NarayanganjToday

শিরোনাম

‘এই মামলা আরও বড় হবে, সব কটাকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো’ (ভিডিও)


‘এই মামলা আরও বড় হবে, সব কটাকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো’ (ভিডিও)

১৭ জুলাই। বুধবার। রাত ৯ টা। ঘটনাস্থল সিদ্ধিরগঞ্জের ওমরপুর। আশপাশের মানুষ শুনতে পেলেন সাইরেন বাজিয়ে একটি গাড়ি আসছে। পুরো এলাকা শব্দে প্রকম্পিত। একটি বাড়ির নিচে এসে কালো রঙ গাড়িটি পার্কিং করে। বাড়িটি প্রবাসী কালু মিয়ার।

ওই গাড়ি থেকে তিনজন নেমে আসেন। একজন সেলিনা ইসলাম, তিনি স্বতন্ত্র কোটায় কুমিল্লার সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি। আরেকজন তার দূরসম্পর্কের খালাতো ভাই ও ব্যক্তিগত সহকারি (পিএস) হাফেজ আহমেদ সোহেল। শেষেরজন আব্দুল হাই। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ দারুস সুন্নাহ মাদরাসার ই.বি প্রধান শিক্ষক। এই তিনি হচ্ছে পিএস সোহেলের চাচা।

আব্দুল হাই বললেন, তার মেয়ে সালমা বেগম কালু মিয়ার চারতলায় ভাড়ায় থাকেন। তার ভাতিজা সোহেল তারই এক বন্ধুর ছোট ভাই চাঁদপুরের হাফেজ আহমেদের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পর থেকে তাদের মধ্যে কোনো বনিবনা হচ্ছিলো না। ফলশ্রুতি এ বিষয়টি তিনি ভাতিজা সোহেলকে জানান। পরবর্তীতে সোহেল নিজে আসবেন বলে চাচা আব্দুল হাইকে জানান। সে মোতাবেক ১৭ জুলাই রাতে পিএস সোহেল আসেন সিদ্ধিরগঞ্জে সাথে আসেন এমপি সেলিনা ইসলাম। তাদের দুজনকে সিদ্ধিরগঞ্জপুল থেকে রিসিভ করেন আব্দুল হাই। পরে ওই গাড়িতে করেই তারা কালু মিয়ার বাড়িতে যান।

আব্দুল হাই জানান, কোনো কিছু বোঝার আগে গাড়ি থেকে নেমেই গালাগালি টিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে সোহেল। তাকা বাধা দিলেও সে শুনেনি। বাড়ির গেট, নিচে থাকা টেবিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ইচ্ছে মতো লাত্থি মারতে থাকে। এরপর মেয়ের জামাই হাফেজ আহমেদের নাম ধরে গালাগাল করতে করতে চারতলাতে উঠে যায় সে সাথে তার এমপি সেলিনা ইসলাম।

তিনি আরও জানান, আমি তাদের সাথে সাথেই উপরে উঠি। চারতলায় যেয়েই সোহেল আমাকে ‘তুই’ সম্বধোন করে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে মেয়ের ঘরে ঢুকেই জামাইকে চড় থাপ্পর মারতে শুরু করে এবং ঘরের ভেতরের টেবিল চাপড়ে চিৎকার করতে থাকে। এসময় তার সাথে আসা ম্যাডাম (এমপি) তাকে ধমক নেন। কিন্তু সে না থামাতে দুটি চড়ও মারেন। এমন পরিস্থিতিতে জামাই হাফেজ আহমেদ ভয় পেয়ে অন্য ঘরে গিয়ে ‘আমাকে বাঁচাও, মেরে ফেলবে ওরা’ এমন শব্দ করে কাঁদতে কাঁদকে চিৎকার শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে নিচ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি উপরে আসে এবং দরজার কর্লিং বেল টিপতে থাকে। দরজা খুললে তারা জানতে চায় ‘কিসের চিৎকার আর কান্নাকাটির শব্দ’। আমি তাদেরকে বলি এটা আমাদের পারিবারিক সমস্যা। তারপরও তারা বিশ্বাস করতে চায় না ঘরে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পর এমপি মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে ডেকে মিটমাট করে দিয়ে নিচে চলে যায়।

আব্দুল হাই বলেন, তারা যখন নিচে নেমে আসেন ততক্ষণে নিচে এলাকার অনেক লোক জড়ো হয়ে যায়। তারা ঘটনা সম্পর্কে কি হয়েছে জানতে চেয়ে চিৎকার করতে থাকলে এমপি বাইরে বের না হয়ে নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে ঢোকে সে রুমটি ভেতর থেকে লক করে দেয়। এমন সময় লোকজন তাদের গাড়ির সামনে দিকের একটি কাঁচ ভেঙে ফেল। পরে খবর পেয়ে কাউন্সিলর সাদরিল এবং তার ব্যক্তিগত সহকারি নাজমুল আসেন। তারা এসে এলাকাবাসীকে শান্ত করেন এবং নাজমুল থানায় ফোন করে বিষয়টি জানালে পুলিশ আসে।

