NarayanganjToday

শিরোনাম

পুত্র শোকে পাথর পিতা, গর্ভধারিণীর আহাজারি থামছেই না


পুত্র শোকে পাথর পিতা, গর্ভধারিণীর আহাজারি থামছেই না

আদরের সন্তান হারানোর আহাজারি আর আত্মচিৎকারে আকাশ বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠছিলো। উৎসুক যারা ছিলো তারা নিস্তব্দ এমন গগণ বিদারক মায়ের কান্নায়। পাশেই দাঁড়ানো বাবা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন স্কুল পড়–য়া সন্তান ইফতেখার আহমেদ ওয়াজিদের জন্য।

৪৬ ঘণ্টা পর স্কুল ছাত্রটির লাশ উদ্ধার হয়েছে, এমন সংবাদে হাজারও উৎসুক জনতা ভিড় জমায় এক নং বাবুরাইল মুন্সিবাড়ি এলাকার ধ্বসে যাওয়া এইচএর ম্যানশনের কাছে। দুপুর দুইটার পর শিশুটির লাশ ভবনের নিচে চাপা পড়া অবস্থা থেকে তুলে নিয়ে আসে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। অমনি শুরু হয় দশ মাস দশদিন গর্ভে ধারণ করা মা কাকলী আকাশ মাটি কাঁপিয়ে তোলা হাহাকার ধ্বনি। আদরের ধনকে হারিয়ে বাব রুবেলও যেন অবুঝের মতো করে কাঁদছিলেন পাশে দাঁড়িয়ে।

নিহত ইফতেখার আহমেদ ওয়াজিদ (১২) বেপাড়ি পাড়া এলাকার সানরাইজ স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সে রোববার দুপুরের দিকে ওই ভবনটির নিচ তলার ফ্ল্যাটে আরবি পড়তে গিয়েছিলো।

৩ নভেম্বর বিকেল চারটার দিকে শহরের এক নং বাবুলাইল মুন্সিবাড়ি এলাকার এমএইচ ম্যানশন নামে চার তলা ভবনটি এক পাশে কাৎ হয়ে খালের উপর ধ্বসে পড়ে। ঘটনার পরপর উদ্ধারে নামে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। সেসময় শোয়েব নামে একজন স্কুল ছাত্রকে নিহত এবং তিনজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও ওয়াজিদ নামে অপর এক স্কুল ছাত্র নিখোঁজ ছিলো। পরে ৪৬ ঘণ্টা টানা উদ্ধার অভিযানের পর মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) দুপুর দুইটার দিকে ভবনের নিচে চাপা পড়া অবস্থায় ওয়াজিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারি পরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিন জানান, শিশুটির মাথা একদিকে ছিলো আর পা এলোমেলো ছিলো। এতে বোঝা যায় যখন সে চাপাপড়ে তখন পা দিয়ে জোর খাটিয়ে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু সফল হয়নি। একটি স্লাব ও দেয়ালের মাঝে সে চাপা পড়েছিলো। তার চেহারা একেবারেই পরিবর্তন হয়ে বিকৃত হয়ে গেছে। উদ্ধারের পর শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে স্কুল ছাত্র ইফতেখার আহমেদ ওয়াজিদের লাশ উদ্ধারের পরে তার দাফন কাফনের জন্য তাৎক্ষণিক ভাবে নিহতের পরিবারের হাতে ২০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাহিদা বারিক।

ভবন মালিকের লোভের কারণেই এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করে স্থানীয়রা বলছেন, ভবনটি একটি ডোবার উপর নির্মাণ করা হয়েছিলো। এ ব্যাপারে অনেকবার ভবন মালিককে নিষেধ করা হলেও তিনি তা কর্ণপাত করেননি। এমনকি ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো রকম সয়েল টেস্ট কিংবা রাজউকের অনুমতি এবং পাইলিংও করা হয়নি।

স্থানীয়রা আরও বলছেন, ধ্বসে যাওয়া ভবনটির কোনো রকম ফাউন্ডেশনও ছিলো না। শুরুতে এটি তিন তলা করা হয়। তখন তা ঠিকঠাক মতই ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে যখন চার তলা করার জন্য এর ছাদ ঢালাই করা হলো তখনই এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। পরে ৩ নভেম্বর সেটি ধ্বসে পড়ে।

এদিকে ভবন ধ্বসে স্কুল ছাত্র নিহতের ঘটনায় শোয়েবের মামা রনি বাদী হয়ে মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা করেছেন।

দায়েরকৃত মামলায় আসামী করা হয়েছে ৫ জনকে। তারা হলেন, ভবন মালিক জেবউননেছা এবং তার চার সন্তান আজহারউদ্দিন, বাবু, সুমন শিউলী আক্তার।

তবে, আসামীদের মধ্যে জেবউননেছা আগেই মারা গেছেন। এছাড়া আজহারউদ্দিন, বাবু মালয়েশিয়াতে এবং সুমন ও শিউলি রয়েছেন পলাতক।

মামলা দায়েরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) আসলাম হোসেন। তিনি বলেন, মামলার আসামীদের একজন ভবন মালিক এবং বাকী চারজন তার সন্তান। ভবন মালিক ইতোপূর্বে মারা গেছেন, দুজন প্রাবাসী এবং দুজন পলাতক রয়েছেন।

৫ নভেম্বর, ২০১৯/এসপি/এনটি

উপরে