NarayanganjToday

শিরোনাম

লক্ষ্মী নারায়ণ গিলে খাচ্ছে জয়নাল, মানছে না আইন-আদালত সরকারও!


লক্ষ্মী নারায়ণ গিলে খাচ্ছে জয়নাল, মানছে না আইন-আদালত সরকারও!

আইন-আদালত, নিয়ম-কানুন, সরকারি নির্দেশনা- কিছুই মানছেন না নীট কনসার্নের মালিক জয়নাল আবেদীন মোল্লা। সিদ্ধিরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিল পুরোটা গিলে খেতে তিনি কোনো নিয়মেরই ধার ধারছেনা।

জয়নাল আবেদীন মোল্লা নিজেই লক্ষী নারায়ণের রাজা সেজে নিজেই জারি করছেন হুকুম। আর সেসব হুকুম তামিল না করলেই অসহায় শেয়ারহোল্ডারদের কপালে নেমে আসছে নির্যাতনের খড়গ। এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগি শেয়ারহোল্ডারদের। তাদের দাবি, আইন-আদালত, সরকারি নির্দেশনা কিছুই মানছেন না ওই শিল্পপতি।

সূত্রমতে, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে অবস্থিত নিউ লক্ষ্মী নারায়ন কটন মিলের ৫১০ জন শেয়ার হোল্ডাদের নামে পুরো মিলটি লিখে দেয় বাংলাদেশ সরকার। এরমধ্যে ৪৫৭ জনের শেয়ার হোল্ডারদের অংশ ইতোমধ্যে গিলে ফেলেছে নীট কনসার্নের মালিক জয়নাল আবেদীন মোল্লা।

শেয়ার হোল্ডারদের দাবি, সরকারের শর্ত ছিলো মিলটির শেয়ার বাইরের কারো কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। তারপরও অস্ত্রের মুখে প্রাননাশের হুমকি দিয়ে ৪৫৭াট শেয়ার জোরপূর্বক কিনে নেয় নীট কনসার্ন কর্তৃপক্ষ। এবার এই ধনকুবের ব্যক্তি হাত বাড়িয়েছেন বাকী ৫৩ শেয়ার হোল্ডারদের দিকে। এ শেয়ারগুলো হাতিয়ে নিতে নতুন করে চক্রান্ত শুরু করেছে।

অবশিষ্ট ৫৩ শেয়ার হোল্ডারদের প্রতিনিধি ও শেয়ার হোল্ডার স্বার্থ রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক  মো. হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি আমাদের শেয়ারগুলো বাগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে কুচক্রী জয়নাল নিজেকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবী করে একটি নোটিশ জারি করে। তাতে বলা হয়েছে ‘১৫ মে ২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ৯৩ তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অদ্য পর্যন্ত যারা শেয়ার হস্তান্তর ও নবায়ন করেন নাই তাদেরকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের সাথে দেখা করার জন্য মিলের ১নং গেটের অফিসে দুপুর ১২ ঘটিকার মধ্যে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাইতেছে’। কিন্তু আমরা শেয়ার হোল্ডারগন নোটিশ মোতাবেক সেখানে হাজির হইনি। কারন যা কিছু ঘটুকনা কেন, আমরা কোন মতেই শেয়ার হস্তান্তর করবো না।

মো. হোসেন আরও বলেন, ২০০১ সালের দলিল মূলে প্রতিষ্ঠানটি ৫১ ভাগ মালিকানা ছিল সরকার এবং বাকী ৪৯ ভাগের মালিকানা ছিল ৫১০ জন শেয়ার হোল্ডারগন।

পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় ১২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ মালিকানা লিখে দেয়া হবে উপরোক্ত শেয়ার হোল্ডারদের। সে মোতাবেক ওই টাকা পরিশোধ করলে ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর সাবকবলা দলিলের মাধ্যমে শেয়ার হোল্ডারদের শতভাগ মালিকানা লিখে দেয়া হয়।  এর আগে বিনিয়োগকারী হিসেবে মিলটির পরিচালনা পর্যদের সাথে চুক্তি হয় জয়নাল আবেদীন মোল্লার। তার কাছ থেকে সেসময় নেওয়া ১২ কোটি টাকা সরকারকে পরিশোধ করে শেয়ার হোল্ডারদের প্রতিনিধি সামসুদ্দিন প্রধানের নামে মিলটি লিখে দেয় সরকার।

ওই দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, ১৭.৯ একরের এই সম্পত্তি কখনো কারো কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। তবে বিনিয়োগকারী নিয়োগ করা যাবে। সে মোতাবেক ২০১২ সালে “নীট কনসার্ন” এর মালিক জয়নাল আবেদিনকে ১২ কোটি টাকার বিনিময়ে বিনিয়োগকারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কুচক্রী জয়নাল পরিচালনা পর্ষদের ১১ জনের স্বাক্ষর দেখিয়ে ৩১ কোটি টাকার বিনিয়োগ দেখায়। যা সম্পূর্ন মিথ্যা ও বানোয়াট।

প্রতারনামূলকভাবে প্রস্তুতকৃত বিনিয়োগের ওই ভাউচারে স্বাক্ষর করেন যথাক্রমে চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন, ভাইস চেয়ারম্যান মো. ইসহাক মিয়া, পরিচালক আ. ওহিম খন্দকার, মো. আক্তার হোসেন, এস এম সাখাওয়াত হোসেন, মো. জাকির হোসেন, আনোয়ারুল হক, মো. গোলাম হোসেন, আব্দুল মান্নান, মো. নুরুল ইসলাম আশিক ও আব্দুল জলিল।

এই জালিয়াতি সংক্রান্তে সাধারণ শেয়ার হোল্ডারগন হাইকোর্টের শরনাপন্ন হলে হাইকোর্ট নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নিরপেক্ষ চেয়ারম্যান করে সব বৈধ শেয়ার হোল্ডারদের উপস্থিতিতে ২০১৩ ও ১৪ সালের বার্ষিক সাধারণ সভা ও নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের নির্দেশ দেন। সে মোতাবেক জেলা প্রশাসক ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল তার কার্যালয়ে সাধারণ সভা ডাকলে জয়নাল ও তার লোকজন শেয়ার হোল্ডারদের প্রশাসকের কার্যালয়েরে সামনেই মারধর করে তাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া মো. হোসেন তার অভিযোগে আরো বলেন, ২০০১ থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত জয়নাল ও সাসুদ্দিন গংরা মিলের প্রায় ৪’শ কোটি টাকার মালামাল নিয়ম বর্হিভূতভাবে বিক্রি করে তা আত্মসাৎ করে ফেলেছে। এই লুটপাটের বিষয়টি উল্লেখ করে ১৫ সালের ২২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরবার তারা স্মারকলিপি পেশ করলে তিনি তার কার্যালয়ে উভয় পক্ষকে ডাকেন। কিন্তু শেয়ার হোল্ডারগন সেখানে যাবার পথে আদালত প্রাঙ্গনে জয়নালের লোকজন তাদের উপর হামলা করে। এর প্রতিবাদে শেয়ার হোল্ডারগন সেখানেই মানববন্ধন করেছিল।

তিনি দাবি করে বলেন, যতগুলো মেশিন বিক্রি করা হয়ে তার সবগুলোই ছিল স্বচল। যার মধ্যে উল্লেখযোগ হচ্ছে ৫২ টি রিম ফ্রেম মেশিন, ৬ টি জাপানী ডডিং, ৩ টি স্লাবিং মেশিন, ১ টি ৪০০ পাউন্ড সুতার ফ্রেম মেশিন, তাঁত মেশিন ৩১০টি, ১৯ হাজার স্পেন্ডেল, দুই কোটি টাকার সুতা কাপড়, এক কোটি টাকার স্টোরের মালামাল, ১ টি তুলা ভাদানো মেশিন, ১ টি ক্যালেন্ডার মেশিন, টি ওয়েল্ডার মেশিন ২ টি, মার্সেলাইজড মেশিন ২ টিসহ আরও অসংখ্য মালামাল ২০০১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত লুটেরা চক্রটি বিক্রি করে। যার সর্বমোট মূল্য ৪‘শ কোটি টাকা।

তারা বলেন, পূর্বে পরিচালনা পর্ষদের সামসুদ্দিন প্রধানসহ অন্যারা শুরুতে এর সাথে জড়িত ছিলো পরবর্তীতে এখানে যুক্ত করা হয় জয়নাল আবেদীন মোল্লাকে। তিনি অন্তত ৩‘শ কোটি টাকার মালামাল এখান থেকে বিক্রি করে নিয়েছেন।

শেয়ার হোল্ডাররা বলেন, ওই প্রতিষ্ঠান বা সম্পত্তিতে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মানে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও সম্প্রতি জয়নাল গংরা একটি ডাইং কারখানা করার লক্ষ্যে নির্মান কাজ শুরু করে। এ ব্যপারে জেলা পুলিশ সুপার মহোদয়কে অবহিত করা হলে তিনি তাৎক্ষনিকভাবে পুলিশ পাঠিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। কিন্তু তারপরদিন থেকে পুনরায় নির্মান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে বিষয়টি পুনরায় পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হলে চলতি রমজানের ২/১ দিন আগে তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে যান। ডেকে নিয়ে তিনি আমাদের বলেন, এটা শিল্প এলাকা হয়ে গেছে সুতরাং আপনারা এখানে থাকতে পারবেন না বেরিয়ে যান। আর যদি ব্যবসা করতে চান তাহলে জয়নালের সাথে মিলে মিশে ব্যবসা করেন।

২৫ মে, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে