NarayanganjToday

শিরোনাম

ডিবি পরিচয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পুলিশের টাকা আদায়!


ডিবি পরিচয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পুলিশের টাকা আদায়!

মিঠু নামে এক যুবককে আটক করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদায় করার অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই কামাল হোসেন ও এএসআই মোমেন আলমের বিরুদ্ধে।

৬ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানা এলাকা থেকে মিঠুকে প্রথমে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে আসা হলেও পরে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ৭ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদায় করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে আটক দেখিয়ে ৫২ পিস ইয়াবা দিয়ে মাদক মামলায় চালান করা হয়েছে বলে অভিযোগে পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে।

ঘটনাটি একটু দেরীতে প্রকাশ হলেও এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে, এসআই কামাল এই ঘটনাটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে বলে দাবি করলেও তিনি স্বীকার করেছেন সেদিন তারা গজারিয়া থানা এলাকাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে মিঠুকে নয় একটি ডাকাতি মামলার তদন্তে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বলে নারায়ণগঞ্জ টুডে’র এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন।

মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার তেতৈইতলা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা জাফর আলীর ছেলে মিঠু (২৫)। নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সানারপাড় এলাকার সাত্তারের বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে মামলায় মিঠুকে উল্লেখ করা হলেও এই বাড়ির মালিকের স্ত্রী জানিয়েছেন, মিঠু ও দিলারা নামে কোনো ভাড়াটিয়া তাদের বাড়িতে থাকেন না। তবে, মিঠুকে এই ঠিকানা থেকেই আটক করা হয়ে মামলায় উল্লেখ করে তাকে শনিবার সকালে আদালতে প্রেরণ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের এসআই কামাল হোসেন।

মিঠুর স্ত্রী দিলারা জানান, “র‌্যাব পরিচয়ে আমার স্বামীকে একটি কালো রঙের হাইচ গাড়িতে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমার স্বামী আমাকে কল করে এবং বলেন, ‘আমারে যদি বাঁচাইতে চাও, তাইলে তাড়াতাড়ি ৭ লাখ ট্যাকা জোগার করো। নইলে আমারে মাইরা ফেলানো হইবে।’ তখন আমি জানতে চাই ‘তুমি কই আছো?’ মিঠু আমারে জানায়, ‘এক জায়গায় আছি। কিন্তু চোখ বাঁধা তাই কই আছি জানি না। তুমি ট্যাকার ব্যবস্থা কইরা ফোন দ্যাও, তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করো...।”

তিনি আওর বলেন, “এদিন রাত সাড়ে ১০ টার দিকে আবারও ফোন করা হয়। জানতে চাওয়া হয় টাকার ব্যবস্থা হইসে কিনা। আমি তখন জানাই, পুরা ব্যবস্থা করতে পারি নাই। কিছু পারছি। সব মিলিয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার ট্যাকা।’ এরপরই মিঠুরে থাপ্পর মারা হচ্ছে শুনতে পাচ্ছি। মিঠু কাঁদতে কাঁদতে বলতেছিলো, ‘তুমি কি চাও না আমি বাসায় ফিরে আসি? আমারে বাঁচাও। তুমি তাড়াতাড়ি ট্যাকার ব্যবস্থা করো।’ আমি ২ লাখ ৭০ হাজার ট্যাকার কথাই জানাই।”

দিলারা বলেন, “আমরা পরে ফোন দিই। দিয়া জানতে চাই ‘ট্যাকা লাইয়া কই যামু।’ পরে আমি আর আমার ভাইয়াসহ চারজন কষ্ট করে থানা চিনে সেখানে যাই। সেখানে গাড়ি থেকে নামার পরই এক লোক এসে জানতে চায় আমি মিঠুর বউ কিনা। এই বলেই আমাদেরকে থানার একপা পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং আমার ভাইয়াকে গালিগালাজসহ চড়-থাপ্পর মারা হয়। আমাকেও গালাগালি করাসহ মাদক ব্যবসায়ীর বউ বলে নানা কথা বলতে শুরু করে।”

তিনি বলেন, “পুলিশ আমার ভাইয়ের কাছে জানতে চায় টাকা আনছি কিনা। সে তখন ৫০ হাজার টাকা আনছি বলার পরই তাকে কষে আরও একটা চড় মারা হয়। পরে ভাইয়া বলে ‘হ্যাঁ ট্যাকা আনছি। কিন্তু মিঠু কই। মিঠুরে দ্যান।’ তারা জানায় মিঠু গাড়িতেই আছে। পরে আমাদের গাড়িতে উঠালে সেখানে দেখি মিঠুকে গাড়ির একপাশে চোখ বেঁধে ফেলে রাখছে। কিন্তু তাদের চাহিদা মতো ৭ লাখ ট্যাকা না পাইয়া মিঠুরে চড় থাপ্পর মারা শুরু করে পুলিশ। এবং বলতে থাকে, ‘পুরো টাকা আসে নাই। কি করবি কর। পরে কিছু হইলে বুঝবি। তোর বউ কি বিধাব হইতে চায়? তোরে চালান দিমু না। থানায়ও দিমু না। তোরে সোজা ক্রসফায়ারে দিমু।”

দিলারা জানান, “ভাইয়ার মানিব্যাগ নিছে, খুচরা টাকা পয়সা যা ছিলো সব নিছে। আমার কাছে খুচর আরও এক থেকে দেড় হাজার টাকা ছিলো সেগুলাও নিছে। যারা ছিলো তাদের গায়ে কোনো পুলিশের পোশাক পরা ছিলো না। তাদের পরনে লুঙ্গি, গ্যাঞ্জি পরা। প্রথমে তারা নিজেদেরকে র‌্যাব পরিচয় দেয়। পরে বলে ডিবি পুলিশ। এছাড়া আমাকে বলে ‘সকালের মধ্যে বাকী টাকা নিয়ে আসবি। নইলে স্বামীকে ফিরে পাবি না। লাশ পাবি।’ এই বলে আমাদের বের করে দেয়। সেই সাথে আমাদের মোবাইল চেক করে। দেখে কোনো রেকর্ড আছে কিনা।”

তিনি আরও বলেন, “ভোরের দিকে মিঠু ফোন দিছে। কানতে কানতে জানতে চায়, ‘দিলারা ট্যাকার ব্যবস্থা করতে পারছো? তারা আমারে মাইরা ফেলাইবে।’ পরে একজনের পরামর্শে ডিবি অফিসে যাই। পরে ডিবি পুলিশ নিয়ে থানায় যাই। তারা (পুলিশ) আমাদের দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। গালাগালি করতে শুরু করে। মিঠুকে বিশ্রি গালি দিয়ে বলে, ‘তোর বউকে ট্যাকা বের করতে বল।’ আরেকজন মিঠুকে বলতাছে, ‘মামলাতো খাবি। দেখিস তোর লাইফ কি হয়। ডিবি নিয়া আইছিস?”

দিলার বলেন, “যে পুলিশ রাতে আমার কাছ থেকে টাকা জোর করে নিছে সে বলতাছে, ওই মহিলা, তোমার কাছ থেকে কি আমি ট্যাকা নিছি। মুক্তিপণ চাইছি?’ কিন্তু তারা এরমধ্যে আমারে যতবার ফোন দিছিলো ততবারই তা লাউড স্পিকারে ডিবি পুলিশরে শুনাইছি।”

এদিকে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ টুডে’র কাছে পুরো বিষয়টি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত এসআই কামাল হোসেন। তার দাবি, “এসব সত্য নয় মিথ্যা। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ভাই বুঝছি ফোন ক্যান করছেন। আইসা ভাই দেহা করবোনে। আমরা ভাই ভাই-ই তো। এক সাথে এসে চা খাবো। বেড়াতে আসবোনে ভাই। আজকে ব্যস্ত, কাল আসমুনে।”

পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ টুডে থেকে তাকে জানানো হয়, চা যখন খুশি খেতে পারবেন, সমস্যা নেই। আমাকে জাস্ট বক্তব্য দিন। মিঠুকে আটক কোত্থেকে আটক করেছেন, জানতে চাইলে এসআই কামাল বলেন, “সিদ্ধিরগঞ্জের এনায়েত নগর থেকে তারে ৫২ পিস ইয়াবাসহ আটক করেছি।” কিন্তু গজারিয়া থানা সূত্রে জানা গেছে আপনারা মিঠুকে গজারিয়া থেকে আটক করেছেন, সেটা কি তবে মিথ্যা, এমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা গজারিয়া গিয়েছিলাম একটি ডাকাতি মামলার তদন্তে। মিঠুকে আটক করতে না।” এই বলেই তিনি ফোনটি রেখে দেন।

এদিকে আটক মিঠুর স্ত্রী দিলারার মুখে ডিবি পুলিশের এসআই জলিল মাদবরের নাম উঠে আসায় এ প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি নারায়ণগঞ্জ টুডে’কে বলেন, “আসলে আমার কাছে আসে নাই। আসছিলো ডিবি অফিসে। তখন এনাম স্যার আমাকে পাঠান ফোর্সসহ বিষয়টা কি জানার জন্য। পরে আমরা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় যেয়ে জানতে পারি এসআই কামাল হোসেন মিঠুকে আটক করেছে। তার নামে মামলা হয়েছে। পরে আমরা সেখান থেকে চলে আসি। আর কিছু জানি না।”

অপরদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) কামরুল ফারুক পুরো অভিযেযাগটি মিথ্যা দাবি করে বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী আটক করা হলে তাদের পরিবার নিজেদের নির্দোষ দাবি করেই। মিঠুর বিরুদ্ধে একাধীক মামলা রয়েছে।”

অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-অঞ্চল) মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানান, “মাদকসহ আসামী আটকের বিষয়টি জানি। পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।”

ভিডিও

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে