ঢাকা চলাচলকারী নীলাচল পরিবহনের ৩টি বাস ভাড়া নেয়া হয়েছে। পিকনিকের সমস্ত বাজারও সেরেছেন স্কুলের শিক্ষক জামাল হোসেন।

শনিবার নগরীর খাজা সুপার মার্কেটের মমতা লাইব্রেরীতে গিয়ে আইইটির স্কুলের বই চাইতেই বিক্রেতা সেলিম পাটোয়ারী জিজ্ঞেস করেন, কোন ক্লাসের বই। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বলা হলে, তিনি ইংরেজি ২য় পত্রের অ্যাডভান্সড পাবলিকেশনের ২টি বই দেখান। এর একটি হলো, অ্যাডভান্সড লারনার'স কমিউনিকেটিভ ইংলিশ গ্রামার এন্ড কম্পোজিশেন। যার মূল্য ৩৯৫ টাকা। অন্যটি হলো, সলিউশেন টু অ্যাডভান্সড লারনার'স কমিউনিকেটিভ ইংলিশ গ্রামার এন্ড কম্পোজিশেন'। এর মূল্য ৬৫ টাকা।

বই বিক্রেতা সেলিম জানান, একেক ক্লাসের বইয়ের দাম একের রকম। ৯ম শ্রেণীর বইয়ের দায় ৯শ' টাকার মতো।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় দুটি। এর একটি নগরীর মাসদাইর এলাকায় অবস্থিত সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত আইইটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এটি মূলত ছেলেদের স্কুল। দুটি স্কুলই ঐতিহ্যবাহী। স্বাধীনতার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ দুটি স্কুল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লেখাপড়ার মানের দিক দিয়ে জেলার মধ্যে এ দুটি স্কুলের ফলাফল অনেকটা ঈর্ষণীয়। তবে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় তাদের সুনাম ধরে রাখতে পারলেও আইইটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।

গত কয়েক বছর ধরে এসএসসি ও জেএসসিতে শতভাগ ফলাফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষাকে বাণিজ্য হিসেবে নেয়ায় এমনটা হচ্ছে বলে অভিজ্ঞ মহলের মত। আইইটি স্কুলে সরকারি নিয়ম বলতে আছে শুধু শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ভাতায়। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা এখানে একেবারে অগ্রাহ্য করা হয়।  

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে