NarayanganjToday

শিরোনাম

যার খুঁটির জোরে লাগমহীন হয়ে উঠে কাউন্সিলর ডিস বাবু


যার খুঁটির জোরে লাগমহীন হয়ে উঠে কাউন্সিলর ডিস বাবু

তার নাম আব্দুল করিম বাবু হলেও সর্বত্র মানুষ তাকে চিনেন ‘ডিস বাবু’ হিসেবে। স্থানীয় পর্যায়ে কারো কারো কাছে ‘মাউড়া বাবু’ হিসেবেও পরিচিত। পাইকপাড়া ১৭ নং ওয়ার্ডের নিতাইগঞ্জ লগোয়া পাইকপাড়ার বাসিন্দা তিনি। এবং ক্ষমতাসিন আওয়ামী লীগের লোক ও ১৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এই বাবু ব্যাপক ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি!

কোথাও কেউ ডিস ব্যবসা করবে! তার কোনো উপায় নেই। ডিস বাবুকে সেলামি (চাঁদা) না দিয়ে ব্যবসা করার ক্ষমতা কারোর নেই। গত একযুগ ধরে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীতে এমনই চিত্র বিরাজমান। প্রশাসনও তার কাছে অসহায়। জেলার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক সাংসদের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে এখনও পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭ টি ওয়ার্ডের মধ্যে সব থেকে বিতর্কিত কাউন্সিলর ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নূর হোসেন। তিনি বর্তমানে কনডেম সেলে ৭ খুন মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহর গুণে চলেছেন। তার অবর্তমানে সিটি করপোরেশনের সর্বাধিক বিতর্কিত কাউন্সিলর হলেন ওই আব্দুল করিম বাবু ওরফে ডিস বাবু।

তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করা থেকে শুরু করে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগসহ জোরজবর দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের অন্ত নেই। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। যার একটিতে গ্রেফতার হওয়া দুই আসামী ১৬৪ ধারা জবানবন্দি দেওয়া একটি মামলার আসামীও সে।

ডিস বাবুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া মানুষের সংখ্যাও শহর ও শহরতলীতে কম নয়। সর্বশেষ ১৮ এপ্রিল বাবুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হাসান নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা একটি চাঁদাবাজির মামলায় সে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।

এছাড়াও বাবুর বিরুদ্ধে সেটআপ বক্সের নামে কোটি টাকা আত্মসাত, বৈধ ব্যবসায়ীদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গ্রাহকদের ভোগান্তি, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা দাবি ও আদায়, বেআইনী ভাবে নদীর নিচ দিয়ে সংযোগ ক্যাবল নেয়া, নিজ ক্যাবল ব্যবসায় ব্যক্তিগত একাধিক চ্যানাল খুলে তাতে অশ্লীল বিজ্ঞাপন প্রচার করা, লাইসেন্সকৃত অস্ত্র নিয়ে জনসম্মুখে ঘুরে বেড়ানো, প্রকাশ্যে গুলি করে ত্রাস সৃষ্টি করা, নাসিক ১৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার এলাকার অনেক নিরিহ ব্যক্তিকে হয়রানি করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত সে।

আব্দুল করিম বাবুর বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৭ সালের ১৭ মে ১৪৩,৪৪৮,৩২৩,৫০৬ ধারায় একটি মামলা দায়ের হয়। যার নং ২৯। একই থানায় ২০১০ সালের ১৩ জুন ৪৪৮,৩২৩,৫০৬ ধারায় আরও একটি মামলা রয়েছে। যার নং ২২। এছড়াও একই থানায় ২০১৩ সালের ১২ জুলাইয়ে দুস্যতার অভিযোগে ৩৯৪ ধারায় আরও একটি মামলা রয়েছে। যার নং ১০। এই মামলায় গ্রেফতার দেলোয়ার হোসেন ওরফে ছোট দেলু ও মো. ঝন্টু এ ঘটনায় বাবুর সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি প্রদান করে।

শুধু তাই নয় রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে দীর্ঘ এক যুগ ধরে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর ডিস ব্যবসার একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠা বাবুর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে অসংখ্য ছোট বড় ডিস ব্যবসায়ীরা। সেটআপ বক্সের নামে একেজন ব্যবসায়ীকে কম করে হলেও ৫০টি সেটআপ বক্স কিনতে বাধ্য করা হয়। অন্যথায় সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় পুরনো ডিস ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দিয়ে নিজের লোক দ্বারা ডিস ব্যবসা দখল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তেমনই একজন ভুক্তভোগি রবিউল ইসলাম জানান, ডিস বাবু শীতলক্ষ্যা নদীর নিচ দিয়ে অবৈধভাবে তার সংযোগ দিয়েছে বন্দরের বশিরউদ্দিন ও জামানকে। তারা দুজনই বাবু বাহিনীর লোক। এ সংযোগ নিয়ে তারা আমাদের তার সংযোগ কেটে দিয়ে নিজেরা ব্যবসা দখল করে নিয়েছে। বাধা দেওয়াতে তারা হামলাসহ মারধরও করে।

শুধু তাই নয়, বন্দরের লক্ষনখোলা এলাকার ডিস বশিরউদ্দিন, নবীগঞ্জ এলাকায় ডিস জামান ও মদনগঞ্জের ফরাজীকান্দা এলাকায় নব্য সন্ত্রাসী সজিবকে ডিস ব্যবসা নিয়ন্ত্রন দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে ডিস বাবু। তারা সবাই এই ডিস বাবু বাহিনীর সক্রিয় সদস্য।

এছাড়া ১৭ নং ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর সালাউদ্দিন দেওয়ান নামে নীরিহ একজন সাবেক ফুটবলারকে পুলিশের সাথে যোগসাজেশ করে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর। এ ঘটনার সংবাদ প্রকাশের পরপরই পুলিশ সুপার অভিযুক্ত এসআই নাজমুল ইসলামকে সদর থানা থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

১৯ জানুয়ারি পাইকপাড়া এলাকার একটি উন্নয়ন কাজ উদ্বোধন করতে যান মেয়র আইভী। উদ্বোধন শেষে তিনি চলে আসলে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই প্রকৌশলীকে গালাগাল করেন আব্দুল করিম বাবু। এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল কাদির। এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়। মূলত এ ঘটনার রেশ ধরেই সালাউদ্দিন দেওয়ানকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে।

এর আগে নগরীতে ফিল্মি স্টাইলে প্রকাশ্যে স্বদলবলে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ব্যাপক তা-ব চালিয়েছিলেন আব্দুল করিম বাবু। এসময় তিনি অন্তত ৬ রাউন্ড গুলি বর্ষণও করেন। ঘটনাটি গেল বছরের ১৩ আগস্ট দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৮ নং ওয়ার্ডের ১৩৩ নং নলুয়া পাড়া এলাকায়।

এছাড়াও গেল বছরের ৯ জানুয়ারি ‘জনতার মুখোমুখি’ হয়ে মেয়র আইভী তার বক্তব্যে আব্দুল করীম বাবুর প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সাথে ১৭ নং ওয়ার্ডে বাবুর পরিবর্তে প্যানেল মেয়র-১ বিভা হাসান সকল কাজ করবেন বলেও ঘোষণা দেন। আর এই বক্তব্যের পর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাবু। তিনি ১৫ জানুয়ারি নগর ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং আইভীকে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে লোক জড়ো করে বিক্ষোভ করেন।

এসব ঘটনার পাশাপাশি জমি দখলসহ আরও নানা ধরণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে, কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ক্ষমতাসীন ওসমান পরিবারের আশির্বাদপুষ্টু হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে সচরাচর মুখ খুলতে কেউ সাহস পায় না। আবার থানায় কখনো কখনো কেউ অভিযোগ দায়ের করতে গেলেও সেসব অভিযোগও নেওয়া হয় না।

সূত্র বলছে, শহরে বসে শহরতলীর ডিস ব্যবসাও সে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়ন্ত্রণের কারণে ফতুল্লার মুসলিমনগর এলাকার মঈনুল হোসেন নামে এক ডিস ব্যবসায়ীকে নানা হয়রানি করে ব্যবসা থেকে চ্যুত করেছে। এর জন্য সে প্রশাসনের আশ্রয় নিয়ে তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলাও দায়ের করিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, একই এলাকায় ডিস ব্যবসা নিয়ে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনার নেপথ্যেও ছিলো এই ডিস বাবু।

১৮ এপ্রিল, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে