NarayanganjToday

শিরোনাম

কথা বলতে চাইলে জুটতো বৈদ্যুতিক শক, বেতন চাইলে পেত ইস্ত্রিরির ছ্যাঁকা


কথা বলতে চাইলে জুটতো বৈদ্যুতিক শক, বেতন চাইলে পেত ইস্ত্রিরির ছ্যাঁকা

পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন বন্দর উপজেলার ইয়াসমিন আক্তার। দেশটির তাবুক শহরে আব্দুল হাদিস আল আমরি-এর বাসায় (নিয়োকর্তা) উঠেন তিনি। আমরি সৌদি প্রশাসনের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তা।

এক বুক আশা আর চোখজুড়ে স্বপ্ন নিয়েই ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব পাড়ি জমান ইয়াসমিন। পিছনে ফেলে যান পরিবার পরিজন, প্রিয় সব মুখ। কাজ করে সুদিন ফেরানো, পরিবারে স্বচ্ছলতা আর প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্যই অচেনা দেশের অচেনা শহর আর অজানা মানুষ ও অপরিচত ভাষার দেশে তার এই যাত্রা।

অথচ দেশ ছেড়ে তাবুক শহরে নিয়োগকর্তার বাসায় যেদিন উঠলেন ইয়াসমিন, এর পরদিনই তার মালিক তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন মুঠোফোনটি। এরপর থেকে শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দিন দিন এর মাত্রা কমার চেয়ে বাড়তে থাকে দ্বিগুণ, তিনগুণ।

পরিবার থেকে দীর্ঘ আড়াইবছর বিচ্ছিন্ন থাকেন ইয়াসমিন। কোনো যোগাযোগ নেই। কারো সাথেই কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। দেশে কথা বলার জন্য কাকুতি মিনতি করেও গৃহকর্তার মন গলাতে পারেননি ইয়াসমিন। মন গলেনি মালিকের। বরং কথা বলতে চাইলেই জুটতো বৈদ্যুতিক শক আর শ্রমের বিনিময়ে প্রতি মাসে যে বেতনের আশায় দেশ ছেড়েছিলো, তা চাইলে গরম ইস্ত্রিরির ছ্যাঁকা মিলতো। আর তিন বেলা খাবার তো দূরের কথা, নিয়মিত খেতেও দেওয়া হতো না তাকে।

দেশে ফিরে এসেই গৃহকর্তার এমন নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন ইয়াসমিন। আর কেঁদেছেন অঝোরে। যা শুনে কঠিন সিমারের পাষণ হৃদয়ও ঢুঁকরে কেঁদে উঠবে। কিন্তু গৃহকর্তার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গগণবিদারক যে আর্তনাত করেছিলো ইয়াসমিন, তাতেও গলেনি জানোয়ারতুল্য আব্দুল হাদিস আল আমরির পাষাণ হৃদয়।

ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ঠিক মতো খাওয়া দিতো না, কথায় কথায় গায়ে হাত তুলতো, দেশে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কথা বলতে দিতো না। বরং আরও বেশি নির্যাতন করতো, বহুবার বৈদ্যুতিক শক দিয়েছে। নির্যাতনে আমার বাম হাতটি ভেঙে গেছে, চিকিৎসা পর্যন্ত করায়নি। ভয়ে শত নির্যাতন সহ্য করে কাজ করেছি আড়াই বছর। বেতনও দেয়নি। বেতন চাইলে গরম ইস্ত্রিরি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতো। এমনকি গলা কেটে মরুভূমির মধ্যে পুতে রাখারও হুমকি দিতো।

এদিকে দীর্ঘ আড়াই বছর দেশে পরিবার পরিজনের সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না পারায় পরিবারের লোকজন একরকম ভেবেই নিয়েছিলো ইয়াসমিন আর বেঁচে নেই। তবে, ইয়াসমিনের মেয়েরা মায়ের সন্ধান চেয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সৌদি দূতাবাসে আবেদন করে। ফলশ্রুতিতে দূতাবাস থেকে যোগাযোগ করা হয় ইয়াসমিনের নিয়োগকর্তার সাথে। এতে করে পশুর অধম এই নিয়োগকর্তা আরও বেশি ক্ষিপ্র ও হিংস্র হয়ে উঠে। শুরু হয় অতীতের থেকেও আরও অধিকমাত্রায় নির্যাতন।

ইয়াসমিন জানান, আমি নাকি তার (নিয়োগকর্তা) মান-সম্মান খুঁইয়েছি। পরে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে বাসা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল জেদ্দার সেভ হোমে আশ্রয় নিই। সেখানে কিছুদিন ছিলাম। পরে জেদ্দা থেকে রিয়াদ আসি। দূতাবাসের সবাই আমাকে সহায়তা করেছেন। সাড়ে তিন বছরের সব বেতন আদালতের মাধ্যমে তারা আদায় করে দিয়েছেন। আমি এখন দেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।

দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং মেহেদী হাসান গণমাধ্যমকে জানান, নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী ইয়াসমিন নিয়োগকর্তার বাসা থেকে পালিয়ে জেদ্দায় সেভ হোমে আশ্রয় নেন। জেদ্দা কনস্যুলেট অফিস তার মালিকের সঙ্গে অনেকবার চেষ্টা করেও তেমন কোন সমাধানে আসতে পারেনি। পরে ওই মালিক রিয়াদে বদলি হওয়ায় ইয়াসমিনের সব পাওনা আদায়ে স্থানীয় শ্রম আদালতে মামলা করি। চারটি শুনানির পর আদালত ইয়াসমিনের পক্ষে রায় দেয়। এর ফলে সে ৪২ মাসের বকেয়া বেতন বাবদ ৪২ হাজার সৌদি রিয়েল, যা বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। এ টাকা ইয়াসমিনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবে।

অমানসিক নির্যাতনের শিকার ইয়াসমিন আক্তার কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, কোনো নারী যেন সৌদি আরবে এসে আমার মতো নির্যাতনের শিকার না হয়। এদেশে গৃহকর্মী হিসেবে আসার আগে তারা যেন ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন।

২২ জানুয়ারি, ২০২০/এসপি/এনটি

উপরে