NarayanganjToday

শিরোনাম

তিনি যেন আরও একজন নূর হোসেন!


তিনি যেন আরও একজন নূর হোসেন!

‘বাপকা বেটা সিপাহীকা ঘোড়া না হোতা তো থোরা থোরা’ এই প্রবাদটির মতোই অবস্থা বলা যেতে পারে নূর আলম খানের। তিনি নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা দাবি করেন। তার পরিচয় তিনি সাত খুনের মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত নূর হোসেনের শ্যালক। তাই অনেকেই ওই প্রবাদটিকে ঘুরি বলেন, ‘দুলাভাইকা শালা’। তিনি এখন নূর হোসেনের মতোই ভয়ঙ্কর এবং মুর্তমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন কাঁচপুর এলাকাবাসীর মাঝে।

সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচুপরে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, বালু ভরাটের কাজের নিয়ন্ত্রণ কর্তা হিসেবে তাকে সবাই জানে। তার অপকর্মও কম নয়। কিন্তু ভয়ে মুখ খোলার সাহস কারো নেই। আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইলকে গুম করার অভিযোগ তার দিকে। এ ঘটনার পর থেকে নূর আলম খানের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলবে, সে সাহস এখনও পর্যন্ত কেউ অর্জন করেনি।

স্থানীয়রা বলছেন, নূর হোসেনের ছত্রচ্ছায়াতেই নূর আলম খানের এই দুর্দান্ত প্রভাব। শিমরাইল মোড়ের অলিখিত সন্ত্রাসের স¤্রাট নূর হোসেনের ভয়ে নূর আলমের অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না পূর্বে। এখনও চলছে একই অবস্থা। এ কারণে অনেকেই বলে থাকেন, মৃত্যুর প্রহর গোণা নূর হোসেনের যোগ্য উত্তরসূরি নূর আলম খান।

স্থানীয়দের মতে, একদিকে দুলাভাই নূর হোসেন অন্যদিকে সরকার দলীয় প্রভাব, এই দুই মিলিয়ে কাঁচপুর এলাকায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছেন কাঁচপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত মুসলিম খানের তৃতীয় ছেলে নূর আলম খান। কথিত রয়েছে, এই অঞ্চলের ‘গডফাদা’ তিনি। তার রয়েছে সুসজ্জিত একটি বাহিনী।

কাঁচপুরের কুতুবপুর এলাকার আজিজুল হক, আব্দুল কাদির, সহিন মিয়া ও রাসেল ওরফে কাইল্লা রাসেল, মনির হোসেন, রাসেল ওরফে সুন্দর রাসেল, লিটন খান, উত্তম কুমার, রফিক মিয়া ওরফে ক্যাশিয়ার রফিক, আরিফ হোসেন, ফয়সাল খানসহ এমন আরও অনেকেই নূর আলম খানের বাহিনীর সদস্য হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত।

২০১৩ সালের ৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইল হোসেন। পরিবারের অভিযোগ, ঝুট ব্যবসা ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নূর আলম খান ভগ্নিপতি নূর হোসেনের মাধ্যমে র‌্যাবকে দিয়ে ইসমাইলকে গুম করিয়েছেন।

এসব অভিযোগ করায় অপহরণ মামলার বাদী ও ইসমাইলের ছোট ভাই আব্দুল মান্নানকে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছেন নূর আলম খান। এ ঘটনায় তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সোনারগাঁ থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।

ডায়েরিতে আব্দুল মান্নান উল্লেখ করেছিলেন, ‘শিল্প-কারখানায় এককভাবে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমার ভাইকে অপহরণ করে ছাত্রলীগ নেতা নূর আলম খান। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। এখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য সন্ত্রাসীরা আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।’

সম্প্রতি এই গুণধর নূর আলম খান গুমের শিকার ইসমাইলের স্ত্রী জোছনা বেগমকেও হুমকি দিয়েছেন। তার দেবরকে দিয়ে মামলা তুলিয়ে না নিলে ইসমাইলের মতোই পরিণতি হবে তার ছেলের। এমন অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কাছে ৯ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন জোছনা বেগম।

ওই অভিযোগ এসপি আমলে নিয়ে সোনারগাঁ থানা পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও নূর আলমের বিরুদ্ধে থানা পুলিশ এখনও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এতে স্থানীয় সচেতন মহল ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সোনারগাঁ থানা পুলিশের সাথে সখ্যতা রয়েছে নূর আলমের। আর অন্যদিকে সন্তান নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জোছনা বেগম।

এদিকে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নূর আলম খানের কাছেই তার দুলাভাই নূর হোসেনের অস্ত্রের ভা-ার রক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও নূর হোসেনে অবৈধ অনেক খাত এখনও তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন নিজ বাহিনী দিয়ে। পুলিশ প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করার সুযোগে সে ধীরে আরও এক নূর হোসেন হয়ে উঠছে। হয়তো আগামীতে সাত খুনের মতো আরও বড় ধরণের কোনো ঘটনার জন্ম এই নূর আলমের মাধ্যমেই সংঘটন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল।

এদিকে ২০১৪ সালের ১ আগস্ট বিকেলে মালিবাগ লেভেলক্রসিংয়ে নূর আলম খানের প্রাইভেট কারটি বাধা উপেক্ষা করে রেললাইনে উঠে পড়লে চট্টলা এক্সপ্রেস সেটিকে ধাক্কা দেয়। এতে গাড়ির চার আরোহী গুরুতর আহত হন। পরে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে গা ঢাকা দেন। এদিকে গাড়ির মধ্যে গুলিসহ পিস্তল উদ্ধারের পর আহত যাত্রীদের খুঁজতে শুরু করে পুলিশ। রাতে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এ আর রহমান আনসার নামের একজনকে পাওয়া যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আনসার জানান, গাড়িটি সাত খুনের আসামি নূর হোসেনের শ্যালক নূর আলম খানের।

এ ব্যাপারে সেসময় ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মজিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘আনসার স্বাভাবিকভাবে কোনো কথা বলতে পারছে না। সে অনেকটাই অসুস্থ। তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নূর আলমকে পাওয়া যায়নি। আমরা নূর আলম খানসহ দুজনকে খুঁজছি।’ তিনি জানান, দুর্ঘটনার ঘটনায় একটি মামলা এবং অবৈধভাবে নূর হোসেনের অস্ত্র বহনের পর উদ্ধারের ঘটনায় আরও একটি মামলা হয়েছে। দুই মামলায় নূর আলম ও আনসারকে আসামি করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ভগ্নিপতির কল্যাণে সোনারগাঁ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন নূর আলম খান। এরপর ভগ্নিপতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এলাকায় একক আধিপত্য গড়ে তোলেন। তার নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে কাঁচপুর-কুতুবপুরের শিল্প কল-কারখানা। এমনকি তার নিজস্ব একটি টর্চার সেলও রয়েছে বলে লোকমুখে শোনা যায়। কাঁচপুর সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে নিজ অফিসের দ্বিতীয় তলাতে বসেই সে তার বাহিনী দ্বারা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

এদিকে এসব বিষয়ে নূর আলম খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি খোলা পাওয়া যায়নি। ফলে তার পক্ষ থেকে কোনো ধরণের বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে