NarayanganjToday

শিরোনাম

এবার রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে ডিসি-এসপির পাশে রাজাকারপুত্র!


এবার রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে ডিসি-এসপির পাশে রাজাকারপুত্র!

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, ‘রাজাকারপুত্র গোলাম রাব্বানীর ছেলে কাজল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবং রাইফেল ক্লাবের মতো একটি জায়গার সাধারণ সম্পাদক কীভাবে হন?’

একই সাথে তিনি কাজলকে বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে আরও বলেছিলেন, ‘রাজাকারপুত্রকে যেসব অনুষ্ঠান হবে সেসবও বর্জন করা উচিৎ এবং যারা তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করবে, তাদেরকেও বর্জন করা দরকার।’

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় এজিএম চলাকালে ধন্যবাদ প্রস্তাবে খালেদ হায়দার খান কাজলের নাম উত্থাপন করায় এ নিয়ে চরম বিরোধীতা করেন আওয়ামী লীগেরই একাংশের নেতা আনিসুর রহমান দিপু। এ নিয়ে বেশ হট্টগোল হয় সাধারণ সভায়।

তবে, যাকে নিয়ে এত কিছু। যাকে বলা হচ্ছে রাজাকারপুত্র। সেই কাজলকে এবার দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) বিকেলে প্রশাসকের কার্যলয় প্রাঙ্গনে মুজিব শতবর্ষের ক্ষণগণনার অনুষ্ঠানে! অনুষ্ঠানটি দেশব্যাপী একযোগে পালন করা হয় রাষ্ট্রীয় ভাবে।

অনুষ্ঠানের প্রথম সারিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলামের পাশাপাশিই দেখা গেছে খালেদ হায়দার খান কাজলকে।

খালেদ হায়দার খান কাজল শহরের গলাচিপা এলাকার গোলাম রাব্বানি খানের ছেলে। এই গোলাম রাব্বানি খান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন একজন রাজাকার। তিনি শান্তি কমিটির চাষাড়া ইউনিট কমান্ড (ইউসি)। এমন তথ্য সম্বলিত ইতিহাস ভিত্তিক গবেষক মুনতাসির মামুন তার লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ বইতে জানিয়েছিলেন।

এদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে একবার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘কোনো ভাবেই রাজাকার বংশধরদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।’ তার এমন বক্তব্যের পর পরই নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধকালিন রাজাকারের ভূমিকা পালন করা ব্যক্তিদের বংশধরদের নিয়ে শুরু হয় আলোচনা সমালোচনা।

সেই সমালোচনায় তীব্র ভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হন খালেদ হায়দার খান কাজল। শুরু হয় তাকে নিয়ে সমালোচনা। যা সর্বত্র এই সমালোচনার ঢেউ লাগে। কিন্তু এরপরও শত বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী ‘মুজিব শতবর্ষ’ অনুষ্ঠানে কী করে থাকেন রাজাকারপুত্র হিসেবে পরিচিত খালেদ হায়দার খান কাজল, এ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

তবে রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠানে খালেদ হায়দার খান কাজলের উপস্থিতিতে অনেকেই বিব্রত হয়েছেন। তাদের একজন হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, সে কীভাবে একটি রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে থাকে সেটি আমার বোধগম্য নয়। আমরা বারবারই এসব ব্যাপারে বিবৃতি দিয়ে আসছি। তারপরও তাকে কেন দাওয়াত করা হয়, সেটি বুঝি না। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার যেখানে বলছে, রাজাকারদের বংশদরদের পুনর্বাসিত করা যাবে না সেখানে তাকে কীভাবে দাওয়াত করা হলো সেটি ডিসি সাহেবের কাছেই প্রশ্ন রাখা উচিৎ।

অনুষ্ঠানটিতে আপনিও ছিলেন, সে হিসেবে এ দায় আপনি নিজেও এড়াতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি তো আর জানতাম না সে অনুষ্ঠানে আছে। এখন যেয়ে দেখি তাকে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠান। সেটিতো আর ওই মুহূর্তে বয়কট করা সম্ভব হয় না। তবে, এসব বিষয় নিয়ে আমরা বিব্রত হই। সাংবাদিকেরা এসব বিষয়গুলো ভালোভাবে তুলে ধরলে ভালো হয়।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জেলায় যোগদানের পরদিনই সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় বেশ দৃঢ়তার সাথেই বলেছিলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার পরিবারেও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। তাই আমি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, জামায়াত-শিবিরের সাথে কোনো রকম আপস করবো না।’ কিন্তু সেই তাকেও ‘মুজিব শতবর্ষ’ ক্ষণগণনা অনুষ্ঠানে দেখা গেছে রাজাকারপুত্র হিসেবে পরিচিত খালেদ হায়াদার খান কাজলের পাশাপাশি!

তবে, এ বিষয়ে জানতে জেলা পুলিশ সুপারের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও সেটির সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে, এ প্রসঙ্গে তার পক্ষ থেকে কোনো রকম বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন প্রায় সব অনুষ্ঠানেই মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, সেসময়কার ভয়াবহতার চিত্র শিক্ষার্থীর মাঝে তুলে ধরার জন্য শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ জানান। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার জন্য এসব তথ্য তাদের জানা উচিৎ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এমনকি স্কুলে স্কুলে মুক্তিযোদ্ধা কর্নার চালু করার একটা দৃঢ়তা রয়েছে তার মধ্যে। ইতোপূর্বে শিক্ষাখাতে এমন অবদানের জন্য তিনি রাজশাহী বিভাগের শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসকও হয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একজন নিবেদিত প্রাণ হয়েও জেলা প্রশাসক রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠানে রাজাকারপুত্র হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তিকে কী করে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন! এ প্রসঙ্গে জানতে তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সেটি রিসিভ করেননি। ফলে এ ব্যাপারে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

১০ জানুয়ারি, ২০২০/এসপি/এনটি

উপরে