তিনি বলেন, এমপি যে ফ্ল্যাটে ঢোকে আশ্রয় নেন আমি সেটিতে প্রবেশ করি। সামনের রুমটি ফাঁকা ভেতরের রুমে তিনি অবস্থান করছিলেন আর ফোনে কাউকে বলছিলেন এসব জামাত বিএনপির কাজ। তারা এসব করেছে। এখানকার কাউন্সিলর কোথায়, তাকে ডাকো, তাকে ডাকো বলে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে আমি আবার সামনের রুমে আসি, এসেই দেখি কাউন্সিলর সাদরিল এই রুমে। তিনি বিষয়টা কি জানতে আমাকে প্রশ্ন করেন। এরমধ্যেই থানা পুলিশ আসেন। এবং আমাদেরকে ওই রুমে আটকে রেখে এমপিকে বের করে নিয়ে যান। পরে পুলিশ আবারও এসে আমাদেরকে থানায় নিয়ে যায়। সারারাত সেখানে বসিয়ে রেখে আমাকে ছেড়ে দিয়ে কাউন্সিলর সাদরিলসহ সবাইকে আটকে রাখে। আটকদের মধ্যে আমার জামাই হাফেজ আহমেদও ছিলেন।

আব্দুল হাই বলেন, ঘটনার পরদিন আমি আমার ভাতিজা এমপির পিএস সোহেলকে ফোন করি। তাকে বলি, ‘তুমি আসলা মিট করতে আর এখানে পুরা আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেলে। আমাকে সুদ্ধ বিপদে ফেলে গেলে। পুরো এলাকার মানুষ এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।’ এমন বলার পর সে উল্টো আমাকে ধমকে বলে, ‘এই মামলা আরও বড় হবে। ওদের সব কটাকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।’

কাউন্সিলর সাদরিল সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, কাউন্সিলরের এখানে কোনো ধরণের দোষ ছিলো না। সে ঘটনার অনেক পরে আসে। বরং সে আসার কারণে উত্তেজিত মানুষ শান্ত হয়। তা না হলে আরও বড় রকমের কিছু ঘটতে পারতো। এমনকি তার ব্যক্তিগত সহকারি নাজমুল নিজেই থানায় ফোন করে। তারপরও তাদের দুজনকে আটক করা হয়। মামলা দেওয়া হয়। এসব কিছু করছে আমার ভাতিজা পিএস সোহেল। এমপিকে কেউ মারে নাই। সে ভয়ে বাইর হয় নাই। তাকে কেউ অবরুদ্ধও করে নাই। সব কিছু মিথ্যা লেখা হয়েছে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে জানতে সাংসদ সেলিনা ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারি (পিএস) হাফেজ আহমেদ সোহেলের সাথে। তিনি দারোয়ানকে মারধর, অস্ত্রসহ চিৎকার করে বাড়িতে প্রবেশ করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। সোহেলের দাবি, “আমরা বোনের বাসায় যাই। সেখানে বোন জামাইকে বুঝিয়ে নেমে আসি। এরমধ্যে নিচে আসার পরে লোকজন আমাদের উপর হামলা করে।”

হামলা করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওপরে বোন জামাই অযথায় চিৎকার করাতে লোকজন জড়ো হয়। তাই তারা আমাদের উপর হামলা চালিয়ে মারধর করে। পরে আমি গুলশানের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছি।”

এদিকে তার চাচা আব্দুল হাই নিজেই দাবি করেছেন, “তার ভাতিজা সোহেল উপরে উঠার আগে নিচ থেকেই চিৎকার করছিলো। তিনি বাধা দিলেও সে থামেনি। এমনকি উপরে গিয়ে তিনি যখন মেয়ের জামাইকে মারধর করছিলেন তখন এমপি নিজে সোহেলকে থামার জন্য ধমক দেন এবং থামাতে না পেরে দুটি চড় মারেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, চাচা যদি কথা ঘুরিয়ে ফেলেন তাহলে কি করার আছে।”

তাহলে সাংসদ আপনাকে চড় মারলেন কেন, এমন প্রশ্ন করতেই সোহেল বলেন, “তিনি চড় মেরেছিলেন কিনা মনে নেই। আমার মাথা ঠিক ছিলো না। ওই এলাকার লোকজন মাথায় বাড়ি দেওয়ার কারণে কিছু মনে নেই।” কিন্তু এমপি তো আপনাকে চড় দিয়েছেন উপরে। তখন তো আর লোকজন নিচে ছিলো না। তাহলে কীভাবে তখন এলাকাবাসী আপনার মাথায় আঘাত করলেন, এমন প্রশ্ন করতেই তিনি মিটিং আছে জানিয়ে ফোনটি কেটে দেন।

প্রসঙ্গত, সিদ্ধিরগঞ্জের ওমরপুর এলাকার কালু মিয়ার বাড়ির চারতলায় ভাড়া থাকে সেলিনা ইসলামের বোন ও বোন জামাই। তাদের মধ্যে চলমান বিবাদ মেটাতে ১৭ জুলাই রাতে কুমিল্লা থেকে পিএসকে নিয়ে ওমরপুর ছুটে আসেন তিনি। পরে তিনি ফেরার সময় তার ভগ্নিপতি বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুরু করলে এলাকাবাসী ডাকাত পড়েছে ভেবে জড়ো হয় বাড়ির নিচে। তখন স্থানীয়রা দেখতে পান হন্তদন্ত হয়ে সেলিনা ইসলাম ও তার পিএস সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসছেন। তার কোনো অঘটন ঘটিয়েছেন ভেবে এলাকাবাসী উত্তেজিত হয়ে উঠলে এমপির পিএস পিস্তল বের করলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পরে বিক্ষুব্ধ মানুষ এমপির গাড়ি ভাঙচুর করে।

এ ঘটনায় এমপির পিএস সোহেল বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ কাউন্সিলর সাদরিলসহ ১০ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে।

ভিডিও

২০ জুলাই, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে